ছবি:সংগৃহীত
‘আমাদের বাঁচান। আমরা দেশে ফিরতে চাই।’- মিশরের মারসা মাতরুহ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন জীবিত বাংলাদেশিদের এমন আকুতি যেন ভূমধ্যসাগরের ভয়াবহ মৃত্যুযাত্রার নির্মম চিত্র তুলে ধরছে। লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে খাবার ও পানির সংকটে নৌকায় অন্তত ৯ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে। তাদের মরদেহ সাগরে ফেলে দিতে বাধ্য হয়েছেন জীবিতরা।
এদিকে নিহতদের মধ্যে সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার সাত যুবকও থাকতে পারেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। তাদের এখনো সন্ধান না মেলায় ধারণা করা হচ্ছে, ওই সাত যুবকেরও মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। তবে তাদের মৃত্যুর বিষয়টি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। নিখোঁজদের স্বজনরা চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছেন।
জানা গেছে, গত ৩ আগস্ট রাতে ৪২ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে নিয়ে একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা লিবিয়ার তাবারুক উপকূল থেকে গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করে। নৌকাটিতে ৩৮ জন বাংলাদেশিসহ মোট ৪২ জন ছিলেন।
যাত্রাপথে নৌকাটি ঝড়ের কবলে পড়ে। এতে নৌকায় থাকা খাবার ও পানির মজুত সাগরে ভেসে যায়। এরপরও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাত্রা অব্যাহত রাখেন তারা। গ্রিসের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর হঠাৎ নৌকার ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। ফলে নৌকাটি সাগরের ঢেউ ও স্রোতের সঙ্গে ভাসতে থাকে।
টানা নয় দিন ভূমধ্যসাগরে ভেসে থাকার পর স্রোতের টানে নৌকাটি মিশরের মারসা মাতরুহ উপকূলের কাছে পৌঁছে যায়। পরে মিশরের নিরাপত্তা বাহিনী নৌকায় থাকা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের উদ্ধার করে।
উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশিদের মধ্যে ১৮ জনকে মারসা মাতরুহ জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় খাবার ও পানির সংকট এবং লবণাক্ত পানিতে অবস্থানের কারণে তাদের অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাথারিয়া গ্রামের আব্দুল হেকিমের ছেলে আব্দুল করিম ভয়াবহ সেই অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি জানান, গ্রিসের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর নৌকার ইঞ্জিন বিকল হয়ে গেলে তারা আর সামনে এগোতে পারেননি। একপর্যায়ে খাবার ও পানি পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে আব্দুল করিম বলেন, ‘আমাদের কাছে খাবার বা পানি কিছুই ছিল না। চোখের সামনে নয়জন বাংলাদেশি মারা গেছেন। তাদের মরদেহ সাগরে ফেলে দিতে হয়েছে। পরে আরও দুজন মারা যান।’
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ সময় লবণাক্ত পানিতে ভেসে থাকার কারণে তাদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে ক্ষত ও পচন দেখা দিয়েছে। বর্তমানে মিশরের চিকিৎসকরা তাদের চিকিৎসা দিচ্ছেন এবং খাবারের ব্যবস্থাও করছেন।
দেশে ফেরার আকুতি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের বাঁচান। আমরা দেশে ফিরে যেতে চাই।’
এদিকে শান্তিগঞ্জের নিখোঁজ সাত যুবকের পরিবারগুলোর মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। বিভিন্ন সূত্রে তাদের ওই নৌযাত্রার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার তথ্য পাওয়া গেলেও এখন পর্যন্ত তাদের নাম-পরিচয় কিংবা জীবিত-মৃত অবস্থার বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
স্বজনদের আশঙ্কা, দীর্ঘ নয় দিন খাবার ও পানির সংকটে সাগরে ভেসে থাকার সময় অন্যদের মতো ওই সাত যুবকেরও মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয় নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।
নিখোঁজদের পরিচয় ও বর্তমান অবস্থান নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছে বলে জানা গেছে।
জৈন্তা বার্তা/ ওয়াদুদ




