ছবি: জৈন্তা বার্তা
জৈন্তাপুর উপজেলার অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র ডিবির হাওরের লাল শাপলা বিল। ভরা পর্যটন মৌসুমকে ঘিরে বর্তমানে প্রতিদিন হাজারও দর্শনার্থীর আগমন ঘটছে ডিবির হাওরে। সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে তা বেড়ে দাঁড়ায় তিন থেকে চারগুণ।
এদিকে, চলতি অর্থবছরে সিলেট-তামাবিল মহাসড়ক থেকে ডিবির হাওর পর্যন্ত এক কিলোমিটার রাস্তা পাকাকরণের ফলে পর্যটক ও দর্শনার্থীদের যাতায়াতের ভোগান্তি কমে এসেছে। ইতোমধ্যে সারা দেশের ভ্রমণপিপাসুদের নিকট জৈন্তাপুরের ডিবির হাওরের লাল শাপলা বিল ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে।
সম্ভাবনাময় এই পর্যটনকেন্দ্রে দর্শনার্থীদের সমাগম বৃদ্ধির সাথে সাথে সৃষ্টি হয়েছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের কর্মসংস্থান। এর মধ্যে আছেন স্থানীয় অন্তত ১০০ জন মাঝি, যারা নৌকা চড়িয়ে পর্যটকদের বিলের সৌন্দর্য উপভোগের সেবা প্রদান করে আসছেন। পাশাপাশি ক্ষুদ্র পর্যায়ে টি স্টল, বিভিন্ন পণ্যের দোকান দোকান, চশমা, রেস্তোরাঁর ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করছেন বেশ কিছু মানুষ।
এর মধ্যে লাল শাপলা বিলে পর্যটন মৌসুমকে ঘিরে সৃষ্ট অন্যতম একটি কর্মসংস্থান হলো ডিএসএলআর ক্যামেরা দিয়ে পর্যটকদের ছবি তোলার কাজ। ডিবির হাওর এলাকায় আগত পর্যটক ও দর্শনার্থীরা তাদের ভ্রমণের মুহ‚র্তগুলোকে স্মৃতিময় করে রাখতে সুন্দর প্রকৃতি আর নয়নাভিরাম দৃশ্যের মাঝে করেন ফটোশ্যুট। আর ডিএসএলআর ক্যামেরা হাতে এই সেবা দিয়ে যাচ্ছেন অন্তত ৭০ জন তরুণ। এতে করে পর্যটকরা যেমন খুশি, তেমনি সাময়িক বেকারত্ব ঘুচিয়ে পর্যটন মৌসুমকে কাজে লাগিয়ে লেখাপড়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে স্থানীয় যুবকদের।
লাল শাপলা বিল এলাকায় পৌঁছামাত্র গলায় ক্যামেরা ঝোলানো কিছু তরুণ এসে পর্যটকদের বলে, ‘স্যার, সুন্দর কিছু ছবি তুলে দেই’? এটি এখন লাল শাপলা বিলের নিয়মিত দৃশ্য। সুনির্দিষ্ট কিছু স্পট যেমন রাজা বিজয় সিংহের সমাধীসৌধ, ওয়াকওয়ে, তরুছায়া সামাজিক বনায়ন স্পট, শাপলা বিলাস স্পট বা নৌকায় ভাসমান অবস্থায় ছবি তোলেন পর্যটকরা। আর সুন্দর ছবির জন্য তারা নির্ভর করেন ডিএসএলআর ক্যামেরা হাতে থাকা তরুণদের ওপর। এই তরুণদের অনেকেই ছাত্র। তারা স্থানীয় কলেজে অধ্যয়নের পাশাপাশি পর্যটন মৌসুম অর্থাৎ অক্টোবর থেকে ফেব্রæয়ারি মাস পর্যন্ত ছবি তোলার কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে।
স্থানীয় কিছু ফটোগ্রাফারের সাথে আলাপ করে জানা যায়, এই কাজ যত সহজ মনে হয় আসলে তত সহজ না। কারণ যেন-তেন ক্যামেরা দিয়ে এই কাজ করে অর্থ উপার্জন করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রফেশনাল ডিএসএলআর ক্যামেরা কিনতে হয়। সাথে ভালো মানের ছবির জন্য ৭০-২০০ মডেলের লেন্স সংযুক্ত করা লাগে। কারণ ছবির মান সাধারণ হলে দর্শনার্থীরা ছবি গ্রহণে অনীহা প্রকাশ করে। আর এই মডেলের ক্যামেরা ও লেন্স কিনতে সর্বনিম্ন ৬৫-৭০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করতে হয়।
ডিবির হাওর এলাকায় ছবি তোলার দায়িত্ব পালনকারী নিজপাট গ্রামের তোফায়েল আহমেদ জানান, তিনি স্থানীয় তৈয়ব আলি ডিগ্রি কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক ২য় বর্ষে অধ্যয়নরত। লেখাপড়ার পাশাপাশি মৌসুম শুরুর থেকে ক্যানন ব্র্যান্ডের একটি ক্যামেরা নিয়ে ভোর থেকে বিকেল পর্যন্ত ছবি তোলার কাজ করেন। এতে করে প্রতিদিন ৪০০-৫০০ টাকা খরচ বাদ দিয়ে মোটামুটি আয় করতে পারেন। প্রতিটি ছবির জন্য ৫ টাকা এবং একসাথে বেশি ছবি নিলে ৩-৪ টাকা পর্যন্ত নিয়ে থাকেন তারা। পাশাপাশি পর্যটক ও দর্শনার্থীরা নিজেদের খুশিমতো ছবি বাছাই করে নিতে পারেন।
একই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ডিবির হাওর গ্রামের জাহিদ হাসান জানান, লেখাপড়ার পাশাপাশি গত মৌসুম থেকে তিনি ফটোগ্রাফারের কাজ শুরু করেছেন। প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ আয় হয়। তবে সাপ্তাহিক ছুটির দুইদিন শুক্রবার ও শনিবার বিলে দর্শনার্থীদের ভিড় বেশি থাকায় আয়ও বেশি হয়। এই দুইদিন সব খরচ বাদ দিয়ে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারেন।
লাল শাপলা বিল এলাকার শাপলা বিলাশ রেস্টুরেন্টের পরিচালক মাহমুদ হাসান নাহিদ জানান, এখানে যতজন ছবি তোলার কাজ করেন তাদের সবার পক্ষে ক্যামেরা ক্রয় করা সম্ভব হয় না। কেউ কেউ ভাড়া করা ক্যামেরা এনে কাজ করেন।
তিনি বলেন, রেস্টুরেন্ট ব্যবসার পাশাপাশি তিনি সাতটি ডিএসএলআর ক্যামেরা সাতজন যুবককে ভাড়ায় দেন। প্রতিদিন তারা সব খরচ বাদ দিয়ে যা আয় করেন, তার ৩০ শতাংশ ক্যামেরার মালিককে দেন ও বাকি ৭০ শতাংশ টাকা পারিশ্রমিক হিসেবে নিজেরা রাখেন। যে সাতজনকে তিনি ক্যামেরা ভাড়া দেন তারা সবাই কলেজের ছাত্র।
ডিবির হাওর লাল শাপলা বিল সুরক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক কামাল আহমেদ বলেন, ফটোগ্রাফারের পেশাটি পর্যটনসেবার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই পেশার মানুষের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে পর্যটকদের নিকট। এখানে যাতে কোনো পর্যটক যাতে ফটোগ্রাফারদের মাধ্যমে হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি রাখছে সুরক্ষা কমিটি। এখন পর্যন্ত দু-একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া তেমন কোনো হয়রানি ও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেন।
তিনি আরও বলেন, এই পেশায় যে কোনো পরিবারে যুবকরা নিয়োজিত হতে পারেন। কারণ এই কাজটা স্মার্ট যুবকদের জন্য। বর্তমান তরুণ সমাজ লেখাপড়ার পাশাপাশি এই পেশাকে বেছে নিতে পারবে। এতে ডিবির হাওর লাল শাপলা বিল সুরক্ষা কমিটির সার্বিক সহযোগিতা করবে।
জৈন্তা বার্তা/ ওয়াদুদ




