ছবি: সংগৃহীত
সিলেটের মেয়ে ডা. জোবায়দা রহমান। সাবেক নৌ-বাহিনীর প্রধান এমএ খানের মেয়ে তিনি। বৈবাহিক সূত্রে জোবায়দা রহমান জিয়া পরিবারের বউ হলেও তার পিতা এমএ খানও ছিলেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে অন্যতম। সিলেটের বনেদি পরিবারের সন্তান তিনি। গেল কয়েক বছর ধরে সিলেট বিএনপির রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে জোবায়দা রহমানের নাম।
জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২০০৭ সালে দুর্নীতি দমন কমিশনের করা এক মামলায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ৯ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানকে তিন বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। পাশাপাশি তারেক রহমানকে তিন কোটি টাকা জরিমানা ও অনাদায়ে তিন মাস বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং জুবাইদা রহমানকে ৩৫ লাখ টাকা জরিমানা ও অনাদায়ে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এ ছাড়া তারেকের ২ কোটি ৭৪ লাখ ৯৩ হাজার ৮৭ টাকা রাষ্ট্রীয় অনুকূলে বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। বুধবার (২ আগস্ট) বিকাল ৪টা ২ মিনিটে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ মো. আছাদুজ্জামান এই রায় দেন।
এই রায়ের মধ্য দিয়ে তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় সংবিধান অনুযায়ী তিনি নির্বাচন করার জন্য অযোগ্য হয়েছেন। দুই বছরের বেশি কারাদণ্ডে দণ্ডিত হওয়ায় বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, এবার তিনি সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না। এ রায়ের কারণে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের পর ডা. জোবায়দা রহমানের নির্বাচনে অংশগ্রহণের পথ বন্ধ হলো।
সংবিধানের ৬৬ (২) (ঘ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ফৌজদারি অপরাধে কারও দুই বছরের বেশি সাজা বা দণ্ড হলে সেই দণ্ড বা সাজার বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল বিচারাধীন থাকা অবস্থায় তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না, যতক্ষণ না আপিলে ওই দণ্ড বাতিল বা স্থগিত হয়।
এ ক্ষেত্রে ডা. জুবাইদা রহমান নির্বাচনে অংশ নিতে চাইলে তাকে বিচারিক আদালতে আত্মসমর্পণ করে কারাগারে গিয়ে উচ্চ আদালতে আপিল করতে হবে। আপিলে দণ্ড বাতিল বা স্থগিত হলে তবেই তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। এর আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দুই মামলায় এবং একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলাসহ পাঁচ মামলায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান আগেই সাজাপ্রাপ্ত হওয়ায় তারাও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারছেন না। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী তারা দুজনও অযোগ্য হয়েছেন।
নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান বলেন, ‘কেউ যদি নৈতিক স্খলনের দায়ে দুই বছরের দণ্ডপ্রাপ্ত হন, তাহলে তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। এ ক্ষেত্রে জুবাইদা রহমান দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন, অর্থাৎ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে তিনি অযোগ্য। নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার কোনও সুযোগ নেই তার।’ তিনি আরও বলেন, ‘তিনি যদি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চান, হলে বিচারিক আদালতে আত্মসমর্পণ করতে হবে। পরবর্তী সময়ে কারাগারে গিয়ে উচ্চ আদালতে আপিল করতে হবে। আপিলে দণ্ড বাতিল বা স্থগিত হলে তবেই তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। এ ছাড়া সম্ভব না।’
বিএনপির সহ-আইন বিষয়ক সম্পাদক ও আইনজীবী সৈয়দ জয়নুল আবেদীন মেজবা বলেন, ‘আমরা মনে করি, দেশে যদি নির্বাচনের পরিবেশ থাকে এবং তারা যদি দেশে ফিরতে পারেন, তাহলে আপিলের মাধ্যমে সাজা স্থগিত করে নির্বাচন করা সম্ভব।’ আপিল করলে সাজা স্থগিত হবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিচারব্যবস্থা যদি নিয়মতান্ত্রিকভাবে চলে এবং স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, তাহলে আমরা আশা করি, আপিল করলে এ রায় স্থগিত হবে।’
এ বিষয়ে ঢাকা জজ কোর্টের সরকারি কৌঁসুলি আব্দুল্লাহ আবু বলেন, ‘আমাদের সংবিধানে আছে দুই বছরের বেশি কেউ সাজাপ্রাপ্ত হলে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। সে ক্ষেত্রে জুবাইদা রহমানের তিন বছরের সাজা হয়েছে। তিনি নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে অযোগ্য হয়েছেন। নির্বাচনে তার অংশগ্রহণ করার সুযোগ নেই।’
জানা যায়, ২০০৭ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর কাফরুল থানায় তারেক রহমান, জুবাইদা রহমান ও তার মা অর্থাৎ তারেক রহমানের শাশুড়ি ইকবাল মান্দ বানুকে আসামি করে মামলা করে দুদক। ঘোষিত আয়ের বাইরে ৪ কোটি ৮১ লাখ ৫৩ হাজার ৫৬১ টাকার মালিক হওয়া এবং সম্পদের তথ্য গোপন ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ এনে এ মামলা করে দুদক।
পরে ২০০৮ সালে তিন জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন দুদকের উপপরিচালক তৌফিকুল ইসলাম। এরপরই মামলা বাতিল চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন করেন জোবাইদা রহমান। ওই বছরই এ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মামলার কার্যক্রম স্থগিত করে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। এর বিরুদ্ধে আপিল করলে আপিল বিভাগ হাইকোর্টের আদেশ বহাল রাখেন। এ সংক্রান্ত চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০১৭ সালের ১২ এপ্রিল হাইকোর্ট জুবাইদার করা মামলা বাতিলের আবেদন খারিজ করে দেন। একই সঙ্গে ওই মামলায় আট সপ্তাহের মধ্যে জুবাইদাকে বিচারিক আদালতে উপস্থিত হতে নির্দেশ দেওয়া হয়। উচ্চ আদালতের এ খারিজ আদেশের বিরুদ্ধে ওই বছরই লিভ-টু-আপিল করেন জুবাইদা। এরপর প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ লিভ-টু-আপিল খারিজ করে হাইকোর্টের দেওয়া রায় বহাল রাখেন।
এ মামলায় ইকবাল মান্দ বানুর মৃত্যু হলে তাকে এ মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
২০২২ সালের ১ নভেম্বর অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে তারেক রহমান ও জুবাইদা রহমানের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। পরে তাদের পলাতক দেখানো হয়। ২০২৩ সালের ১৩ এপ্রিল তাদের বিরুদ্ধে দুদক আইনের ২৬(২) ও ২৭(১) ধারায় অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন আদালত। গত ২১ মে আদালতে মামলার বাদী দুদকের উপপরিচালক মোহাম্মদ জহিরুল হুদার সাক্ষ্যের মধ্য দিয়ে এ মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। এরপর গত ২৪ জুলাই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের উপপরিচালক তৌফিকুল ইসলাম শেষ সাক্ষী হিসেবে আদালতে সাক্ষ্য দেন। এ নিয়ে মামলাটিতে ৫৬ সাক্ষীর মধ্যে ৪২ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়। সর্বশেষ গত ২৭ জুলাই দুদকের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আদালত আজ রায় দেন।
S/N



