ছবি: সংগৃহীত
অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ইসরাইলের নৃশংস হামলার এক মাস পূর্ণ হলো রোববার! টানা এক মাসের এই বর্বর হামলায় বদলে গেছে গাজার প্রতিকৃতি। হাজার হাজার নিরীহ মানুষের গোরস্থানে পরিণত হয়েছে। সাজানো শহর থেকে হয়ে গেছে মৃত্যুপুরী। চোখ খুললেই লাশ। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে হাসপাতাল-মসজিদ, রাস্তায় কিংবা বিধ্বস্ত ঘর-সংসারের নিচে। প্রতিদিন শত শত লাশ। এত এত প্রাণনাশেও থামছে না ইসরাইল। জাতি নিধন নেশায় উন্মুত্ত ইসরাইল বাহিনী ছাড়ছে না শিশুদেরও।
গত এক মাসের হিসাবে, এ পর্যন্ত অন্তত ৯ হাজার ৫০০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। যাদের বেশির ভাগই নারী, শিশু ও বেসামরিক নাগরিক। যারা বেঁচে আছেন তারা প্রতি নিঃশ্বাসে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন। পাশে নেই কেউ। না আরব, না পশ্চিমারা, যেন বিলীন হয়ে গেছে মানবতা। সুতোয় ঝুলছে বিশ্ব বিবেক। শক্তির দাপটে ভুলে গেছে উচিত-অনুচিত বিচার! বুকফাটা আর্তচিৎকারেও মুখ খোলে না কারও!
৭ অক্টোবর ইসরাইলে হামাসের অভিযানের পরপরই তাদের পাশে দাঁড়ায় যুক্তরাষ্ট্র। সেনা, নৌবহর থেকে শুরু করে পাঠিয়েছে লাখ লাখ টাকার যুদ্ধ সরঞ্জাম। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী থেকে শুরু করে খোদ প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের পদভারে উদ্যম ফিরে পেয়েছে ইসরাইল। জার্মানির চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎজ, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক, ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সবাই শোক জানিয়ে সাহস জুগিয়ে গেছেন উড়ে এসে।
অথচ সীমান্ত পার হয়ে একবার দেখতে পর্যন্ত আসেননি কেউ, কিভাবে মরছে গাজাবাসী! অসহায়-নিরস্ত্র মানুষগুলোকে কিভাবে মারছে ইসরাইল! এক মাসের মাথায় রোববার প্রথমবারের মতো পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্তনি ব্লিঙ্কেন। যুদ্ধবিরতির কথা মুখে আনেননি সেখানেও। যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব নাকচ করছেন প্রেসিডেন্ট বাইডেনও। এমনকি, ইসরাইলের সম্মতির বাইরে রাফা ক্রসিং খুলে ত্রাণ সরবরাহের আহবানটুকুও জোর গলায় বলেনি যুক্তরাষ্ট্র।
গাজায় ইসরাইলি অবরোধের ফলে অর্ধেকেরও বেশি জনসংখ্যা এখন পানি ও খাদ্য সরবরাহসহ ভয়ানক পরিস্থিতিতে ভুগছে। জাতিসংঘের শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে অনেকেই। ক্ষুধা, অপুষ্টি, পানিশূন্যতা ও পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। ইতোমধ্যেই তীব্র শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণের ২২ হাজার ৫০০টিরও বেশি কেস এবং ডায়রিয়ার ১২ হাজার কেস রিপোর্ট করা হয়েছে। যুদ্ধের ভার বহন করছে নিষ্পাপ শিশুরাও। প্রতি ১০ মিনিটে মরছে এক শিশু। প্রতিদিন অন্তত ৪২০ শিশু নিহত হচ্ছে। মৃতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। কারণ শত শত শিশু নিখোঁজ রয়েছে। বিধ্বস্ত ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কেউ কেউ ইসরাইলের আক্রমণে আহত হয়ে হারানো অঙ্গ ও ছুরির আঘাতে কাতরাচ্ছে। কিন্তু পাচ্ছে না চিকিৎসাসেবা। ইসরাইলি অবরোধে বন্ধ হয়ে গেছে হাসপাতাল। যেগুলো এখনো খোলা আছে সেগুলোতে সীমিত অ্যাক্সেসের কারণে বিনা চিকিৎসায় মরছে অনেকেই। শিশু মৃত্যুর সংখ্যাটি উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। জাতিসংঘের শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) মুখপাত্র জেমস এল্ডার বলেছেন, ‘গাজার এক মিলিয়নেরও বেশি শিশু পানির সংকটে ভুগছে। শহরটিতে পানি উৎপাদন ক্ষমতা স্বাভাবিক দৈনিক উৎপাদনের মাত্র ৫ শতাংশ। ডিহাইড্রেশনের ফলে শিশু মৃত্যু একটি ক্রমবর্ধমান হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতিসংঘের ত্রাণ ও কর্ম সংস্থা (ইউএনআরডব্লিউএ) জানিয়েছে, শিবিরে বসবাসকারী অন্তত ৩৮০ নবজাতকের চিকিৎসার প্রয়োজন।
গত এক মাস ধরে ইসরাইলের অবিশ্রান্ত বোমা হামলায় দুঃস্বপ্নের প্রহর গুনছে গাজার গর্ভবতী নারীরাও। ‘আমি আমার অনাগত শিশুর জন্য আতঙ্কিত’ আতঙ্কের স্বরে বলেছেন এক নারী। গাজায় ইসরাইলের চলমান আগ্রাসন গর্ভবতী মায়েদের দুর্ভোগকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। বোমাবর্ষণ, ক্ষতিগ্রস্ত বা অকার্যকর স্বাস্থ্য সুবিধা, ব্যাপক মাত্রায় স্থানচ্যুতি, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহের পাশাপাশি খাদ্য ও ওষুধের সীমিত প্রবেশাধিকার, মা, নবজাতক ও শিশু স্বাস্থ্য পরিষেবাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। গাজায় আনুমানিক ৫০ হাজার গর্ভবতী মহিলা রয়েছেন। যাদের মধ্যে প্রতিদিন ১৮০ জনেরও বেশি সন্তান জন্ম দিয়ে থাকেন। পর্যাপ্ত পরিচর্যার সুযোগ না থাকায় দিন দিন মাতৃমৃত্যুও বাড়ছে। স্ট্রেসজনিত গর্ভপাত, মৃত প্রসব এবং অকাল প্রসব সাধারণ বিষয় হয়ে উঠেছে। টেকসই এবং নিরাপদ অ্যাক্সেসের অভাব সত্ত্বেও জাতিসংঘের সংস্থাগুলো গাজায় জীবনরক্ষাকারী ওষুধ এবং সরঞ্জাম প্রেরণ করেছে। যার মধ্যে নবজাতকদের জন্য সরবরাহ এবং প্রজনন স্বাস্থ্য পরিষেবা রয়েছে। তবে গর্ভবতী মহিলা, শিশু এবং নবজাতকসহ বেসামরিক নাগরিকদের অপরিসীম চাহিদা মেটাতে আরও অনেক কিছুর প্রয়োজন। গাজায় মৌলিক চাহিদা সরবরাহের জন্য মানবিক সংস্থাগুলোর অবিলম্বে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
এম সি




