ছবি : নিজস্ব
১৯৮৬ সালে ক্লাস টু’তে পড়তেন। বাড়ীর পাশের বাজারে ঝড়ের ফলে বিদ্যুতের তার রাস্তায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে। আর সেখানেই বিদ্যুতস্পৃষ্ট হন ইদ্রিস আলী। এরপর কোনো রকমে তাকে বাঁচানো গেলের তার এক হাত এক পা রক্ষা করা যায়নি। কেটে ফেলতে হয়। সেই থেকে এক পা দিয়েই হাঁটেন ইদ্রিস আলী। আজও চলছে তার জীবন সংগ্রাম। স্ত্রী সন্তান আর মাকে নিয়ে চলা সংসারের পুরো ব্যয় তাকেই নির্বাহ করতে হয়। ইদ্রিস আলীর এই কঠিন জীবনযাপন যারা দেখেন তাদের প্রশ্ন আর কত এক পায়ে চলবেন অসহায় ইদ্রিস আলী?
ছবির এই লোকটিকে চিনেন না- সিলেট নগরে এমন মানুষ খুব কম আছেন। এক পা দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে সিলেট নগরের এক প্রাপ্ত থেকে আরেক প্রান্তে প্রতিদিন ছুটে চলেন। হাত পাতেন মানুষের দ্বারে দ্বারে। তার এই অসহায়ত্ব মানুষের মনে দাগ কাটে। কিন্তু সিলেটে সমাজ সেবা অধিদপ্তরের লোকদেরও চোখ পড়ে না তার উপর। যেখানে সরকার কোটি কোটি টাকা ব্যয় করছে ভিক্ষা বৃত্তি বন্ধে সেখানে ইদ্রিস আলীদের কষ্টের জীবন যেন শেষ হতে চাইছেনা।
শনিবার (২ সেপ্টেম্বর) দুপরে সিলেট নগরের তালতলা সড়কে হেঁটে হেঁটে ভিক্ষা করছিলেন ইদ্রিস আলী। এসময় কথা হলো তার সঙ্গে। তিনি জৈন্তাবার্তাকে জানালেন তাঁর দুঃখে ঘেরা জীবনের নানা গল্প। বললেন, ওই দুর্ঘটনার পর আর লেখাপড়া হয়নি। জীবনের মোড় অন্যদিকে ঘুরে যায়। এক ধরণের বোঝার মতোই জীবন চলছিলো। ১৯৯৮ সালে সিলেট আসেন ইদ্রিস আলী। তখন থেকে ভিক্ষাবৃত্তিই তাঁর পেশা। আর এ ভিক্ষাবৃত্তিতেও তার একটি পরিকল্পনা রয়েছে। সপ্তাহে সাত এলাকায় ৭দিন যান। এজন্য তার রুটিন রয়েছে। এক এলাকায় বার বার, ঘন ঘন গেলে মানুষ বিরক্ত হতে পারে-সে আশংকা থেকেই তিনি প্রতিদিন এক এলাকায় যান না।
ইদ্রিস আলী জানান, তিনি ২০০৩ সালে বিয়ে করেন। তাঁর সংসারে ৩ সন্তান রয়েছে। ২ ছেলে আর একমেয়েসহ স্ত্রী আকলিমা খাতুন থাকেন নিজ বাড়ী ময়মনসিংয়ের ফুলবাড়ীয়ার কইয়ার ছালা গ্রামের বাড়িতে। সঙ্গে তার মা নবীজান বিবিও রয়েছেন। সিলেটে তিনি একাই থাকেন আইডিয়াল হসপিটেলের পিছনে। মাঝে মাঝে বাড়িতে যান। বললেন ভিক্ষাবৃত্তি করে যা পান তা দিয়ে কোনো রকম সংসার চলে। নিজেরই থাকা খাওয়ায় চলাফেরায় ১০/১৫ হাজার টাকা লাগে মাসে। পরিবারের খরচ, সন্তানদের লেখাপড়ার খরচতো আছেই। তিনি জানান, প্রতিবন্ধী হিসেবে একটি ভাতা পান গ্রামের বাড়িতে। তাও যৎ সামান্য। এর বাইরে ভিক্ষাবৃত্তিই আয়ের মুল উৎস।
ইদ্রিস আলী জৈন্তাবার্তাকে বলেন, এক পা তো নেই। একটি হাত না থাকায় ক্র্যাচও ব্যবহার করতে পারেন না। ফলে তিনি এক পায়ের উপর ভর করে লাফিয়েই চলতে হয়। এজন্য পুরোটা শরীর প্রচন্ড ঝাঁকুনি খায়। কিন্ত কি করব। যতদিন দম আছে ততদিনতো চলতে হবে। তবে এভাবে কতদিন চলতে পারব তা জানিনা। যদি কোনো একটা উপায় হতো তবে এই হাটাহাটি, দূয়ারে দূয়ারে ভিক্ষা বন্ধ করে দিতাম। আমি বুঝি, আমার অবস্থা দেখে অনেক মানুষের কষ্ট হয়। আফসোস করেন। আমারও অনেক সময় খুব খারাপ লাগে বার বার মানুষের দুয়ারে যাই। সরকারী বা বেসরকারীভাবে যদি আমার একটা কর্ম সংস্থানের ব্যবস্থা হতো, উপার্জনের বিকল্প পেতাম। তাহলে খুব খুশি হতাম। ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে দিতাম। শুনেছি সরকার ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধে অনেক টাকা ব্যয় করছে। আমি যদি সে কর্মসূচির অন্তর্ভূক্ত হতাম তাহলে খুব খুশি হতাম।
এম সি




