ছবি:সংগৃহীত
সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার বিভিন্ন বিল, নদী, খাল ও জলাশয়ে নিষিদ্ধ কারেন্ট ও চায়না জালসহ নানা ধরনের অবৈধ জাল দিয়ে অবাধে মাছ শিকারের অভিযোগ উঠেছে। বর্ষা মৌসুমে এসব জালের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় ডিমওয়ালা মাছ, পোনা ও ছোট আকারের দেশি মাছ নির্বিচারে ধরা পড়ছে। এতে মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি দিন দিন কমে যাচ্ছে দেশি প্রজাতির মাছ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলার কুড়ি বিল, সিংগাপই বিল, নলুয়া বিল, মৌআলু বিল, দেউসাফরা বিলসহ বোকা নদী, রাংড়িংগা নদী ও বিভিন্ন জলাশয়ে নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল, চায়না রিং জাল, ম্যাজিক জাল, সুতিজাল, চায়না দোয়ারী ও রিংচাইসহ বিভিন্ন ধরনের জাল ব্যবহার করে মাছ শিকার করা হচ্ছে।
এসব জালের ফাঁক দিয়ে বড় মাছের পাশাপাশি পোনা ও ছোট মাছও আটকা পড়ছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন জলজ প্রাণীও এসব জালে মারা পড়ছে। ফলে জলজ জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
দেবেরগাঁও গ্রামের মৎস্যজীবী নরেশ চন্দ্র বলেন, ‘কুড়ি বিলের আশপাশে এবং বিলের ভেতরে অবৈধ চায়না দোয়ারী ও রিং জাল ব্যবহার করে মাছ শিকার করা হচ্ছে। বিষয়টি মৎস্য অফিসকে জানানো হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।’
স্থানীয়দের দাবি, নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধে নিয়মিত অভিযান ও নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন। লিখিত ও মৌখিকভাবে বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের জানানো হলেও অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তথ্যের ভিত্তিতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ছাতক উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. হানিফ উদ্দিন বলেন, ‘কোন কোন জায়গায় অবৈধ জাল দিয়ে মাছ মারা হচ্ছে, আমাদের তথ্য দিলে আমরা অভিযান পরিচালনা করব। সবার সহযোগিতা পেলে অভিযান অব্যাহত রাখব এবং এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
স্থানীয়দের মতে, উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে দেশি মাছের সংকট ক্রমেই প্রকট হচ্ছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে তারা অবৈধ ও নিষিদ্ধ জালের অবাধ ব্যবহারকে দায়ী করছেন। বর্ষা মৌসুমে মাছের প্রজনন ও ডিম ছাড়ার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এসব জাল দিয়ে নির্বিচারে পোনা ও ছোট মাছ ধরায় জলাশয়ে মাছের স্বাভাবিক বংশবিস্তার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
একসময় ছাতকের বিল ও নদীগুলোতে প্রচুর শোল, বোয়াল, গজার, মাগুর, শিং, কৈ, সরপুঁটি, পাবদা, আইড়, বাইম, খলসে, রিঠা, বেতাগা, বাঁশপাতা, রয়না ও কালিবাউশসহ নানা প্রজাতির দেশি মাছ পাওয়া যেত। বর্তমানে এসব মাছের অনেক প্রজাতিই আগের তুলনায় কমে গেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
শুধু মাছ নয়, নিষিদ্ধ জালের কারণে সাপ, ব্যাঙ, শামুকসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীও হুমকির মুখে পড়ছে। এতে জলাশয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশি মাছের প্রজনন ও জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রজনন মৌসুমে নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত অভিযান, জলাশয়ে মাছের অভয়াশ্রম গড়ে তোলা এবং স্থানীয় জেলে ও মাছ শিকারিদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
সচেতন মহলের দাবি, ছাতকের বিল-নদী ও জলাশয়ে দেশি মাছের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না; অবৈধ জালের উৎপাদন, বিক্রি ও ব্যবহার-তিন ক্ষেত্রেই কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। তা না হলে ভবিষ্যতে ছাতকের জলাশয় থেকে বহু দেশি মাছের প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জৈন্তা বার্তা/ ওয়াদুদ




