নিয়ম-নী*তিহীন কাঠের চু*ল্লিতে উ*জাড় হচ্ছে বৃক্ষসম্পদ
রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬, ০২:৫৭ AM

ছাতকে অ*বৈধ ‘পাজু’র তাণ্ডব, পরিবেশ ও জ*নস্বাস্থ্য হু*মকির মুখে

নিয়ম-নী*তিহীন কাঠের চু*ল্লিতে উ*জাড় হচ্ছে বৃক্ষসম্পদ

মোশাররফ হোসেন, ছাতক প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৬/০৮/২০২৬ ০১:৪২:৪৮ AM

নিয়ম-নী*তিহীন কাঠের চু*ল্লিতে উ*জাড় হচ্ছে বৃক্ষসম্পদ

ছবি: জৈন্তা বার্তা


সুনামগঞ্জের ছাতকে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা অনুমোদন ছাড়াই গড়ে উঠেছে বিপুলসংখ্যক কাঠজ্বালিত চুনের চুল্লি। স্থানীয়ভাবে ‘পাজু’ নামে পরিচিত এসব চুল্লিতে চুনাপাথর পোড়াতে প্রতিমাসে বিপুল পরিমাণ কাঠ ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে একদিকে জ্বালানি কাঠের চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি বৃক্ষনিধনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে চুল্লি থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া, চুনের গুঁড়া ও দুর্গন্ধে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য পড়েছে হুমকির মুখে।

স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ছাতক পৌরসভা ও উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বর্তমানে শতাধিক পাজু চালু রয়েছে। স্থানীয়দের কেউ কেউ এ সংখ্যা ২০০-এর বেশি বলে দাবি করেছেন। তবে পাজু ব্যবসায়ী সমিতির নেতাদের হিসাবে এ সংখ্যা ১০০ থেকে ১৫০টির মধ্যে। সংখ্যার বিষয়ে ভিন্নমত থাকলেও সংশ্লিষ্ট সবাই একমত-সাম্প্রতিক সময়ে ছাতকের বিভিন্ন এলাকায় কাঠজ্বালিত এসব চুল্লির সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে।

সুরমা নদীর দুই তীর, ছাতক-গোবিন্দগঞ্জ সড়কের দুই পাশে, বৌলা, তাতিকোনা এবং বিভিন্ন আবাসিক এলাকার আশপাশে গড়ে উঠেছে এসব পাজু। কোথাও কোথাও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছাকাছিও চুল্লি স্থাপন করা হয়েছে। ফলে এসব এলাকার বাসিন্দা, শিক্ষার্থী ও পথচারীদের নিয়মিত ধোঁয়া ও চুনের ধুলার মধ্যে চলাচল করতে হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, একটি পাজুতে সাধারণত মাসে দুই দফা চুনাপাথর পোড়ানো হয়। প্রতিটি পাজুতে মাসে গড়ে প্রায় সাত টন জ্বালানি কাঠ প্রয়োজন হয়। সে হিসাবে ২০০টি পাজু চালু থাকলে মাসে প্রায় ১ হাজার ৪০০ টন কাঠ প্রয়োজন হতে পারে।

বিপুল এই চাহিদার কারণে স্থানীয় বাজারে জ্বালানি কাঠের দামও বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। স্থানীয়দের অভিযোগ, ছাতকের চাহিদা মেটাতে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন এলাকা থেকে ট্রাক ও পিকআপে করে কাঠ আনা হচ্ছে। প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০টি পর্যন্ত কাঠবাহী যান ছাতকে প্রবেশ করতে দেখা যায় বলেও দাবি তাঁদের।

বিভিন্ন পাজুর আশপাশে বড় বড় গাছের গুঁড়ি, ডালপালা ও কাঠের স্তূপ দেখা যায়। তবে পাজু ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ দাবি করছেন, তাঁরা সরাসরি বন থেকে গাছ কেটে কাঠ সংগ্রহ করেন না; বিভিন্ন করাতকলের উচ্ছিষ্ট ও জ্বালানি কাঠ ব্যবহার করেন।

চুনাপাথর উচ্চ তাপে পোড়ানোর সময় পাজু থেকে কালো ধোঁয়া ও সূক্ষ্ম চুনের কণা ছড়িয়ে পড়ে আশপাশে। বাতাসে এসব ধোঁয়া ও ধুলা মিশে স্থানীয় পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে ধুলাবালির মাত্রা আরও বেড়ে যায় বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

ছাতক উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নুসরাত জাহান বলেন, ছাতকে শিল্পকারখানা থাকায় আগে থেকেই পরিবেশজনিত রোগীর সংখ্যা বেশি। গত কয়েক মাসে এ ধরনের রোগীর সংখ্যা আরও বেড়েছে।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ছাতক বর্তমানে একটি অঘোষিত শিল্পাঞ্চল ও দূষণপ্রবণ এলাকায় পরিণত হয়েছে। অবৈজ্ঞানিক চুল্লি থেকে নির্গত ধোঁয়া ও ফ্লাই অ্যাশ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে ধুলাবালির কারণে শ্বাসকষ্ট বাড়তে পারে।

তিনি বলেন, জ্বালানি হিসেবে গাছ পোড়ানোর কারণে বৃক্ষনিধনও হচ্ছে। এতে সাময়িকভাবে কিছু মানুষের অর্থনৈতিক লাভ হলেও দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। স্থানীয় প্রশাসনের কঠোর নজরদারির পাশাপাশি এ খাতকে পরিকল্পিত ও পরিবেশসম্মত শিল্পে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

পাজু মালিকদের কেউ কেউ দাবি করছেন, তাঁরা পৌরসভার ট্রেড লাইসেন্সসহ প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিয়েই ব্যবসা করছেন। পাজু ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি সালেক মিয়া ও সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল আলম বলেন, এটি ছাতকের পুরোনো ব্যবসা। তাঁদের দাবি, পরিবেশের কিছুটা ক্ষতি হলেও এ ব্যবসার সঙ্গে বহু মানুষ জড়িত। সরকার চাইলে পরিবেশসম্মতভাবে এ খাতকে বৈধতা দিয়ে রাজস্ব আদায় করতে পারে।

তবে পরিবেশ অধিদপ্তর এ দাবি নাকচ করেছে।

সুনামগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মোহাইমিনুল হক বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো ছাড়পত্র নেই। তাঁদের নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং জরিমানাও করা হয়েছে। জ্বালানি কাঠ সরবরাহ বন্ধে বন বিভাগকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হওয়ায় এসব পাজুকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি। এগুলো বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মহি উদ্দিন বলেন, কাউকে চুনের ভাটা স্থাপনের অনুমোদন দেওয়া হয়নি। পরিবেশ অধিদপ্তরের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। পাজু মালিকদের সঙ্গে বসে বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ছাতক বন বিভাগের বিট কর্মকর্তা কে বি এম ফেরদৌস বলেন, জনবল সংকটের কারণে এককভাবে অভিযান পরিচালনা করা কঠিন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা চলছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, কয়েক মাস আগেও ছাতকে পাজুর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম ছিল। সম্প্রতি চুনের বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ার পর নতুন করে বিভিন্ন এলাকায় এসব চুল্লি গড়ে উঠতে শুরু করেছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, একসময় চুনাপাথর পোড়াতে খড় বা ছন ব্যবহার করা হলেও পরবর্তীতে গ্যাসভিত্তিক চুন উৎপাদনের দিকে এ শিল্প ঝুঁকেছিল। গ্যাসসংকটসহ নানা কারণে ওই উৎপাদনব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় ছাতকে কাঠজ্বালিত পাজুর বিস্তার ঘটেছে।

ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেন বলেন, বর্তমানে ছাতকে ১০০ থেকে ১৫০টির মতো পাজু রয়েছে। প্রতিটি পাজু থেকে মাসে ৫০০ থেকে ১ হাজার মণ পর্যন্ত চুন উৎপাদন হয়। গ্যাসের সংযোগ না থাকায় কাঠ ও করাতকলের উচ্ছিষ্ট ব্যবহার করে চুন উৎপাদন করা হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, আবাসিক এলাকা ও সড়কের পাশে এসব চুল্লি স্থাপনের ফলে দিনের পর দিন বিষাক্ত ধোঁয়া ও ধুলার মধ্যে তাঁদের বসবাস করতে হচ্ছে। এতে শিশু, বয়স্ক ও শ্বাসকষ্টে ভোগা মানুষ সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন।

তাঁদের আরও অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলের চাপের কারণে অনেকেই প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতেও সাহস পান না। ফলে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এসব চুল্লি দিন দিন বাড়লেও কার্যকর প্রতিকার মিলছে না।

পরিবেশবিদদের মতে, চুন উৎপাদন বৈধ ও প্রাচীন শিল্প হলেও এর নামে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বসতবাড়ি, কৃষিজমি কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশে চুল্লি স্থাপন কোনোভাবেই টেকসই নয়।

তাঁদের মতে, পরিবেশগত ছাড়পত্র, নিরাপত্তাব্যবস্থা, জ্বালানি ব্যবস্থাপনা এবং ধোঁয়া ও ক্ষতিকর কণা নির্গমন নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত না করে এসব পাজু চলতে থাকলে ছাতকের পরিবেশ, কৃষি ও জনস্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মাত্রা আরও বাড়বে।

তাই অবৈধ ও পরিবেশবিধি লঙ্ঘনকারী পাজুর বিরুদ্ধে কার্যকর অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি বৈধ চুনশিল্পকে পরিবেশসম্মত প্রযুক্তিতে রূপান্তর এবং প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন পরিবেশসচেতন মহল।

জৈন্তা বার্তা/ ওয়াদুদ



শীর্ষ সংবাদ:

নিয়ম-নী*তিহীন কাঠের চু*ল্লিতে উ*জাড় হচ্ছে বৃক্ষসম্পদ
সুরমার দুই পাড়ে সবুজের হাতছানি, শুরু হচ্ছে সবুজ বিপ্লব
‘বেগম খালেদা জিয়া গণতন্ত্র রক্ষার আপসহীন প্রতীক’ - খন্দকার মুক্তাদির
শাহজালালের মাজারে কোটি টাকার দান, এবার হিসাব হবে নতুন নীতিমালায়
‘নৃ*শংস হ*ত্যাকা*ণ্ডের সঙ্গে জড়িত কাউকে ছা*ড় দেওয়া হবে না’: প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী
খালেদা জিয়ার আপোষহীন নেতৃত্বের কারণেই দেশে গণতন্ত্র ফিরেছে’: কাইয়ুম চৌধুরী
চা শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিগুলো সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে- শ্রমমন্ত্রী
খোলা হয়েছে শাহজালাল (রহ.) মাজারের দানবাক্স, চলছে গণনা
সিলেটে তিন খু'নের নেপথ্যে জমির বি'রোধ?
হা'মের উপসর্গে সিলেটে আরও দুই শিশুর মৃ'ত্যু