ছবি:সংগৃহীত
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পাহাড়-নদী, ঝরনা, হাওর, চা-বাগান, বনাঞ্চল, পাথরবিছানো নদী, ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক স্থাপনা-বৈচিত্র্যময় পর্যটন সম্পদে সমৃদ্ধ সিলেট। জাফলং, রাতারগুল, বিছনাকান্দি, লালাখাল, মাধবকুণ্ড, তামাবিলসহ অসংখ্য পর্যটনকেন্দ্র প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকদের আকর্ষণ করে। রয়েছে শাহজালাল (র.) ও শাহপরান (র.)-এর মাজারসহ ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক পর্যটনেরও বিপুল সম্ভাবনা।
তারপরও সম্ভাবনার তুলনায় সিলেটের পর্যটন শিল্প কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বিকশিত হয়নি। পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, যোগাযোগব্যবস্থার ঘাটতি, পর্যাপ্ত স্যানিটেশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব, নিরাপত্তা সংকট, অপরিকল্পিত স্থাপনা এবং পরিবেশের ওপর চাপ এ খাতের বিকাশে বড় বাধা হয়ে আছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু নতুন পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলা নয়, বিদ্যমান কেন্দ্রগুলোকে পরিকল্পিত ও টেকসই পর্যটন ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে।
পর্যটনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিলেটের সবচেয়ে বড় শক্তি এর বৈচিত্র্য। একই ভ্রমণে একজন পর্যটক পাহাড়, নদী, ঝরনা, চা-বাগান, বন ও ধর্মীয় স্থাপনা দেখার সুযোগ পান। ফলে সিলেটকে শুধু বিচ্ছিন্ন কয়েকটি পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে না দেখে একটি সমন্বিত পর্যটন অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।
এ জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ‘সিলেট পর্যটন মহাপরিকল্পনা’। কোন এলাকায় কী ধরনের পর্যটন হবে, কোথায় অবকাঠামো গড়ে উঠবে, কোথায় পরিবেশ সংরক্ষণ করতে হবে, পর্যটকের ধারণক্ষমতা কত-এসব বিষয় নির্ধারণ করে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
অবকাঠামোতে ঘাটতি
সিলেটের অনেক পর্যটনকেন্দ্রে পর্যটকের তুলনায় নাগরিক সুবিধা অপ্রতুল। পরিচ্ছন্ন টয়লেট, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত পার্কিং, বিশ্রামাগার, তথ্যকেন্দ্র, খাবারের মানসম্মত ব্যবস্থা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অনেক ক্ষেত্রেই পর্যাপ্ত নয়। ফলে পর্যটকের সংখ্যা বাড়লেও পর্যটনকেন্দ্রগুলো থেকে কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক সুবিধা সৃষ্টি হচ্ছে না।
পর্যটনকেন্দ্রগুলোর প্রবেশপথ ও শেষ পর্যায়ের সড়ক যোগাযোগও উন্নত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে অনেক পর্যটনকেন্দ্রে যাতায়াতে দুর্ভোগ বাড়ে। পর্যটকদের জন্য নির্দিষ্ট পরিবহনব্যবস্থা ও ভাড়ার তালিকা থাকলে হয়রানি কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিরাপত্তা ও পরিবেশ সংরক্ষণ জরুরি
পর্যটন শিল্পের বিকাশে নিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নদী, ঝরনা ও পাহাড়ি এলাকায় পর্যটকদের জন্য প্রশিক্ষিত লাইফগার্ড, উদ্ধারকারী দল, জরুরি চিকিৎসা ও পর্যটকবান্ধব পুলিশিং ব্যবস্থা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। অতিরিক্ত পর্যটকের চাপ, প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য, নদী ও জলাশয় দূষণ এবং অপরিকল্পিত স্থাপনা পর্যটনকেন্দ্রগুলোর প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। প্রকৃতিকে নষ্ট করে পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলা হলে দীর্ঘমেয়াদে সেটিই পর্যটন শিল্পের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
এ কারণে প্রতিটি পর্যটনকেন্দ্রের ধারণক্ষমতা নির্ধারণ করে সেই অনুযায়ী পর্যটক প্রবেশের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব স্থাপনা নির্মাণে গুরুত্ব দিতে হবে।
চা-পর্যটনে নতুন সম্ভাবনা
সিলেটের চা-বাগানগুলোকে পর্যটনের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করা যেতে পারে। বর্তমানে অনেক পর্যটক রাস্তা থেকে চা-বাগানের সৌন্দর্য উপভোগ করেই ফিরে যান। কিন্তু পরিকল্পিতভাবে ‘টি ট্যুরিজম’ চালু করা গেলে চা-বাগানকে ঘিরে নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি হতে পারে।
চা-বাগান পরিদর্শন, চা তৈরির প্রক্রিয়া দেখানো, চা স্বাদ গ্রহণ, স্থানীয় খাবার, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য তুলে ধরার মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন অভিজ্ঞতা তৈরি করা সম্ভব। এতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে।
স্থানীয় মানুষকে সম্পৃক্ত করার তাগিদ
পর্যটন শিল্পের সুফল স্থানীয় জনগণের কাছে পৌঁছানোও গুরুত্বপূর্ণ। পর্যটনকেন্দ্রের আশপাশের বাসিন্দাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে পর্যটক গাইড, হোমস্টে, স্থানীয় খাবারের রেস্তোরাঁ, নৌকা ভ্রমণ, হস্তশিল্প ও স্থানীয় পণ্য বিক্রির সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে।
এতে একদিকে স্থানীয় মানুষের আয় বাড়বে, অন্যদিকে পর্যটকরা সিলেটের স্থানীয় জীবন, খাবার ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবেন।
গড়ে উঠতে পারে পর্যটন সার্কিট
সিলেটের পর্যটনকে আরও আকর্ষণীয় করতে ‘ট্যুরিজম সার্কিট’ চালু করা যেতে পারে। যেমন-সিলেট শহর, শাহজালাল (র.)-এর মাজার, চা-বাগান, রাতারগুল, জাফলং, লালাখাল ও বিছনাকান্দিকে একটি সার্কিটের আওতায় আনা যায়।
দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য তিন, চার ও পাঁচ দিনের আলাদা প্যাকেজ তৈরি করা হলে পর্যটকের অবস্থানকাল বাড়বে। এতে হোটেল, পরিবহন, রেস্তোরাঁ, গাইড, স্থানীয় বাজার ও অন্যান্য সেবাখাতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বাড়বে।
ডিজিটাল প্রচারণায় গুরুত্ব
বর্তমান সময়ে পর্যটন প্রচারণার বড় মাধ্যম ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। সিলেটের পর্যটনকেন্দ্রগুলো নিয়ে একটি সমন্বিত ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপ চালু করা যেতে পারে। সেখানে পর্যটনকেন্দ্রের অবস্থান, যাতায়াত ব্যবস্থা, থাকার জায়গা, খাবার, গাইড, প্রবেশমূল্য, জরুরি নম্বর ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত তথ্য থাকবে।
একই সঙ্গে দেশ-বিদেশে ডিজিটাল প্রচারণা বাড়ানো প্রয়োজন। সিলেটের প্রকৃতি, চা, লোকসংস্কৃতি, বাউলগান, খাবার ও ঐতিহ্যকে তুলে ধরে আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারে আলাদা ব্র্যান্ডিং করা যেতে পারে।
প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
সিলেটের পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে জেলা প্রশাসন, পর্যটন করপোরেশন, সিটি করপোরেশন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, পরিবেশ অধিদপ্তর, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ব্যবসায়ী ও বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মতে, সিলেটের পর্যটনের মূল সমস্যা পর্যটন আকর্ষণের অভাব নয়; বরং বিদ্যমান সম্পদকে পরিকল্পিত ও টেকসই পর্যটন পণ্যে রূপ দেওয়ার ঘাটতি। তাই নতুন নতুন পর্যটন স্পট তৈরির পাশাপাশি বিদ্যমান কেন্দ্রগুলোর অবকাঠামো উন্নয়ন, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করার ওপর জোর দেওয়া জরুরি।
সঠিক পরিকল্পনা ও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে পর্যটন শুধু বিনোদনের ক্ষেত্র নয়, সিলেটের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের অন্যতম বড় খাতে পরিণত হতে পারে। একই সঙ্গে দেশের পর্যটন মানচিত্রে সিলেটকে আরও শক্তিশালী অবস্থানে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
জৈন্তা বার্তা/ ওয়াদুদ




