এক দিনের পেঁয়াজে কারবারে ৪৮ কোটি টাকা লুটপাট
রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬, ১২:৫৯ AM

এক দিনের পেঁয়াজে কারবারে ৪৮ কোটি টাকা লুটপাট

জৈন্তা বার্তা ডেস্ক

প্রকাশিত: ১১/১২/২০২৩ ০৫:৩৩:০৯ AM

এক দিনের পেঁয়াজে কারবারে ৪৮ কোটি টাকা লুটপাট

এক দিনের পেঁয়াজে কারবারে ৪৮ কোটি টাকা লুটপাট।


‘আমরা ব্যবসা করি। কমিশন পাই প্রতি কেজিতে মাত্র ৮০ পয়সা। মোকাম থেকেই দাম বেঁধে দেয়। সেই দামে বিক্রি করতে রাজি না হলে পেঁয়াজ পাঠায় না বর্ডারের সিন্ডিকেট চক্র বা বেপারিরা। ভারতের এক ঘোষণার পরই তারা প্রতি কেজিতে ৮০ টাকা বেশি লাভ করছে।’ পেঁয়াজের দামের ব্যাপারে এভাবেই শ্যামবাজারের আড়তদাররা অভিযোগ করেন।

আড়তদাররা জানান, শ্যামবাজারে গড়ে ২৫ গাড়ি পেঁয়াজ আসে। প্রতি গাড়ির ধারণক্ষমতা ১৬ টন বা ১ হাজার ৬০০ কেজি। সীমান্ত এলাকা ও দেশের ভেতরে বিভিন্ন মোকাম থেকে সারা দেশে দিনে গড়ে ছয় হাজার টন পেঁয়াজ সরবরাহ হয়। এসব পেঁয়াজ থেকে দিনে সিন্ডিকেট অতিরিক্ত প্রায় ৪৮ কোটি টাকা পকেটে ভরছে। 

একই অভিযোগ রাজধানীর অন্য দুই পাইকারি বাজার কারওয়ান বাজার ও কৃষি মার্কেটের আড়তদারদের। তারা বলেন, ভারত বৃহস্পতিবার ঘোষণা দেয় পেঁয়াজ দেওয়া বন্ধ। তার পরই বেপারিরা হুহু করে বাড়াতে থাকেন দাম। ভারতের ৭০ টাকা কেজির পেঁয়াজ শুক্রবার এ দেশে ১৬০ টাকা হয়ে যায়। দেশি ১০০ টাকার পেঁয়াজ বিক্রি করতে থাকেন ১৮০ থেকে ১৯০ টাকায়। গত শনিবার তার চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করেন। রবিবারও আগের দিনের মতো দাম আদায় করেন বেপারিরা, খুচরা পর্যায়ে যা ২০০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত উঠে যায়।

শ্যামবাজারে গেলে মেসার্স আলমাছ ট্রেডার্সের মালিক মো. খোরশেদ আলম দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, ‘জীবনে কখনো এক দিন বা দুই দিনের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম কেজিতে ৮০ থেকে ৯০ টাকায় বিক্রি হতে দেখিনি।’ বাজার চড়া উল্লেখ করে তিনি বলেন, বৃহস্পতিবারের ঘোষণার পরই টালমাটাল হয়ে গেছে পেঁয়াজের বাজার। 

ভারতীয় পেঁয়াজ ১৮০ টাকা কেজি, এত বেশি কেন? শনিবার তো ১৬০ টাকা কেজি ছিল- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে। দেশে আর পেঁয়াজ আসবে না- এমন ঘোষণা আসামাত্র পাবনা, ফরিদপুরের বেপারিরা এবং ভোমরা বন্দরসহ বিভিন্ন বন্দরের বেপারিরা হুহু করে বাড়াচ্ছেন দাম। তারা ২১০ টাকা কেজি বিক্রি করতে বলেছেন। এই দামে রাজি না হলে পেঁয়াজ দিতে চান না। 

অন্য আড়তদাররা বলেন, ‘সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করলেই বাজার স্বাভাবিক হয়ে যাবে। এ ছাড়া মুড়িকাটা দেশি পেঁয়াজ উঠতে শুরু করেছে। তাই এক সপ্তাহ থেকে ১০ দিনের মধ্যে পেঁয়াজের বাজার স্বাভাবিক হয়ে যাবে। দামও ১০০ টাকার নিচে নেমে যাবে। গতকাল শ্যামবাজার, কারওয়ান বাজার ও কৃষি মার্কেটের ব্যবসায়ীরাও এমন কথা বলেন। এ সময় দেখা গেছে প্রায় আড়ত খালি। আগের মতো ক্রেতাও নেই।’

আসলেই ভোক্তাদের পকেট থেকে টাকা লুট আপনারা করছেন কি না- এমন প্রশ্নের উত্তরে আলমাছ ট্রেডার্সের মালিক মো. খোরশেদ আলম বলেন, ‘আমরা কেজিতে মাত্র ৮০ পয়সা কমিশন পাই। এর বাইরে যা লাভ সিন্ডিকেটই করছে। তারাই দাম নির্ধারণ করে দিচ্ছে। তাতে রাজি না হলে পেঁয়াজ দিতে চায় না।’ 

এই ব্যবসায়ী অভিযোগ করে বলেন, ‘পাবনা, ফরিদপুরের বেপারিরা একই কাজ করছেন। তারাও রেট বেঁধে দিচ্ছেন। আমরা শুধু কমিশন পাই। তাদের রেটে রাজি না হলে পেঁয়াজ দিতে রাজি হন না। আমরা কোনো সিন্ডিকেট করি না। আজকে (রবিবার) মুড়িকাটা পেঁয়াজ ১৩০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। এটাও তাদের বেঁধে দেওয়া রেট। বাজার স্বাভাবিক হতে এক সপ্তাহ লাগবে। মুড়িকাটা পেঁয়াজ উঠতে শুরু করেছে। পুরোপুরি উঠলে দাম ১০০ টাকার নিচে চলে আসবে।’

শ্যামবাজারের নর্থব্রুক হল রোডে মেসার্স আমানত ভাণ্ডারে দেখা যায় ভারতীয় বা দেশি কোনো পেঁয়াজ নেই। শুধু বড় কিছু পেঁয়াজ। এ সময় বিক্রয়কর্মী রাজ্জাক এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘বড় বড় সাইজের চীনা পেঁয়াজ ১২০ টাকা কেজি।’ হঠাৎ করে এক দিনের ব্যবধানে এত বেশি দাম কখনো দেখিনি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘মুড়িকাটা পেঁয়াজ উঠতে শুরু করেছে। মৌসুম শুরু হলে দাম কমে যাবে। সপ্তাহখানেক বা ১০ দিন লাগতে পারে।’ 

এভাবে ভোক্তাদের পকেট লুট করছে কে? জানতে চাইলে তিনিও সীমান্তের মোকামের বেপারিদের দায়ী করে বলেন, ‘আমরা কোনো সিন্ডিকেট করি না। কাঁচামালে কোনো সিন্ডিকেট হয় না। যা করার মোকাম থেকেই করা হয়। কারণ আমরা শুধু কেজিতে ৮০ পয়সা কমিশন পাই। কী করলে বাজার স্বাভাবিক হবে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, তাদের ধরলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে। 

পেঁয়াজের বাজারের ব্যাপারে ফরাশগঞ্জ রোডের শ্যামবাজারের মেসার্স আলী ট্রেডার্সের মো. সামসুর রহমানও একই কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘বাজারে সরবরাহ কম। তাই দাম বেড়েই চলেছে। ভারত রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে। এই ঘোষণাটাই সুযোগ নিয়েছে বেপারিরা। তারা মোকাম থেকে পাঠাচ্ছে। আমরা কেজিতে ৮০ পয়সা কমিশন নিয়ে বিক্রি করে দিচ্ছি। এর বাইরে আমাদের কোনো লাভ নেই। মুড়িকাটা পেঁয়াজ ১৩০ টাকা কেজি বিক্রি করছি। শনিবারও এই রকম দাম ছিল।’ 

বিক্রির অবস্থা কেমন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আগে গড়ে ২৫০ থেকে ৩০০ গাড়ি পেঁয়াজ আসত। বর্তমানে একেবারে কমে গেছে। ২৫ গাড়ি হতে পারে। সুনির্দিস্ট করে তিনি বলেন, ‘বৃহস্পতিবার ১০৫ টাকায় এক কেজি পেঁয়াজ বিক্রি করা হয়েছে। সেই পেঁয়াজ শুক্রবার থেকে ১৮৫ টাকা কেজি বিক্রি করছি। এক দিনের ব্যবধানে কেজিতে ৮০ টাকা বেপারিদের পকেটে যাচ্ছে। তাই আমরা সিন্ডিকেট করছি না। যা করার তারাই করছে। এ জন্য তাদের ধরলেই বাজার নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। শুনেছি ভোক্তা অধিদপ্তর শনিবার ১৩৩ ব্যবসায়ীকে জরিমানা করেছে। আরও বেশি জরিমানা করা দরকার।’ 

শ্যামবাজার কৃষিপণ্য আড়ত বণিক সমিতির সভাপতি ও আব্দুল্লাহ বাণিজ্যালয়ের মালিক মো. সহিদ বলেন, ‘বর্তমানে বলা যায় দেশি পেঁয়াজ নেই। সবকিছু বেপারিদের হাতে। আমাদের করার কিছু নেই। যারা এলসি করছেন, তারাই কাছাকাছি বেপারিদের কাছে পেঁয়াজ বিক্রি করে দিচ্ছেন। সেই বেপারিদের কাছ থেকে আমাদের বেশি দামে নিতে হচ্ছে। এ জন্য দামও বেশি পড়ছে। তাদের ধরলে সব ঠিক হয়ে যাবে।’ 

শ্যামবাজারের পেঁয়াজ সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও শ্যামবাজার কৃষিপণ্য আড়ত বণিক সমিতির সহসভাপতি মো. মাজেদ এ প্রতিবেদককে কলেন, ‘যা লাভ সবই বেপারিদের। কাজেই তাদের ধরলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। কারণ তারাই মোকাম থেকে পাঠাচ্ছে পেঁয়াজ। আমাদের ৩০০টির বেশি আড়ত রয়েছে। সবার অবস্থা ও সিস্টেম একই। আমরা শুধু কমিশন পাই।’

তিনি আরও বলেন, ‘ভোক্তাদেরও সচেতন হতে হবে। দেখা যায় দাম বাড়লেই বেচাকেনার ধুম লেগে যায়, অনেকে বেশি করে নিতে শুরু করে। এটা বন্ধ করতে হবে। এই বাজার থেকে সারা ঢাকা শহরে পেঁয়াজসহ আদা, আলু, রসুন সরবরাহ হয়। কাজেই খুচরা বাজারে আরও কেজি ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেশি দামে ভোক্তাদের কিনতে হয়।’ 

এমন পরিস্থিতিতে আসলে ভোক্তাদের পকেট থেকে কত টাকা বের হচ্ছে? এ ব্যাপারে মো. মাজেদ বলেন, ‘প্রতিদিন সারা দেশে পাঁচ থেকে ছয় হাজার টন পেঁয়াজ লাগে। আমাদের বাজারে গড়ে ২৫ গাড়ি পেঁয়াজ আসছে। প্রতি গাড়িতে ১৫ থেকে ১৬ টন পেঁয়াজ ধরে। টনে এক হাজারের বেশি কেজি পেঁয়াজ হয়। বেপারিরা কেজিতে ৮০ টাকা বেশি নিলে মোট ৪৮ থেকে ৫০ কোটি টাকা তাদের পকেটে যাচ্ছে। এ ছাড়া কারওয়ান বাজার ও কৃষি মার্কেটেও বেপারিরা পেঁয়াজ দিয়ে থাকেন।’ 

এদিকে কারওয়ান বাজারের মেসার্স মিনহাজ ট্রেডার্সের মালিক মো. খলিল খবরের কাগজকে বলেন, ‘আজকে (রবিবার) আরও বেশি রেট। ভারতের পেঁয়াজ ১৮০ টাকা কেজি, যা শনিবার ১৬০ টাকা কেজি বিক্রি করা হয়েছে। তবে দেশিটার দাম বাড়েনি। শনিবারের মতো ২০০ থেকে ২০৫ টাকা কেজি বিক্রি করা হচ্ছে। সেই পেঁয়াজ দুই হাত বদল হয়ে খুচরা পর্যায়ে কেজি ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর ভারতেরটা ২১০ টাকা বলে খুচরা বিক্রেতারা জানান।

এদিকে রাজধানীর অন্য পাইকারি বাজারের মোকাম কৃষি মার্কেটের মেসার্স নিউ বিক্রমপুর বাণিজ্যালয়ের মো. জসিম এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘এলসি করা ভারতের পেঁয়াজ ১৬৫ টাকা কেজিতে বিক্রি করা হচ্ছে। গতকালও এই রকম দামে বিক্রি করা হয়েছে। এ বাজারে দুই-তিনটা ট্রাক আসে। আমরা কয়েকটা আড়তে বিক্রি করে থাকি। খুচরা পর্যায়ে দাম তো বাড়বেই।’ 

জৈন্তাবার্তা/জেএ



শীর্ষ সংবাদ:

সুরমার দুই পাড়ে সবুজের হাতছানি, শুরু হচ্ছে সবুজ বিপ্লব
‘বেগম খালেদা জিয়া গণতন্ত্র রক্ষার আপসহীন প্রতীক’ - খন্দকার মুক্তাদির
শাহজালালের মাজারে কোটি টাকার দান, এবার হিসাব হবে নতুন নীতিমালায়
‘নৃ*শংস হ*ত্যাকা*ণ্ডের সঙ্গে জড়িত কাউকে ছা*ড় দেওয়া হবে না’: প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী
খালেদা জিয়ার আপোষহীন নেতৃত্বের কারণেই দেশে গণতন্ত্র ফিরেছে’: কাইয়ুম চৌধুরী
চা শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিগুলো সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে- শ্রমমন্ত্রী
খোলা হয়েছে শাহজালাল (রহ.) মাজারের দানবাক্স, চলছে গণনা
সিলেটে তিন খু'নের নেপথ্যে জমির বি'রোধ?
হা'মের উপসর্গে সিলেটে আরও দুই শিশুর মৃ'ত্যু
রায়নগর ট্রিপল হ*ত্যাকা*ণ্ড: সম্পত্তি বি*রোধের অ*ভিযোগ, ত*দন্তে নতুন প্রশ্ন