রোগীর চাপ সামলাতে মেঝেতেই হচ্ছে চিকিৎসা
বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:১২ PM

সিলেটে হাম পরিস্থিতি

রোগীর চাপ সামলাতে মেঝেতেই হচ্ছে চিকিৎসা

জৈন্তা বার্তা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৩/০৯/২০২৬ ০৫:৫২:৫৩ PM

রোগীর চাপ সামলাতে মেঝেতেই হচ্ছে চিকিৎসা

সংগৃহীত


সিলেটে হাম পরিস্থিতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটছেন অভিভাবকেরা। রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে কোথাও এক বিছানায় একাধিক শিশুকে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে, আবার কোথাও মেঝেতেই থাকতে হচ্ছে রোগী ও স্বজনদের। এর মধ্যে হাম-উপসর্গে মৃত্যুর ঘটনাও অব্যাহত রয়েছে।

বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় হাম সন্দেহে নতুন করে ১৬৪ জন বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে পাঁচ মাস বয়সী এক শিশু ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে। এ নিয়ে চলতি বছর সিলেট বিভাগে হাম ও হাম-উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭৩ জনে। বর্তমানে বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৬০০ জন।

গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হওয়া ১৬৪ জনের মধ্যে ৭০ জন ভর্তি হয়েছেন সিলেট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে এবং ৬২ জন এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এ ছাড়া নর্থ ইস্ট মেডিকেল হাসপাতালে ৬ জন, পার্কভিউ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৬ জন, বিশ্বনাথ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একজন, বিয়ানীবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৯ জন এবং মৌলভীবাজার জেলা সদর হাসপাতালে ১০ জন ভর্তি হয়েছেন।

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ১৭৫ জন, ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২৪০ জন এবং সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে ৬৮ জনসহ বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ৬০০ জন সন্দেহজনক হাম রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

শয্যার তুলনায় কয়েকগুণ রোগী

হাম চিকিৎসার জন্য সিলেট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে বরাদ্দ রয়েছে ১০০ শয্যা। অথচ সেখানে বর্তমানে ১৭৫ জন রোগী চিকিৎসাধীন। রোগীদের বড় অংশই শিশু। প্রাপ্তবয়স্ক রোগীও রয়েছেন। এর আগে রোগীর চাপের সময় এই হাসপাতালে একই বিছানায় একাধিক শিশুকে চিকিৎসা দেওয়ার ঘটনাও উঠে এসেছে। মেঝেতে অবস্থান করতে হয়েছে রোগী ও স্বজনদের।

হাম উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীদের অনেক বেসরকারি হাসপাতাল ভর্তি না করায় সরকারি হাসপাতালগুলোতেই বাড়ছে চাপ। ফলে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ ও এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীর চাপ সামাল দিতে চিকিৎসকদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।

শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. খসরুজ্জামান রনি বলেন, আসন সংখ্যার চেয়ে বেশি রোগী রাখতে হচ্ছে এবং প্রতিদিন রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। পরিস্থিতি অবশ্যই উদ্বেগজনক। তবে টিকাদান কার্যক্রম চলছে। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সচেতনতা ও অপেক্ষার ওপর জোর দিতে হচ্ছে। চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

এর আগে রোগীর চাপের বিষয়ে ডা. খসরুজ্জামান রনি জানিয়েছিলেন, ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি রোগী ও জনবল সংকটের কারণে হাসপাতালে নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, শুধু শিশুরাই নয়, প্রাপ্তবয়স্করাও হাম ও হাম-উপসর্গে আক্রান্ত হচ্ছেন।

টিকাবঞ্চিত শিশুই বেশি

হাসপাতালে ভর্তি হওয়া হাম আক্রান্ত শিশুদের বড় একটি অংশই হাম টিকা নেয়নি। সিলেট ও সুনামগঞ্জের প্রত্যন্ত এলাকার টিকাবঞ্চিত শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ বেশি দেখা যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। বিভাগের চার জেলাতেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে।

১৭৩ মৃত্যুর মধ্যে নিশ্চিত হাম মাত্র ১০ জনের

সিলেট বিভাগে চলতি বছর হাম ও হাম-উপসর্গে ১৭৩ জনের মৃত্যু হলেও ল্যাব পরীক্ষায় এদের মধ্যে মাত্র ১০ জনের হাম নিশ্চিত হয়েছে। অর্থাৎ, স্বাস্থ্য বিভাগের মৃত্যুর পরিসংখ্যানটি নিশ্চিত হাম রোগীর মৃত্যুর সংখ্যা নয়; এতে হাম-উপসর্গে মারা যাওয়া রোগীরাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।

স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক রোগীর ক্ষেত্রে হাম-উপসর্গের পাশাপাশি নিউমোনিয়া, হৃদ্‌যন্ত্রের সমস্যা ও অন্যান্য শারীরিক জটিলতা ছিল। এ কারণে শুধু হামকে মৃত্যুর একমাত্র কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে না।

নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠানোর জটিলতার কারণেও অনেক রোগীর ল্যাব পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না।

সিলেটেই বেশি নিশ্চিত রোগী

সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের হাম ও রুবেলা সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এখন পর্যন্ত বিভাগে নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ১ হাজার ৫৩ জন। এর মধ্যে সিলেট জেলায় ৩৮৫, সুনামগঞ্জে ৩৫৭, মৌলভীবাজারে ১৫৮ এবং হবিগঞ্জে ১৫৩ জন।

অন্যদিকে হাম ও হাম-উপসর্গে মৃত্যুর মধ্যে সিলেট জেলায় ৬৮, সুনামগঞ্জে ৬৬, হবিগঞ্জে ২৪ এবং মৌলভীবাজারে ১৫ জন রয়েছেন।

স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ হিসাবে, ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে কোনো নিশ্চিত হাম রোগী শনাক্ত হয়নি। তবে সন্দেহজনক রোগী হিসেবে হাসপাতালে ভর্তি অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

জৈন্তা বার্তা / ওয়াদুদ