এলএনজি আমদানি বাড়াতে বাখরাবাদ-ফেনী পাইপলাইন
শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:১৫ AM

এলএনজি আমদানি বাড়াতে বাখরাবাদ-ফেনী পাইপলাইন

জৈন্তা বার্তা ডেস্ক

প্রকাশিত: ১২/০৯/২০২৬ ১০:১১:৫৫ AM

এলএনজি আমদানি বাড়াতে বাখরাবাদ-ফেনী পাইপলাইন

সংগৃহীত


দেশে নতুন করে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ইতোমধ্যে চায়না কোম্পানির সঙ্গে কথাবার্তা চূড়ান্ত করেছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী মহেশখালী এলাকায় নতুন এলএনজি টার্মিনালটি দুই বছরের মধ্যে স্থাপন করা হবে। উদ্দেশ্য বিদেশ থেকে বেশি করে এলএনজি আমদানি করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা। তবে এফএসআরইউ স্থাপন করলেও পাইপলাইন সংকটে তিনটি টার্মিনাল থেকেই গ্যাস বা এলএনজি সরবরাহ করা যাবে না। পাইপলাইনের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। টার্মিনাল স্থাপন করলেই জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে না আমদানি করা এলএনজি। এ জন্য কুমিল্লার বাখরাবাদ থেকে ফেনী পর্যন্ত প্রায় ৯৭.১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি জরুরি ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করতে চায় জ্বালানি বিভাগ।সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, নতুন এফএসআরইউ স্থাপনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সেখান থেকে গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য প্রয়োজন হবে এই পাইপলাইন। এটি নির্মাণ করা না হলে টার্মিনালে এলএনজি এনে গ্যাসে রূপান্তর করলেও তা কার্যকরভাবে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে না। এ কারণে এফএসআরইউ স্থাপনের পাশাপাশি বাখরাবাদ-ফেনী গ্যাস সঞ্চালনলাইন নির্মাণকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে দেখা হচ্ছে।প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করছেন বলে জানা গেছে। সরকারের লক্ষ্য, ৯৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইন সর্বোচ্চ দুই বছরের মধ্যে নির্মাণ শেষ করা। গত মঙ্গলবার দুপুরেও প্রকল্পটির বাস্তবায়নবিষয়ক অগ্রগতি নিয়ে বৈঠক হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা আমাদের সময়কে বলেন, এ প্রকল্পের সঙ্গে নতুন করে এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ নির্মাণের সম্পর্ক রয়েছে। ফলে জ্বালানি বিভাগ চাইছে এফএসআরইউ নির্মাণের সঙ্গে সঙ্গে পাইপলাইন প্রকল্পটিও বাস্তবায়ন করতে। তাহলে গ্যাস সংকট অনেকটা লাঘব হবে। গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতাও বাড়বে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে জিটিসিএল।৯ উপজেলার ওপর দিয়ে যাবে পাইপলাইন : প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, কুমিল্লা ও ফেনী জেলার বিভিন্ন এলাকার ওপর দিয়ে পাইপলাইনটি স্থাপন করা হবে। এর মধ্যে কুমিল্লার বরুড়া, চান্দিনা, চৌদ্দগ্রাম, দেবিদ্বার, লাকসাম, লালমাই, মুরাদনগর ও লাঙ্গলকোট এবং ফেনী সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা রয়েছে।পাইপলাইন নির্মাণের জন্য প্রায় ৩৬৬ একর জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে। এর মধ্যে কৃষিজমির পাশাপাশি বিভিন্ন স্থাপনা ও বসতবাড়ি পড়বে। ফলে জমি অধিগ্রহণ, ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং স্থানীয় মানুষের পুনর্বাসন প্রকল্প বাস্তবায়নের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি অব বাংলাদেশের (জিটিসিএল) একজন কর্মকর্তা বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জমি অধিগ্রহণ। ইতোমধ্যে সেটা শুরু হয়ে গেছে। জমি অধিগ্রহণ শেষ হলে প্রকল্প বাস্তবায়নে তেমন কষ্ট করতে হবে না।

নদী, রেল ও মহাসড়ক পেরোতে হবে: প্রকল্পটির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া বেশ জটিল। ৯৭ কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণের পথে অন্তত তিনটি নদী পার হতে হবে। একই সঙ্গে বড় মাছের খামার, পুকুর ও রেললাইনও অতিক্রম করতে হবে। এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কসহ ফেনী-নোয়াখালী ও কুমিল্লার ওপর দিয়ে যাওয়া মহাসড়কগুলোতে একাধিকবার পাইপলাইন ক্রসিংয়ের প্রয়োজন হবে। প্রকল্প-সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, এসব মহাসড়ক অন্তত তিনবার ক্রস করতে হবে। পাশাপাশি আঞ্চলিক সড়ক অন্তত দুইবার এবং জেলা সড়ক অন্তত দশবার অতিক্রম করতে হবে। ফলে পাইপলাইন স্থাপনের ক্ষেত্রে সড়ক ও রেল কর্তৃপক্ষের অনুমোদন, নদী পারাপারের কারিগরি ব্যবস্থা, জমি অধিগ্রহণ এবং পরিবেশগত বিষয়গুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করা না গেলে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প শেষ করা কঠিন হতে পারে।

প্রাথমিক ব্যয় ৪ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা: প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ৯৭.১৩ কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৪ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় পাইপলাইন নির্মাণের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, জমি অধিগ্রহণ এবং অন্যান্য কাজ অন্তর্ভুক্ত থাকবে।জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করছেন, ভবিষ্যতে এলএনজি আমদানি বাড়ানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এই পাইপলাইন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। দেশে নিজস্ব গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ, শিল্প, সার ও অন্যান্য খাতে চাহিদা মেটাতে ক্রমেই আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। এ অবস্থায় নতুন এফএসআরইউ স্থাপনের পাশাপাশি সঞ্চালন অবকাঠামো তৈরি না হলে অতিরিক্ত এলএনজি আমদানির সুফল পাওয়া যাবে না।টার্মিনাল হবে, কিন্তু গ্যাস যাবে কোথায় : সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন এফএসআরইউ স্থাপনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে অতিরিক্ত এলএনজি বিদেশ থেকে আমদানি করে তা গ্যাসিফিকেশনের মাধ্যমে জাতীয় গ্যাস সঞ্চালন ব্যবস্থায় সরবরাহ করা। কিন্তু সমুদ্র উপকূলে স্থাপিত এফএসআরইউ থেকে স্থলভাগের বিদ্যমান সঞ্চালন নেটওয়ার্কে গ্যাস নেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট ক্ষমতার পাইপলাইন প্রয়োজন। এই জায়গাতেই বাখরাবাদ-ফেনী পাইপলাইনটি গুরুত্বপূর্ণ। নতুন টার্মিনাল স্থাপনের পর পাইপলাইন প্রস্তুত না থাকলে টার্মিনালের রিগ্যাসিফায়েড গ্যাস জাতীয় গ্রিডে নেওয়ার সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়বে। অর্থাৎ এফএসআরইউ ও পাইপলাইনকে একই সময়ের মধ্যে প্রস্তুত করার ওপরই নতুন এলএনজি অবকাঠামোর কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করছে।

গ্যাস সংকটের মধ্যে অবকাঠামো বাড়ানোর উদ্যোগ: সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি এলএনজি সরবরাহে বিভিন্ন ধরনের বিঘ্নের কারণে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এক পর্যায়ে মহেশখালীর দুটি এফএসআরইউ ঘিরে এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন তৈরি হওয়ায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।এ অবস্থায় সরকার একদিকে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর কথা বলছে, অন্যদিকে এলএনজি আমদানির সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে। নতুন এফএসআরইউ সেই পরিকল্পনার অংশ। তবে আমদানি করা গ্যাস দ্রুত জাতীয় গ্রিডে পৌঁছে দিতে প্রয়োজনীয় সঞ্চালন অবকাঠামোও একই সঙ্গে প্রস্তুত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন এফএসআরইউ স্থাপন এবং বাখরাবাদ-ফেনী পাইপলাইন— দুটি প্রকল্পকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। কারণ একটি সম্পন্ন করে অন্যটি পিছিয়ে থাকলে পুরো বিনিয়োগের কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না।

প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জমি অধিগ্রহণ, সড়ক-মহাসড়ক ও রেললাইন ক্রসিং, নদী পারাপার এবং বিভিন্ন সংস্থার অনুমোদন বড় চ্যালেঞ্জ। এসব জটিলতা দ্রুত কাটিয়ে দুই বছরের মধ্যে পাইপলাইন নির্মাণ শেষ করতে চায় জ্বালানি বিভাগ।এ বিষয়ে পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন) চলতি দায়িত্ব প্রকৌশলী মো. শোয়েব আমাদের সময়কে বলেন, এ পাইপলাইন প্রকল্পটি দ্রুত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করতে চায় সরকার। দেশে একাধিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপিত হলে পাইপলাইনটি ব্যবহার করা হবে। দ্রুত গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণে সক্ষমতা বাড়বে।

জৈন্তাবার্তা/সুলতানা



শীর্ষ সংবাদ: