ছবি : ফাইল ফটো
সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে দীর্ঘ সাত বছর পর দেখা হচ্ছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়ার বিদেশযাত্রায় সকল ধরণের প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। মঙ্গলবার রাতে লন্ডনের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়ার কথা রয়েছে সাবেক এই প্রধামন্ত্রীর। ইতিমধ্যে সেনাপ্রধান খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা ও বিদেশ যাত্রার ব্যাপারে খোঁজখবর নিয়েছেন। যাত্রার আগে রোববার রাতে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যদের সঙ্গেও বৈঠকে বসেন তিনি। দিয়ে যাচ্ছেন দলের হাইকমান্ডকে বিশেষ বার্তা।
খালেদা জিয়ার সফরসঙ্গী তার একান্ত সহকারী এবিএম আব্দুস সাত্তার জানিয়েছেন, "সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ম্যাডাম মঙ্গলবার যেকোনো সময় লন্ডনের উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করবেন। সফরসঙ্গী হিসেবে ম্যাডামের সঙ্গে মোট ১৫জন যাচ্ছে। উনাকে (খালেদা জিয়া) প্রথমে লন্ডন তারপর যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়া হতে পারে। সবকিছু নির্ভর করছে ম্যাডামের শারিরীক অবস্থা ও মেডিকেল বোর্ডের সিদ্ধান্তের ওপর।"
বিএনপি চেয়ারপারসনের বিএনপি চেয়ারপারসনের নিরাপত্তা (সিএসএফ) প্রধান কর্নেল (অব.) মুহাম্মদ ইসহাক জানিয়েছেন, সম্ভব্য দুইটি ফ্লাইটের সময় ধরে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সফরঙ্গী সবার ভিসা ও অন্য সব প্রক্রিয়া শেষ। এরই অংশ হিসেবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যরা রাতে ম্যাডামের সঙ্গে সাক্ষাত করেছেন।
রাত সোয়া নয়টায় বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান জনকণ্ঠকে জানিয়েছেন, রাত নয়টা ১২ মিনিটে খালেদা জিয়ার সঙ্গে স্থায়ী কমিটির বৈঠক শুরু হয়। এসময় গণমাধ্যমে পাঠানো ছবিতে খালেদা জিয়াকে হাসিমুখে দেখা গেছে। স্থায়ী কমিটির সকল সদস্যরা ছিলো মাস্ক পরিহিত। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন,মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর,ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ,মির্জা আব্বাস,গয়েশ্বর চন্দ্র, ড. আব্দুল মঈন খান ,নজরুল ইসলাম খান ,আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাউদ্দিন আহমেদ , বেগম সেলিমা রহমান, হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু , অধ্যাপক ডাক্তার এ জেড এম জাহিদ হোসেন।রাত সোয়া দশটায় বৈঠক শেষে,মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে জানিয়েছেন,বেগম খালেদা জিয়া নির্দেশনা দিয়েছেন,জনগণের পক্ষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে,গণতন্ত্রের পক্ষে কাজ করতে হবে।আমরা আশা করছি তিনি সুস্থ হয়ে আগামী ৭ তারিখ রাতে চিকিৎসার জন্য লন্ডনের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করবেন।আশা করছি তিনি সুস্থ হয়ে খুব শীগ্রই দেশে ফিরবেন।
নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো বলছে, খালেদা জিয়া মঙ্গলবার রাত ১০টায় লন্ডনের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়বেন। তিনি প্রায় দুই মাস লন্ডনে অবস্থান করবেন। লন্ডন থেকে দেশে ফেরার পথে তিনি সৌদি আরবে ওমরাহ পালন করতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। সফরে লন্ডনে তার ছেলে তারেক রহমানের সঙ্গে সাত বছর পর দেখা হবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার। তারেক রহমান ও তার পরিবার ২০০৮ সাল থেকে লন্ডনে বসবাস করছেন।
খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন জানিয়েছেন, খালেদা জিয়া উড়োজাহাজে ভ্রমণের মতো অবস্থায় থাকলে ৭ জানুয়ারি লন্ডনে যাওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে। জন হপকিন্স ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে চিকিৎসার সব প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে বলে তার চিকিৎসক দল জানিয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার বাসায় সাক্ষাৎ করেন সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। মেডিকেল বোর্ডের এক সদস্য জানান, বিদেশযাত্রার সবশেষ খোঁজখবর নিতে খালেদা জিয়ার বাসায় যান সেনাপ্রধান। সেখানে ওনার সহধর্মিণীও ছিলেন। তারা খালেদা জিয়ার সঙ্গে কুশল বিনিময় করেছেন। স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নিয়েছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার বিষয়ে ওয়াকিবহাল হয়েছেন। তিনি বলেন, প্রায় পৌনে এক ঘণ্টার আলাপচারিতায় ম্যাডাম ধন্যবাদ জানিয়েছেন সেনাপ্রধানকে। বিশেষ করে গত ২১ নভেম্বর সশস্ত্র বাহিনী দিবসে সেনাকুঞ্জে সংবর্ধনায় সম্মানিত করেছেন। এ ছাড়া সেনাপ্রধান গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে যৌক্তিক ভূমিকা রেখেছেন। এসব কারণে ম্যাডাম ধন্যবাদ জানিয়েছেন সেনাপ্রধানকে। এ সময় বিএনপি চেয়ারপারসনের নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহি আকবর, বিশেষ সহকারী আবদুস সাত্তার ও বিশেষ সহকারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসসহ আরও কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়- গত বছর ২৬ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের তিন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তার লিভার ও পেটের ফ্লুইড জমা ও রক্তক্ষরণ রোধে একটি বিশেষ পদ্ধতি (টিআইপিএস) সম্পন্ন করেছিলেন। এই সফরে বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে ১৫ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল যাবেন। এতে থাকবেন তার ছোট ছেলে প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী সৈয়দা শর্মিলা রহমান, চিকিৎসক, বিএনপি নেতৃবৃন্দ, ব্যক্তিগত কর্মী এবং দুইজন গৃহকর্মী। বিএনপির এক জ্যেষ্ঠ নেতা জানান, খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসার বিষয়ে এবং সঙ্গে থাকা প্রতিনিধিদের তালিকা ইতোমধ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে।
২০১৭ সালের ১৬ জুলাই লন্ডন গিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। চারটি মামলার পরোয়ানা মাথায় নিয়ে ওই বছরের ১৮ অক্টোবর দেশে ফেরেন তিনি। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট-সংক্রান্ত মামলায় কারাগারে যান খালেদা জিয়া।
২০২০ সালের ২৫ মার্চ আওয়ামী লীগ সরকার নির্বাহী আদেশে খালেদা জিয়ার সাজা স্থগিত করে শর্ত সাপেক্ষে মুক্তি দেয়। এর পর ছয় মাস পর পর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তার সাজা স্থগিত করে মুক্তির মেয়াদ বাড়াচ্ছিল সরকার। অসুস্থ খালেদা জিয়াকে বহুবার হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার তাকে বিদেশ যাওয়ার অনুমতি দেয়নি। পরে দেশি-বিদেশি চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করা হয়।
গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পরদিন এভারকেয়ারে চিকিৎসাধীন খালেদা জিয়ার মুক্তির আদেশ দেন রাষ্ট্রপতি।
৭৯ বছর বয়সী সাবেক এ প্রধানমন্ত্রী লিভার সিরোসিস, হৃদরোগ, ফুসফুস, আর্থ্রাইটিস, কিডনি, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন জটিলতায় ভুগছেন। ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে বিভিন্ন সময়ে আইসিইউতে রেখে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে মেডিকেল বোর্ডের মাধ্যমে তাকে দীর্ঘ সময়ে চিকিৎসা নিতে হয়েছে।
জৈন্তাবার্তা / রহমান




