কাদামাটির হাঁড়ি পাতিল বিক্রি করে সংসার চলে জন্টুর
শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ০৪:৩১ PM

কাদামাটির হাঁড়ি পাতিল বিক্রি করে সংসার চলে জন্টুর

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২৩/১২/২০২৩ ০৫:৪৯:৩২ AM

কাদামাটির হাঁড়ি পাতিল বিক্রি করে সংসার চলে জন্টুর

কাদামাটির হাঁড়ি পাতিল বিক্রি করে সংসার চলে জন্টুর।. ছবি : জৈন্তা বার্তা


মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ পৌর এলাকার কুমড়াকাপন (কুমারপাড়া) এলাকার পূর্ব পুরুষের পেশাকে আজও আঁকড়ে ধরে আছেন জন্টু। তাদের ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে এখানো তৈরি করে আসছেন কাদামাটির পণ্যসামগ্রী। মাটি দিয়ে হাঁড়ি-পাতিল, কলসি, থালা-বাটি, সরা-বাসন প্রভৃতি তৈরিকৃত জিনিসপত্র বিক্রি করেই সংসার চলে তাদের।

দীর্ঘকালের পথপরিক্রমা! জীবনসায়াহ্নে এসেও মৃৎশিল্পের পেশাকে আজো জীবনের সঙ্গী বলেই মনে হয় তার। প্রতিদিন ভোর হলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন তিনি। সেই মানুষের নাম জন্টু পাল। মাটি ভালোবেসেই তিনি পার করে দিচ্ছেন একটা জীবন। তার সংসারে রয়েছে এক মেয়ে ও এক ছেলে। বড় মেয়ে ৬ষ্ট শ্রেণি, ছেলে ২য় শ্রেণিতে পড়ে।

মাটির জিনিসপত্র তৈরি ও বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন জন্টু পাল। স্ত্রী রত্না পাল মাটির বিভিন্ন জিনিসপত্র তৈরি করে দেন, আর স্বামী জন্টু পাল জীবিকার তাগিদে প্রতিদিনই কোনো না কোনো স্থানে ছুটে যান মাটির তৈরি বিভিন্ন ধরণের জিনিসগুলো বিক্রি করতে। নিজ গ্রাম থেকে প্রতিদিনই কাঁদে করে মাটি দিয়ে হাঁড়ি-পাতিল, কলসি, থালা-বাটি, সরা-বাসন প্রভৃতি নিয়ে গ্রাম থেকে কয়েক কিলোমিটার দূর-দূরান্তে হেঁটে হেঁটে এসব জিনিসপত্র বিক্রি করেন।

শনিবার (২৩ ডিসেম্বর) সকালে দেখা গেল পাকা সড়কের ধার ধরে ছুটে চলেছেন ফেরিওয়ালা জন্টু পাল। কাঁধে করে ভারবহনের কারণে তাকে দূর থেকে কিছুটা কুঁজো মনে হলো।


কথা প্রসঙ্গে তিনি বললেন, প্রায় চল্লিশ বছর ধরে মাটির জিনিসপত্র বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছেন। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে জিনিসপত্র রেডি করে বাড়ি থেকে বিভিন্ন গ্রামে ছুটে যান। সপ্তাহে ৫দিন। দুদিন বাড়িতে থেকে অন্যান্য কাজ করেন। 

এই কঠিন পেশা কেন? এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আর তো কোনো কাজ তেমনভাবে শিখিনি। আর মাটির জিনিসপত্র বিক্রি করতেই আমার খুব ভালো লাগে। তাই তো আজও ছাড়তে পারি না এই পেশা। আমার বাড়িতেও আমি মাটির জিনিসপত্র বেশি ব্যবহার করি। শুনেছি প্লাস্টিকের চেয়ে এই মাটির জিনিসগুলো নাকি মানুষের শরীর ও স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী।’

জন্টু পাল বলেন, কাঁদের এই ভার মালামাল তৈরী করতে খরচ হয়েছে প্রায় ৬শত টাকা। সারাদিনে বিক্রি করতে পারলে মোটামুটি এক হাজার টাকায় সবগুলো মাটির জিনিস বিক্রি করা সম্ভব হবে। তাতে দৈনিক ৫০০-৭০০ টাকা গড়ে আয় হয়। কিন্তু বর্তমান বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের যে দাম এই আয়ে কোনো ভাবে সামলাতে পারি না।

তিনি আরও বলেন,‘এখন তো মাটির জিনিসপত্র তেমন চলে না। ইদানীং প্রযুক্তির ব্যবহার ও আধুনিকতার ছোঁয়ায় দিন দিন তা হারিয়ে যেতে বসেছে। দুঃখ প্রকাশ করে এই বেদনাভরা কথাগুলো বিনয়ের সাথে বলেন জন্টু পাল।’


জন্টু পালের স্ত্রী রত্না সাথে কথা হলে তিনি বলেন, ‘এ পেশায় জীবনযাপন কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। মৃৎশিল্প তৈরির উপকরণ যেমন মাটি সঙ্কট ও খড়ির দাম বেশি হওয়ায় এর দামও বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে মাটির তৈরি জিনিসপত্রের চাহিদাও কমেছে। তার পরও কষ্ট করে ছেলে মেয়েদের স্কুলে পাঠান। তার স্বপ্ন লেখাপড়া শিখে ছেলেমেয়রা একদিন বড় সরকারি চাকরি করবে। তখন আর তাকে কষ্ট করতে হবে না। এই আশাতেই জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করে সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন তিনি।’

অসহায় রত্না পাল জানান,‘বাজারে আগের মত এখন আর মাটির জিনিস বিক্রি হয়না। তারপর কোন রকম কষ্ট করে সংসার চলছে। তার স্বামী মাটির তৈরী জিনিসগুলো প্রতিদিন পায়ে হেটে বিক্রি করতে ছুটে যান এক প্রান্ত গতে অন্য প্রান্তে।’

তিনি আরো জানান, মাটির তৈরি জিনিস বাজারে বিক্রি করে ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার যোগান দিচ্ছি। অনেক সময় ঘরে চাল না থাকার কারণে খেয়ে না খেয়ে দিনাতিপাত করতে হয় তাদের বলেও জানান তিনি।’

জৈন্তাবার্তা/জেএ



শীর্ষ সংবাদ: