লাখাই দত্তবাড়ি ও সিলেট বিভাগের প্রথম দুর্গাপূজা
মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৪৮ অপরাহ্ন

লাখাই দত্তবাড়ি ও সিলেট বিভাগের প্রথম দুর্গাপূজা

আশীষ দাশ গুপ্ত, লাখাই প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১০/১০/২০২৪ ০২:২৮:৪৩ পূর্বাহ্ন

লাখাই দত্তবাড়ি ও সিলেট বিভাগের প্রথম দুর্গাপূজা

ছবি নিজস্ব


সিলেট বিভাগের শেষ সীমানা হাওরবেষ্টিত হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার লাখাই ইউনিয়নে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী দত্তবাড়ি। এই বাড়িতেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল সিলেট বিভাগের প্রথম দুর্গাপূজা। তবে এই দুর্গাপূজার ইতিহাস জানার আগে যাওয়া যাক আরেকটু পেছনে।

১৫৮০ সালে পন্ডিত রমেশ শাস্ত্রীর বিধান অনুসারে রাজা কংস নারায়ণ রাজশাহী জেলার বাগমারা থানার তাহেরপুরে রাজকীয় মন্দিরে রাজসিকভাবে সর্বপ্রথম দুর্গাপূজার মহাযজ্ঞ আয়োজন করেন। কংস নারায়ণ রাজা সেই সময় দুর্গাপূজায় তৎকালীন সময়ের মুদ্রায় প্রায় নয় লক্ষ টাকা খরচ করেন। পন্ডিত রমেশ শাস্ত্রীর পরামর্শে মহাযজ্ঞ না করে দুর্গাপূজা করেছিলেন তিনি। রাজা কংসের ব্যক্তিগত পূজায় সেই সময় সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার সীমিত হয়ে পড়ে। তখনই বাঙালি হিন্দুদের প্রয়োজন হয়ে পড়ে সর্বজনীন দুর্গাপূজা আয়োজনের। 

১৭৯০ সালে পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলায় ১২ জন বন্ধুর প্রচেষ্টায় প্রথম বারোয়ারি পূজার আয়োজন হয়। তারপর থেকেই দুর্গাপূজা পরিণত হয় সর্বজনীন উৎসবে।

১৭০২ সালে সানন্দরাম দত্ত সিলেট থেকে লাখাই গ্রামে প্রথম বসতি স্থাপন করেন। সানন্দরাম দত্ত হলেন লাখাই থানার প্রথম বসতি। ১৭৪৪ সালে লাখাইয়ে দত্ত বংশের লোকেরা প্রথম দুর্গাপূজা করার উদ্যোগ নেন। ওইই বছর খাসিয়ারা তাদের হারানো রাজ্য ফিরে পাওয়ার জন্য খাসিয়া পর্বত থেকে পঙ্গপালের মতো লাখাই এসে আক্রমণ করে। খাসিয়াদের আক্রমণে লাখাই গ্রামের অনেক মানুষ নিহত হন। লাখাই গ্রাম প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়ে। লাখাইয়ের দত্ত বংশের লোকেরা বিভিন্ন এলাকা থেকে নিজেদের শক্তিবৃদ্ধির জন্য সব পেশার মানুষ, বিভিন্ন জাতি, ব্রাহ্মণ, শুদ্র, জেলে, মুসলমান, বাজাইন্যা, সুতার, মাঝি, তাতী, কামার, কুমারদের বসতি স্থাপন করার জন্য সুযোগ করে দেন। এর পর ১৮০০ সালে সানন্দরাম দত্তের বংশের লোকেরা লাখাইয়ের স্বজনগ্রামে দত্তবাড়িতে প্রথম দুর্গাপূজার আয়োজন করেন।

১৮১১ সালে সিলেট শহরে বিচারপতি রনধীর সেনের বাসায় প্রথম দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়। এরপর মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর থানার পাঁচগাঁও গ্রামে দুর্গাপূজা শুরু হয়।

১৮৫৫ সালে লাখাই দত্ত বংশের প্রভাবশালী ব্যক্তি সম্ভুনাথ দত্তের ছেলে মহেশ চন্দ্র দত্ত জন্ম নেন। ওই বছর জাঁকজমকপূর্ণভাবে লাখাই দত্তবাড়িতে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়। সেই দুর্গাপূজাতে ব্যয় হয় তখনকার সময়ের মুদ্রায় প্রায় এক লাখ টাকা। এক মাসব্যাপী দুর্গাপূজার উৎসব চলে। যাত্রাগান, পালাগান, নৌকাবাইচ হয়। সমগ্র হবিগঞ্জ মহকুমার জনগণের আনাগোনা ছিল লাখাই দত্তবাড়িতে। সারাদিন ভাত, খিচুড়ি, নিরামিষ খাবার ভোজনের আয়োজন ছিল।

১৯২৬ সালে শ্রীস চন্দ্র দত্ত ভারতবর্ষের কেন্দ্রীয় আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হওয়ার বছর দুর্গাপূজায় এক অলৌকিক ঘটনা ঘটে। দুর্গাপূজায় কাজ করার এক মহিলাকে হঠাৎ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। একপর্যায়ে দেখা গেল মহিলার কাপড় দুর্গার মুখে! তারপর ভয়ে মহিলারা লাখাই দত্তবাড়ির দুর্গাপূজা দেখতে আসতেন না।

১৯২৭ সালে কংস নারায়ণ বংশের শেষ রাজা শিব শেখরেশ্বর বড় নৌকাযোগে রাজশাহী থেকে দুর্গাপূজা দেখার জন্য লাখাই দত্তবাড়িতে আসেন।

লাখাই দত্তবাড়ির দুর্গাপূজার নিমন্ত্রণ ভারতবর্ষের বড় বড় রাজনীতিবিদদের কাছেও পৌঁছে দেওয়া হতো।

নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, ডা. বিধান রায়ের মতো বিখ্যাত বাঙালি ব্যক্তিরা নিমন্ত্রণ পেতেন।

১৯৪৫ সালে দুর্গাপূজার সময় দুর্গার ত্রিশুলের আঘাতে এক কাজের লোক মারাত্মক আহত হলে দত্তবাড়ির লোকজন মনে ভীষণ আঘাত পান। এরপর থেকে দুর্গাপূজায় ভাটা পড়তে থাকে।

লাখাই দত্তবাড়িতে দুর্গাপূজা প্রচলন হওয়ার পর বামৈ গ্রামের চৌধুরী বাড়িতে, কৃষ্ণপুর গ্রামের জমিদার ব্রজেন্দ্রলাল রায়ের বাড়িতে, রাঢ়িশাল জমিদার বাড়িতে, লাখাই শ্যামবাবুর বাড়িতে ও মোড়াকরি গ্রামে দুর্গাপূজার প্রচলন শুরু হয়ে যায়।

১৯৫৮ সালে লাখাই দত্তবাড়ির দুর্গাপূজা একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যায়। হারিয়ে যায় লাখাই ঐতিহাসিক দত্তবাড়ির ব্যয়বহুল ও ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপূজা।

লাখাইয়ের ঐতিহাসিক দত্তবাড়িতেই বৃহত্তর সিলেট জেলার সর্বপ্রথম দুর্গাপূজার প্রচলন হয়েছিল। মন্দিরের সামনে বিশাল প্যান্ডেল করে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হতো। দীর্ঘকাল অবহেলিত থাকার পর ২০০৪ সালে স্বজনগ্রাম টাউনশিপের দুর্গা মন্দিরটি লাখাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার উদ্যোগে পুনঃসংস্কার ও নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। তবে স্থানীয় কিছু মানুষের বাধার কারণে তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি।

জৈন্তা বার্তা/আরআর



শীর্ষ সংবাদ:

সিলেটে নি/ষিদ্ধ ছাত্রলীগের কর্মী গ্রে/প্তার
ওসমানীনগরে ফুটবল খেলা নিয়ে সং/ঘ/র্ষে ওসিসহ আ/হত ২০
গোলাপগঞ্জে ছাত্রকে ধ/র্ষ/ণের মা/মলায় প্রধান শিক্ষক গ্রে/প্তার
‘ইউ আর আ টে/ররি/স্ট’ স্লোগানে নিউইয়র্ক বিমানবন্দরে ড. ইউনূসকে ঘিরে বি/ক্ষো/ভ
অর্থনীতির সং ক ট মোকাবিলায় গবেষণা, নোবেল পেলেন দুই মার্কিন অধ্যাপক
সিলেট নগরীর বিভিন্ন এলাকায় উন্নয়নকাজ পরিদর্শনে সিসিক প্রশাসক
সব ধর্মের মানুষের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিএনপি বদ্ধপরিকর: নাসিম হোসাইন
সিলেটে ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহ শুরু মঙ্গলবার
ধর্মীয় উৎসবে সম্প্রীতি অটুট রাখতে হবে: এমপি ফয়সল
জলাত/ঙ্কমুক্ত নগর গড়তে চাই: সিসিক প্রশাসক