বিলুপ্তির পথে গ্রাম বাংলার বেত ও বাঁশ শিল্প
রবিবার, ০৩ মে ২০২৬, ১০:১০ AM

বিলুপ্তির পথে গ্রাম বাংলার বেত ও বাঁশ শিল্প

তাহিরপুর প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২৩/১০/২০২৩ ০৮:১৫:৩৯ AM

বিলুপ্তির পথে গ্রাম বাংলার বেত ও বাঁশ শিল্প

বিলুপ্তির পথে গ্রাম বাংলার বেত ও বাঁশ শিল্প


গ্রামীণ জনপদে একসময় বাঁশঝাড় ছিল না এমনটা কল্পনাও করা যেতো না। যেখানে গ্রাম সেখানে বাঁশঝাড় এমনটিই ছিল স্বাভাবিক। বাড়ির পাশে বাঁশঝাড় বেত বনের ঐতিহ্য গ্রাম বাংলার চিরায়ত রূপ।

কিন্তু বর্তমানে জনজীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী বাঁশ ও বেত শিল্প। এক সময় গ্রামীণ জনপদে বাংলার ঘরে ঘরে তৈরি হতো বাঁশ ও বেতের হাজারো পণ্য সামগ্রী। ঘরের কাছের ঝাড় থেকে তরতাজা বাঁশ কেটে গৃহিণীরা তৈরী করতেন হরেক রকম জিনিস। অনেকে এ দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতো।

দরিদ্র পরিবারের অনেকের উপার্জনের একমাত্র অবলম্বন ছিলো এগুলো। কিন্তু আজ ক’টি গ্রামে এ হস্তশিল্পটি উপার্জনের পেশা হিসেবে বেঁচে আছে তা ভাবনার বিষয়। এ শিল্পের সাথে জড়িত অনেকেই বাপ-দাদার আমলের পেশা ত্যাগ করে অন্য পেশায় নিয়োজিত হয়েছেন বা হচ্ছেন। আগে বাঁশ ও বেতের তৈরি জিনিসের কদর ছিল। চেয়ার, টেবিল, বইয়ের সেল্ফ, মোড়া, কুলা, ঝুড়ি, ডোল, চাটাই থেকে শুরু করে এমনকি ড্রইং রুমের আসবাবপত্র তৈরিতেও বাঁশ ও বেত প্রচুর পরিমাণে ব্যবহার করা হতো। এ ছাড়া মাছ ধরার পলো, হাঁস, মুরগীর খাঁচা, শিশুদের ঘুম পাড়ানোর দোলনা এখনো গ্রাম অঞ্চলের বিভিন্নস্থানে ব্যাপকভাবে সমাদৃত।

একসময় তাহিরপুর  উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের বিপুল পরিমাণে এসব বাঁশ ও বেতের সামগ্রী তৈরী হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে চালান হয়ে যেতো। এখন সচরাচর গ্রামীণ উৎসব বা মেলাতেও বাঁশ ও বেতজাত শিল্পীদের তৈরি উন্নতমানের খোল, চাটাই, খালুই, ধামা, দোয়াড়, আড়ি, টোনা, আড়, হাপটা, মোড়া, বুকসেলফ চোখে পড়ে খুব কম। যেখানে তালপাতার হাত পাখারই কদর নেই, সেখানে অন্যগুলো তো পরের কথা।

প্রান্তিক পর্যায়ে বিদ্যুৎ সুবিধা যেমন হাত পাখার চাহিদা কমিয়েছে তেমনি মৎস্য শিকার, চাষাবাদ, ঘরের যাবতীয় আসবাবপত্র সকল ক্ষেত্রেই কমেছে বাঁশ আর বেত জাতীয় হস্তশিল্পের কদর। প্রকৃতপক্ষে বাঁশ বেতের স্থান অনেকটাই প্লাস্টিক সামগ্রী দখল করে নিয়েছে। তাছাড়া এখন বাঁশ ও বেতের উৎপাদন কমে যাওয়ায় এর দামও বেড়ে গেছে। ফলে বাঁশ ও বেতের সামগ্রীর ব্যয়ও বেশি হচ্ছে। সৌখিন মানুষ ঘরে বাঙালির ঐতিহ্য প্রদর্শনের জন্য বাঁশ বেতের সামগ্রী বেশি দাম দিয়ে কিনলেও মূলত ব্যবহারকারীরা বেশি দাম দিতে চান না। স্বল্প আয়ের মানুষেরা সমিতি থেকে সুদের বিনিময়ে টাকা নিয়ে বাঁশ ও বেতজাত দ্রব্যসামগ্রী তৈরি করে বিক্রি করলেও এতে তাদের খরচ পোষায় না। এর ফলে তারা অন্য পেশায় আকৃষ্ট হচ্ছে।

জান্জাইল গ্রামের শিল্পী রানী বলেন একসময় পরিবারের  সকলে মিলে পাটি তৈরী করে বিক্রি করে জীবীকা নির্বাহ করতাম এখন আর তা হচ্ছেনা আমাদের এলাকায় বাশ ও বেত প্রায় বিলুপ্তির পথে, একটি পাটি তৈরী করতে অনেক টাকা খরছ হয়ে যায় আমদের এই শিল্প কে বাচিয়ে রাখতে হলে সরকারী কিংবা এনজিওর  সহায়তা প্রয়োজন।

শ্রীপুর দঃ ইউনিয়ন পরিষদ  চেয়ারম্যান আলী আহমেদ মুরাদ বলেন, আমার ইউনিয়নে জান্জাইল ভবানিপুর সহ আরও কিছু গ্রামে এক সময় তারা শীতল পাটি ও বাঁশের তৈরি করা জিনিস বানিয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি করত এখন আর তেমনটা দেখা যায়না কালের আবর্তে যেন সবকিছু হারিয়ে যাচ্ছে, প্রকৃতপক্ষে বাঁশ ও বেতের সামগ্রী যারা তৈরি করছে তাদেরকে সরকার এবং বিভিন্ন এনজিও’র সহায়তা করা অত্যন্ত জরুরী। বাংলার ঐতিহ্য বাঁশ ও বেতের সামগ্রীকে টিকিয়ে রাখতে হলে এর পেছনের মানুষগুলোকে আর্থিক সাহায্যের মাধ্যমে তাদের পেশাকে বাঁচাতে হবে। প্রয়োজন হলে এদের বিনা সুদে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায় এসব সুন্দর বাঁশ ও বেতের হস্তশিল্প একদিন বিলুপ্ত হয়ে যাবে। বাঁশ ও বেত শিল্পকে বাঁচাতে আমাদের সবাই কে এগিয়ে আসতে হবে।

তাহিরপুর উপজেলার সুযোগ্য নির্বাহী কর্মকর্তা সুপ্রভাত চাকমা বলেন, এক সময় বাশ ও বেতের তৈরি জিনিস দিয়ে মানুষের অনেক চাহিদা পুরন হতো।কালের আবর্তে  অনেকটা ম্লান হচ্ছে গ্রাম বাংলার এসব তৈরী করা পন্যের,যারা এই শিল্পে জড়িত আছেন তাদেরকে সরকারি ভাবে  ট্রেনিং দেওয়া হয়ে থাকে, তাদেরকে সরকার বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করে থাকেন, এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে সবাইকে মিলেমিশে কাজ করতে হবে।

JA