ছাতকে বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক পদে আ.লীগ নেতা!
মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৫১ AM

ছাতকে বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক পদে আ.লীগ নেতা!

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৮/০৮/২০২৫ ০২:৫৫:০৭ PM

ছাতকে বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক পদে আ.লীগ নেতা!


এক বালতি দুধে এক ফোঁটা কেরোসিন পড়লে যেমন গোটা বালতির দুধ নষ্ট হয়ে যায়, তেমনি সুবিধাভোগী-অবাঞ্ছিত নেতাদের কারণে দলের মধ্যে দেখা দেয় বিভ্রান্তি, কোন্দল আর হানাহানি। জনগণের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হয় দলের সাংগঠনিক বাছাই প্রক্রিয়া আর ক্ষুন্ন হয় দলের ভাবমূর্তি। 

ঠিক একই অবস্থা হয়েছে সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার প্রান্তিক এলাকা জাউয়াবাজার ইউনিয়ন বিএনপিতে।

সম্প্রতি ঘোষিত ইউনিয়ন বিএনপির এক যুগ্ম আহ্বায়কের নানা অপকর্মে চরম বিব্রত আহ্বায়ক কমিটির নেতৃবৃন্দ। বিক্ষুব্ধ তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা। আর সর্বোপরি সাধারণ মানুষের মধ্যে চলছে নানামুখী আলোচনা-সমালোচনা। এতে জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অভিযুক্ত এই নেতা ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক কামাল উদ্দিন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কামাল উদ্দিন জাউয়াবাজার ব্যবসায়ী সমিতিরও সাধারণ সম্পাদক। স্থানীয় জাউয়া গ্রামের কোনাপাড়া নিবাসী রহমত আলীর ছেলে তিনি। তার ছোটভাই হেলাল উদ্দিন জাউয়াবাজার ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি। তার বিরুদ্ধে স্থানীয় হাবিদপুর গ্রামের জনৈক আব্দুল কাইয়ুমের ছেলে আবু সাঈদ হত্যার মামলা রয়েছে। এর আগে দোলারবাজার ইউনিয়নের শরীসপুর গ্রামের এক তরুণ ব্যবসায়ীর নিকট থেকে ৩ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের মামলায় হেলাল উদ্দিন গ্রেপ্তার হন। দীর্ঘ কারাভোগের পর তিনি জামিনে ছাড়া পান। এ নিয়ে স্থানীয় পত্র-পত্রিকায় প্রতিবেদনও ছাপা হয়েছে, যা বেশ কিছুদিন ধরেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভেসে বেড়াচ্ছিল। 

বিগত সরকারের আমলে হেলাল উদ্দিনের দাপটে এলাকার মানুষ ছিল আতঙ্কে। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বড়ভাই কামাল উদ্দিনকে বিএনপির ইউনিয়ন কমিটির যুগ্ম আহ্বায়কের পদ বাগিয়ে দিয়ে তিনি নিজের দাপট টিকিয়ে রেখেছেন। জাউয়াবাজার গরুর হাট থেকেও তিনি নিয়মিত মাসোহারা নেন। ইজারা নিয়েছেন পার্শ্ববর্তী কুড়িবিলের। জেল খাটা এই আসামির দৌরাত্মে এলাকাবাসী এখনও তটস্থ। 

এ অঞ্চলের গ্রামে-গঞ্জে ইদানিং বিএনপি নেতা কামাল উদ্দিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও ব্যবসায়িক পার্টনার লক্ষণসোম নিবাসী নুরুল আমীন ওরফে ইয়াবা নুরুল গড়ে তুলেছেন বিরাট মাদক সাম্রাজ্য। কিছুদিন পূর্বে নুরুলকে তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে ইয়াবা ও মাদকদ্রব্যসহ গ্রেপ্তার করে র‍্যাব। দীর্ঘ কারাবাস শেষে কয়েকদিন আগে তিনি জামিন পেয়েছেন। 

স্থানীয় একটি সূত্র জানিয়েছে, হাবিদপুরের আবু সাঈদ হত্যা মামলা থেকে বাঁচার অভিপ্রায়ে বিগত সরকারের সময়ে ছোটভাই হেলাল উদ্দিনের যোগসাজশে উপরোক্ত কামাল উদ্দিন বেশ কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে তৎকালীন এমপি মুহিবুর রহমান মানিকের জেলা সদরস্থ বাসায় গিয়ে ফুল দিয়ে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর পরই ভোল পাল্টে কামাল হয়ে যান বিএনপির খাস নেতা। বিগত সরকারের সময়ে কামালের যত দাপট ছিল যুবলীগ সভাপতি ছোটভাই হেলাল উদ্দিনের ছত্রছায়ায়। আর এখন হেলাল উদ্দিন দাপট দেখিয়ে চলছেন বড়ভাই কথিত বিএনপি নেতা কামাল উদ্দিনের যোগসাজশে।

বিএনপির স্থানীয় মিজান বলয়ের লোকজন মনে করেন, কামাল উদ্দিনের পদ-পদবির প্রভাব ব্যবহার করছেন তার ছোটভাই 'ডেভিল' হেলাল উদ্দিন। হেলাল এখনও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিয়মিত সরকারবিরোধী নানা মন্তব্য করে যাচ্ছেন। বাস্তবিক অর্থে এই পরিবারটি কোনো রাজনৈতিক পরিবার নয়। ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলে এক ভাই অপর ভাইকে ব্যবহার করে টাকা কামাই করছেন।

শুধু তাই নয়, নিজে যুগ্ম আহ্বায়ক হয়ে কামাল উদ্দিন জাউয়াবাজারে জনৈক সাজ্জাদুর রহমানের দোকানকোঠা ভাড়া নিয়ে বিএনপির দলীয় অফিস হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু কার্যত এখানে কামাল উদ্দিন ও সাজ্জাদুর রহমানরা বসে মাদক সেবন করেন। আর ইয়াবা নুরুল গংদের মাদক ব্যবসাসহ নানা অপকর্ম ও দালালির ভাগ-বাটোয়ারার কাজে ব্যস্ত থাকেন। কারণে-অকারণে এই অফিসে এনে নিরীহ লোকজনদের বিচার-সালিশের নামে শাস্তি দেয়া হয় বলে স্থানীয় জনগণ কামাল উদ্দিনের এই অফিসকে এখন ‘আয়নাঘর’ নামে অভিহিত করে থাকেন। এ নিয়েও এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে।

ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক কামাল উদ্দিনের এসব অপকর্মে স্থানীয় বিএনপি নেতৃবৃন্দ পড়েছেন বিব্রতকর অবস্থায়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মতো ছাতকেও মিলন গ্রুপ ও মিজান গ্রুপ নামে বিএনপির দুটি ভিন্ন বলয় রয়েছে। কয়েকদিন আগে যখন জাউয়াবাজার ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়, তখন মিলন গ্রুপের বলয় থেকে কোনো এক অদৃশ্য শক্তির ইশারায় ও আওয়ামী আমলে অর্জিত অর্থের বদৌলতে কামাল উদ্দিন যুগ্ম আহবায়কের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ বাগিয়ে নেন। কিন্তু কার্যত তিনি জাতীয়তাবাদী ঘরানার লোক নন। একজন ‘নন-পলিটিক্যাল’ ব্যক্তি হিসেবে নিজের ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল ও ছোটভাইকে রক্ষা করতে তিনি মূলতঃ বিএনপিতে জায়গা করে নিয়েছেন।

তবে তৃণমূল বিএনপির নেতাকর্মীরা কামাল উদ্দিনের বিএনপিতে সংযুক্তিকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না। তারা বলছেন, কামাল উদ্দিনরা জাতীয়তাবাদী শক্তির কোনো উপকারে আসতে পারে না। ওরা চিহ্নিত স্বার্থান্বেষী। ‘ডেভিল ফ্যামেলি’র কোনো সদস্য শহীদ জিয়ার আদর্শের দলকে ব্যবহার করে কলুষিত করবে, তা হতে দেয়া হবে না। আমরা যে কোনো মূল্যে এ অনাচার রুখবো।

কয়েকজন নেতাকর্মী বলেছেন, কামাল উদ্দিন সাম্প্রতিক সময়ে ছাতকে মূলতঃ বিএনপির মিলন গ্রুপের কর্মী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। কিন্তু সুনামগঞ্জ-৫ আসনে যদি কলিম উদ্দিন মিলন ‘ধানের শীষ’ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে প্রার্থী হন, তবে জাউয়াবাজার এলাকায় কামাল উদ্দিনের অব্যাহত অপকর্মের কারণে সমূহ ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে- এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়। চরম বিতর্কিত এই ব্যক্তিকে নিয়ে বর্তমান উপজেলা আহ্বায়ক কমিটির অনেক সদস্যও পড়েছেন বিব্রতকর পরিস্থিতিতে। তারা মনে করেন, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এসব বিষফোঁড়াকে ঝেড়ে ফেলা দলের জন্য উত্তম।

মিজান গ্রুপের নেতা হিসেবে পরিচিত উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য, জাউয়াবাজার ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি এনামুল হক পীর বলেন, কামাল উদ্দিন বাস্তবে বিএনপি ঘরানার কেউ না। আমরা বিষয়টি কেন্দ্র ও জেলা-উপজেলার নেতবৃন্দের নজরে দিয়েছি। মূলতঃ কামাল উদ্দিন একজন ব্যবসায়ী। নানা অপকর্মের সাথে জড়িত বলে তার বদনামও রয়েছে। কিন্তু তারপরও রহস্যজনক কোনো এক সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সে বিএনপিতে স্থান করে নিয়েছে, যা দলের জন্য খুবই খারাপ নজির হিসেবে দেখা হচ্ছে। আমি মনে করি, এটা তার ব্যবসায়িক ও পারিবারিক স্বার্থ হাসিলের একটা ধান্ধা। এসবকে ছেঁটে ফেলা দলের জন্য স্বস্তিকর হবে। দলের বৃহত্তর স্বার্থে আমরা আশা করি, এসব অপকর্মের হোতাদের দলে না রাখাই উত্তম।

জৈন্তা বার্তা/আরআর



শীর্ষ সংবাদ: