নির্বাচনী প্রেক্ষাপট ও প্রদত্ত তথ্যের আলোকে সিলেট-৪ আসনের লড়াইটি বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে, এটি এবারের ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের অন্যতম আলোচিত ও উত্তেজনাপূর্ণ আসনে পরিণত হয়েছে। প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ, পর্যটননির্ভর এবং রাজনৈতিকভাবে ঐতিহ্যবাহী এই আসনটি দীর্ঘদিন ধরেই জাতীয় রাজনীতিতে আলাদা গুরুত্ব বহন করে আসছে। ভোলাগঞ্জ, জাফলং, বিছনাকান্দি ও রাতারগুলের মতো জাতীয় পর্যায়ের পরিচিত স্থান এই আসনের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ ও পর্যটন ব্যবস্থাপনা; এই তিনটি ইস্যুই এখানে ভোটারদের ভাবনায় বড় জায়গা দখল করে আছে।
অতীত নির্বাচনী ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সিলেট-৪ আসনে আওয়ামী লীগের প্রভাব ঐতিহাসিকভাবে শক্ত ছিল। সাতবার এই আসনে দলটি বিজয়ী হয়েছে। বিএনপি পেয়েছে তিনবারের সাফল্য, পাশাপাশি স্বতন্ত্র ও জাতীয় পার্টিও একবার করে জয় পেয়েছে। কিন্তু এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও তাদের মিত্রদের মাঠে না থাকা পরিস্থিতিকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। এই ‘শূন্যতা’ই মূলত নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে, যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা কেন্দ্রীভূত হয়েছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে।
এই আসনের নির্বাচনী লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন দুই জনপ্রিয় ও পরিচিত মুখ। বিএনপির প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী এবং জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী জয়নাল আবেদীন। আরিফুল হক চৌধুরী সিলেট সিটির সাবেক মেয়র এবং বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হিসেবে পরিচিত। নগর ও গ্রামীণ উভয় পর্যায়ে তাঁর পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। মেয়র থাকাকালীন সময়ের কাজ, ব্যক্তিগত যোগাযোগ এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সক্রিয়তা তাঁকে একটি শক্ত ভোটব্যাংক দিয়েছে।
অন্যদিকে জয়নাল আবেদীন সিলেট জেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি এবং সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান। তিনি দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠনিক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তাঁর শক্তি মূলত দলীয় সংগঠন, কর্মীসমর্থকদের শৃঙ্খলিত প্রচারণা এবং ধর্মভিত্তিক ভোটারদের সমর্থনে। গ্রামাঞ্চলে তাঁর ব্যক্তিগত যোগাযোগ এবং সাংগঠনিক উপস্থিতি তাঁকে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় শক্ত অবস্থানে রেখেছে।
স্থানীয় ভোটারদের ভাষ্যমতে, এই দুই প্রার্থীর মধ্যে মূল লড়াই হবে। কারণ দুজনই স্থানীয়, দুজনেরই জনপ্রতিনিধিত্বের অভিজ্ঞতা আছে এবং দুজনই নিয়মিত মাঠে রয়েছেন। প্রতীকভিত্তিক রাজনীতির পাশাপাশি ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি ও অতীত কর্মকাণ্ড এই নির্বাচনে বড় ভূমিকা রাখবে।
তবে মাঠে শুধু এই দুই প্রার্থীই নয়, পাশাপাশি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মাওলানা জাহিদ আহমেদ, গণঅধিকার পরিষদের জহিরুল ইসলাম এবং জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ মজিবুর রহমান ডালিম ও প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। যদিও তাঁদের সাংগঠনিক শক্তি ও জনসমর্থন তুলনামূলকভাবে কম, তবুও তাঁরা ভোট ভাগের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারেন; বিশেষ করে নির্দিষ্ট কিছু এলাকায়।
সিলেট-৪ আসনের অতীত নির্বাচনী ফলাফল পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা বরাবরই আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর উপস্থিতি থাকলেও ভোটের হিসাবে তাদের প্রভাব ছিল প্রায় নগণ্য।
২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত মহাজোটের প্রার্থী ইমরান আহমদ বিপুল ব্যবধানে জয়লাভ করেন। তিনি পেয়েছিলেন ২ লাখ ২৩ হাজার ৬৭৭ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি সমর্থিত জোটের প্রার্থী দিলদার হোসেন সেলিম পেয়েছিলেন ৯২ হাজার ৪৭৩ ভোট। ওই নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মো. জিল্লুর রহমান পেয়েছিলেন মাত্র ২ হাজার ৩৭০ ভোট এবং জাতীয় পার্টির প্রার্থী তাজ উদ্দিন তাজ রহমানের প্রাপ্ত ভোট ছিল মাত্র ৪২৩। এই ফলাফল স্পষ্ট করে যে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরে থাকা দলগুলো ওই নির্বাচনে ভোটের মাঠে কার্যত কোনো অবস্থান তৈরি করতে পারেনি।
২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রধান বিরোধীদল বিএনপির নির্বাচন বর্জনের কারণে প্রতিদ্ব›িদ্বতার চিত্র আরও একপেশে হয়ে পড়ে। সে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত মহাজোটের প্রার্থী ইমরান আহমদ ৬৩ হাজার ৩২৩ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তাঁর একমাত্র উল্লেখযোগ্য প্রতিদ্ব›দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী ফারুক আহমদ পেয়েছিলেন ২৪ হাজার ২৭৪ ভোট। ভোটার উপস্থিতি ও প্রতিযোগিতা; দুটিই ছিল তুলনামূলকভাবে সীমিত।
এর আগে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনেও আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যেই মূল লড়াই হয়। সে নির্বাচনে এক প্রার্থী পেয়েছিলেন ১ লাখ ৪৪ হাজার ১৯৮ ভোট, অন্যজন পেয়েছিলেন ৯৮ হাজার ৫৪৫ ভোট, যা দুই প্রধান দলের শক্ত অবস্থানই নির্দেশ করে।
আরও পেছনে গেলে, ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোটের প্রার্থী দিলদার হোসেন সেলিম ৬২ হাজার ৩২৪ ভোট পেয়ে জয়লাভ করেন। বিপরীতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ইমরান আহমদ পেয়েছিলেন ৪৭ হাজার ৬০৮ ভোট। এখানেও দেখা যায়, ভোটের প্রতিযোগিতা সীমাবদ্ধ ছিল দুই প্রধান রাজনৈতিক শক্তির মধ্যেই।
২০১৮ সালসহ অতীতের সব নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করে স্পষ্টভাবে বলা যায়, সিলেট-৪ আসনে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের বাইরে অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সংগঠিত ও কার্যকর ভোটব্যাংক কখনোই গড়ে ওঠেনি। ফলে বর্তমান নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে, যেখানে আওয়ামী লীগ ও তাদের মিত্ররা ভোটের মাঠে অনুপস্থিত, সেখানে বিএনপিই স্বাভাবিকভাবেই এগিয়ে থাকবে; এমন ধারণা জোরালো।
বিশেষ করে বিএনপির প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরীর ক্ষেত্রে এই সম্ভাবনা আরও দৃঢ় হয়। অতীতে সিলেট সিটি করপোরেশনের দুটি নির্বাচনে তিনি দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে নগরবাসীর ব্যাপক সমর্থন পেয়েছেন। সেই অভিজ্ঞতা ও ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার ধারাবাহিকতা গ্রামীণ এলাকাতেও প্রভাব ফেলবে বলে অনেকেই মনে করছেন। ফলে নির্বাচনে না থাকা আওয়ামী লীগের একটি বড় অংশের ভোট বিএনপির প্রার্থীর পক্ষেই যাবে- এমন প্রত্যাশাই এখন স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত।
ভোটার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মোট ৫ লাখ ১২ হাজার ৯৩৩ জন ভোটারের মধ্যে নারী ভোটারের সংখ্যা প্রায় পুরুষ ভোটারের সমান। ফলে নারী ভোটারদের আকৃষ্ট করতে প্রার্থীদের ভূমিকা ও বার্তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি তরুণ ভোটার ও প্রথমবার ভোটাররাও ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে সিলেট-৪ আসনের নির্বাচন শুধু দুই প্রার্থীর ব্যক্তিগত লড়াই নয়; এটি আওয়ামী লীগ অনুপস্থিতির পর রাজনৈতিক শক্তির পুনর্বিন্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাও বটে। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয়, তা নির্ভর করবে শেষ মুহূর্তের প্রচারণা, ভোটার উপস্থিতি এবং স্থানীয় সমীকরণের ওপর। নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, এই আসনের ফলাফল জাতীয় রাজনীতির জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা বহন করবে।
জৈন্তা বার্তা/আরআর




