লিবিয়া থেকে মরতে মরতে বেঁচে ফিরলেন জগন্নাথপুরের মামুনুর
শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ১০:০৯ PM

২২ মাসে ৪৫ লাখ খোয়া

লিবিয়া থেকে মরতে মরতে বেঁচে ফিরলেন জগন্নাথপুরের মামুনুর

অতিথি প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২১/১২/২০২৩ ০৯:৫০:৪২ AM

লিবিয়া থেকে মরতে মরতে বেঁচে ফিরলেন জগন্নাথপুরের মামুনুর

লিবিয়া ফেরত জগন্নাথপুরের মামুনুর রহমান।


সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার ইকড়ছই গ্রামের বাসিন্দা মতিউর রহমানের ছেলে মামুনুর রহমান। স্বপ্ন ও গন্তব্য ছিলো ইতালি। পরিবারের ভাগ্য বদলানোর জন্য দালালদের মাধ্যমে লিবিয়া গিয়েছিলেন যুবক মামুনুর রহমান। কিন্তু লিবিয়ায় দালাল চক্রের জালে ফেঁসে ৪৫ লাখ টাকা খুইয়ে ২২ মাস বন্দিজীবন কাটিয়েছেন তিনি। এরপর নিঃস্ব অবস্থায় দেশে ফেরেন তিনি।

নির্যাতন ও প্রতারণার শিকার হয়ে বৃহস্পতিবার জগন্নাথপুর থানায় ১৪ জনের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জগন্নাথপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, বিষয়টির তদন্ত করে আইনানুগ পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

নিজের ওপর নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে মামুনুর রহমান বলেন, ২০২১ সালের এপ্রিলে জগন্নাথপুর উপজেলার আলাগদি গ্রামের মানব পাচারকারী মুজিবুর রহমানের প্ররোচনায় সাড়ে আট লাখ টাকার চুক্তিতে ইতালি যাওয়ার উদ্দেশ্যে লিবিয়াতে পৌঁছান। লিবিয়ায় পৌঁছে দালালকে আরও চার লাখ টাকা দেন। সেখানে দুই মাস পার হলে জাহেদ নামের এক দালালের ক্যাম্পে পাঠানো হয় তাঁকে। কিছুদিন পরে আমিনুল ও রাজ্জাক দালালের আস্তানায় নিয়ে যাওয়া হয়। এ রকম কয়েকটি ক্যাম্পে তাঁকে রাখা হয়। এসব ক্যাম্পে জিম্মি করে গেমের (নৌকায় করে সাগর পাড়ি দেওয়ার প্রক্রিয়া) কথা বলে মুজিবুর আরও ছয় লাখ টাকা নেন। পাঁচ মাস পর এক রাতে গেমের কথা বলে নৌকায় তোলা হয়। কিছুক্ষণ সাগরে ঘোরাঘুরির পর তুলে দেওয়া হয় লিবিয়ার পুলিশের হাতে।

মামুনুর রহমান আরও বলেন, ‘পুলিশ ধরে নিয়ে ছোট একটি ঘরে বন্দী করে রাখে। সেই ঘরে আমরা ২০০ জন বন্দী ছিলাম। ওই ঘরের সঙ্গে থাকা শৌচাগারের পয়োনিষ্কাশনের ময়লা–আবর্জনার পানি ঘরে হাঁটুসমান জমে ছিল। দুর্গন্ধে শ্বাস-নিশ্বাস বন্ধ হয়ে মরতে মরতে কোনো রকমে বেঁচে যাই। এক দিন এক রাত থাকার পর বাড়িতে যোগাযোগ করে কদ্দুস নামের আরেক দালালের মাধ্যমে পাঁচ লাখ টাকা দিয়ে সেখান থেকে মুক্ত হই।’

লিখিত অভিযোগে মামুনুর বলেন, ‘পুলিশের বন্দিখানা থেকে বের হওয়ার পর আবার ইতালি পাঠানোর কথা বলে জগন্নাথপুরের বালিকান্দি গ্রামের দালাল রাসেল ৯ লাখ টাকা নিয়ে এনাম দালালের মাধ্যমে লিবিয়ার মাফিয়া চক্রের কাছে বিক্রি করে দেন। চক্রটি একটি কক্ষে ১২০ জনকে রাখে। সেখানে টাকার জন্য রশি দিয়ে বেঁধে ঝুলিয়ে লোহার পাইপ দিয়ে মারধর করতে থাকে আমাকে। মারধরের অডিও এবং ভিডিও মোবাইলের মাধ্যমে বাড়িতে পাঠায়। বাড়িতে আমার ছোট ভাইকে ফোন দিয়ে ১১ লাখ টাকা দাবি করে। দাবি করা টাকা না দিলে আমাকে হত্যা করা হবে বলে জানায়। আমাকে বাঁচাতে জায়গা জমি বিক্রি ও ধারদেনা করে ১১ লাখ টাকা দেওয়া হয়। সেখানে ৭ মাস থাকার পর আরেক মাফিয়ার কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। ওই খানে তিন মাস আটকে রাখা হয়। চক্রটিকে ৩ লাখ টাকা দিয়েও ছাড়া পাইনি। একদিন গেমের কথা বলে বন্দীদের একটি মাইক্রোবাসে ওঠানো হচ্ছিল। আমাকেও নেওয়া হবে। আমাদের যে ভবনে আটকে রাখা হয়েছিল, হঠাৎ দেখলাম, ভবরে ছাদে লোকজন কেউ নেই। এই সুযোগে আমরা তিনজন ছাদ থেকে লাফ দিয়ে নিচের একটি বাগানে পড়ে দৌড়ে জঙ্গলে লুকিয়ে থাকি। অনাহারে সারা রাত জঙ্গলে থাকার পর ভোরে একটি মসজিদে আশ্রয় নিই। পরে মসজিদের ইমামের সহযোগিতায় দেশে ফিরেছি। শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে এখন চিকিৎসা নিচ্ছি।’

মামুনুর রহমানের ছোট ভাই হিমেল বলেন, ‘ইতালি না পাঠিয়ে একাধিক বার মাফিয়া চক্রের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয় আমার ভাইকে। তাঁকে বাঁচাতে ৪৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় মানব পাচারকারী চক্র। ধারকর্জ আর বাড়ি বিক্রি রেখে এসব টাকা জোগাড় করতে হয়েছে।’

এদিকে লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলের দারনা শহরে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ১১৩ জন ও বেনগাজীর গানফুদা ডিটেনশন সেন্টারে আটক ২৭ জন বাংলাদেশিসহ ১৪০ জন অভিবাসী দেশে ফিরেছেন।

বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে লিবিয়ার বুরাক এয়ারের একটি ফ্লাইটে তারা ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। আর্ন্তজাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সহযোগিতায় তাদের দেশে ফেরত আনা হয়।

বিমানবন্দরে অবতরণের পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আর্ন্তজাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) কর্মকর্তারা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাদের অভ্যর্থনা জানান। এ সময় আইওএম’র পক্ষ থেকে তাদের প্রত্যেককে পকেট মানি হিসেবে ৫ হাজার ৯১৯ টাকা এবং খাদ্যসমগ্রী উপহার দেওয়া হয়।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিচালক (কল্যাণ) মোস্তফা জামিল খান বিমানবন্দরে ফিরে আসা অভিবাসীদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বেনগাজীর গানফুদা ডিটেনশন সেন্টারে আটক অভিবাসীদের বাড়িতে ফিরে যাবার পর লিবিয়াতে তাদের ভয়ংকর অভিজ্ঞতার কথা প্রতিবেশি ও আত্মীয় পরিজনদের সঙ্গে আলোচনা করার পরামর্শ দেন। 

প্রসঙ্গত, লিবিয়ায় বিপদগ্রস্তসহ বিভিন্ন ডিটেনশন সেন্টারে আটক বাংলাদেশিদের নিরাপদে দেশে প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করতে ত্রিপলিতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইওএম একসঙ্গে কাজ করছে। চলতি বছরের জুলাই থেকে ত্রিপলি ও বেনগাজীর ডিটেনশন সেন্টারে আটকসহ বিপদগ্রস্ত মোট ৯৭৫ জন বাংলাদেশিকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এছাড়াও অনিয়মিত সব বাংলাদেশিকে লিবিয়া থেকে দেশে প্রত্যাবাসন করা হবে।

জৈন্তাবার্তা/জেএ



শীর্ষ সংবাদ:

বৈ*ষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনে কাজ করতে হবে: আবুল কাহেরচৌধুরী শামীম
ঝটিকা মিছিল নিয়ে উত্তাল সিলেট, পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার অ*ভিযোগ ছাত্রদলের
সমাজের অবহেলিত মানুষের জন্য নানামুখী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে সরকার: এমপি এমরান চৌধুরী
সিলেটে বিশেষ অ'ভিযানে গ্রে'প্তার ৪৬ জন
সিলেটে হামের উপসর্গে আরও ৩ শিশুর মৃ'ত্যু
বুরুঙ্গা বাজার সড়কের প্রস্থ কমানোর অ*ভিযোগ, বাড়ছে দু*র্ঘটনার ঝুঁ*কি
নৈতিকতায় সমৃদ্ধ তরুণরাই আগামীর বাংলাদেশ গড়বে: হুমায়ুন কবির
‘আমার সাফল্যের ভিত্তি গড়ে দিয়েছে এমসি কলেজ’ : এমপি এমরান চৌধুরী
কালনী নদীতে কুমিরের আবির্ভাব, জেলে-মাঝিদের মধ্যে চরম আ*তঙ্ক
অনলাইন জু*য়াড়িসহ ৬ জন গ্রে*প্তার, অ*পহৃত কিশোরী উ*দ্ধার