ছবি : নিজস্ব
নদী, খাল বিল কিংবা জলাশয় নয়, আশেপাশে কৃষি জমিও নেই। চারপাশ ইটপাথরের দেয়ালে ঘেরা। সাজানো গোছানো পরিপাটি এক পরিবেশে সিলেট নগরে ১৫ ঘন্টা মাছ ধরলেন ৪২ জন সৌখিন মৎস্য শিকারী । শুধু ৪২ জন নন, তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে সহযোগি ছিলেন আরও অন্ততঃ তিন থেকে পাঁচজন করে। আর তাদের এই মাছ ধরার মিশন প্রত্যক্ষ করতে দর্শনার্থীদের উপস্থিতিও ছিলো চোখে পড়ার মতো। সব মিলিয়ে দর্শনার্থীরা এক রোমাঞ্চকর মুহুর্ত পার করেছেন ধোপাদীঘি ওয়াকওয়েতে থাকা দীঘিকে ঘিরে।
শনিবার সকাল তখন আটটা। ধোপাদিঘীর পারে গিয়ে চোখে পড়ল চিরাচরিত দৃশ্যের বাইরে এ যেন আরেক রূপ। পুরো দীঘির ওয়াকওয়েতে মৎস্য শিকারীদের ভীড়। ওয়াকওয়ে জুড়ে শিকারীদের মালপত্র। আবার কেউ কেউ এসব মালপত্রের পাশে ঘুমোচ্ছেন, ঝিমুচ্ছেন। কারণ আগের রাত ১২ টা থেকে শুরু হয়েছে মাছ ধরা। ওয়াকওয়ে কর্তৃপক্ষ ১৫ ঘন্টার জন্য মৎস্য শিকারীদের কাছে ভাড়া দিয়েছেন এই দিঘী। এই ১৫ ঘন্টায় যা মাছ ধরবেন সব তাদের। বিনিময়ে প্রত্যেককে ১০ হাজার টাকা করে গুণতে হয়েছে। এই টাকা দিয়ে নাম রেজিস্ট্রেশন করেছেন সবাই । সৌখিন মৎস্য শিকারী সমিতির ব্যবস্থাপনায় এখানে ৪২ জন নাম রেজিস্ট্রেশন করেন। এর আগে ইজারাদার সংস্থা ঈষাণ এন্টারপ্রাইজ ১৫ ঘন্টার জন্য মাছ ধরতে অবমুক্তির ঘোষণা দেন।। তাদের উদ্যোগেই মাছ ধরতে সিলেটের বিভিন্ন স্থান আসেন শিকারীরা।
হবিগঞ্জের মাধবপুরের প্রবীণ শিক্ষক শহীদুল হক এসেছেন শুক্রবার রাতেই। বড়শি,বিছানাপত্র,মাছের খাবার, সহযোগী সঙ্গী-সাথী নিয়েই এসেছেন। তিনি জানালেন সব সময় মাছ ধরেন গ্রাম্য পরিবেশে। এখানে একটি সুন্দর , নিরাপদ ও ঝামেলা মুক্ত পরিবেশ পেয়েছেন। এজন্য ভালো লাগছে। সব মিলিয়ে তাঁর খরচ ১৫ হাজার টাকার মতো যাবে। মাছ ধরেছেন ৫ থেকে ৭ হাজার টাকার মতো হবে।
সিলেট নগরের আখালিয়া এলাকার সৌখিন মৎস্য শিকারী দাদু বাবু। তিনি তার ৫/৬জন সঙ্গী সাথী নিয়ে রাত থেকেই মাছ ধরছেন। তাঁর সঙ্গীদের কেউ বড়শি টানছেন, কেউ বড়শিতে মাছ ধরার খাবার লাগাচ্ছেন। আবার কেউ নিতান্তই প্রিয় মাছ শিকারী বন্ধুটিকে সঙ্গ দিতে এসেছেন। দাদু বাবু জৈন্তা বার্তা’কে জানালেন যেখানেই মাছ ধরার সুযোগ পান তারা যান। এখানেও কাউন্সিলর মখলিছুর রহমান কামরানের মাধ্যমে তিনি এসেছেন। শুক্রবার রাত ১২ টা থেকে সকাল সাড়ে আটটা পর্যন্ত ধরা মাছগুলো জালের তৈরী একটি ব্যাগে রেখেছেন। রুই,কাতলা, পাঙ্গাসসহ নানা ধরণের মাছ ধরা পড়েছে বড়শিতে।
গোলাপগঞ্জের বাদে রণকেলী থেকে মাছ ধরতে আসা সেলিম আহমদ নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে ৪/৫ জনকে দেখা যায়। আরিফ নামে তাঁর এক ভাতিজাকে দেখা গেলো মাছের খাবার তৈরী করছেন। আরিফ জানান, শুধু রেজিস্ট্রেশন ফি ১০ হাজার টাকাই নয়, অনেকের আরও ৫/১০ হাজার টাকা লাগছে খরচ। যেমন একটা ঘি ৬শ টাকা দিয়ে কিনেছি। এখানে ছাতু, ফিড, ডাল,মধুসহ নানা উপাদান রয়েছে। সব গুলোই কিনতে হয়। আসা যাওয়ার খরচ, খাবার, চা নাস্তা অনেক কিছুই খরচ আছে। সব মিলিয়ে খূব লাভ হবে এটা নয়। শখের বসেই তারা এসেছেন।
মৎস্য শিকারীদের যিনি জড়ো করেন তিনি হচ্ছেন সৌখিন মৎস্য শিকারী মো. আয়াজ মিয়া। তার বাসা সিলেট নগরের কুমারপাড়া ঝরনারপারে। তিনি জানান সৌখিন মৎস্য ব্যবসায়ীদের একটা কমিটি রয়েছে। সেই কমিটিই এই উদ্যোগ নিয়েছে। আয়াজ মিয়া জানান, আমরা বহু জায়গায় মাছ ধরতে যাই। কিন্ত এখানকার মতো উন্নত সুন্দর পরিবেশ কোথাও পাইনি।এখানে অনেকে ভালোই মাছ ধরেছেন। কেউ কেউ হয়তো কিছুটা কম ধরেছেন। সব মিলিয়ে আমরা সন্তুষ্ট। এধারা যেন অব্যাহত থাকে তিনি সেটি দাবী রাখেন কর্তৃপক্ষের কাছে।
ধোপাদীঘির ওয়াকওয়ের ইজারাদার প্রতিষ্ঠান ঈষাণ এন্টারপ্রাইজ এর পার্টনার মাসুম আহমদ জানান, তারা ওয়াক ওয়েতে একটা ব্যতিক্রমী আয়োজন করেছেন। এ উপলক্ষে দর্শনার্থীারাও এসেছেন। তাদের অনেক ভালো লেগেছে। আমরা চাই এখানে সুস্থ ধারার মানুষদের বিচরণ বাড়ুক। লাভ লোকসানের হিসেব খুব কম করেছি। অনেক ব্যয় হয়েছে। আমরা স্টিল আর এ্যাঙ্গেল দিয়ে শিকারীদের বসার ব্যবস্থা করেছি। নিরাপত্তার জন্য প্রহরী নিয়োগ করেছি। আপ্যায়নের ব্যবস্থা করেছি। আমরা সৌখিন শিকারী ভাই, এবং দর্শনার্থীদের জন্য পরিবেশ তৈরী করতে অনেক চেষ্টা করেছি। সে তুলনায় আমাদের খুব একটা লাভ হয়নি। তবে আনন্দ পেয়েছি মানুষের উপস্থিতি ও সাড়া পেয়ে। আশা করি ভবিষ্যতেও ভালো আয়োজনে এরকম সাড়া পাবো।
এম সি




