১৯ জন শিক্ষক-কর্মচারীর বিপরীতে শিক্ষার্থী মাত্র ১
শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৪০ AM

১৯ জন শিক্ষক-কর্মচারীর বিপরীতে শিক্ষার্থী মাত্র ১

জৈন্তা বার্তা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৬/০৯/২০২৬ ০৯:৫২:১৬ AM

১৯ জন শিক্ষক-কর্মচারীর বিপরীতে শিক্ষার্থী মাত্র ১

সংগৃহীত


সারি সারি বেঞ্চ। অথচ শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থী মাত্র একজন। হাতে বই নিয়ে বসে থাকা অষ্টম শ্রেণির সেই শিক্ষার্থীর নাম বৃষ্টি আক্তার। অপেক্ষা করছে শিক্ষকের জন্য।এদিকে পাশের কক্ষে কয়েকজন শিক্ষক-কর্মচারী গল্পে ব্যস্ত। কেউ মোবাইল ফোন ব্যবহার করছেন। অন্য একটি কক্ষে এক শিক্ষিকা নিজের শিশুকে মেঝেতে শুইয়ে রেখেছেন। পাশে থাকা অন্য শিক্ষিকারা ব্যস্ত পারিবারিক আলাপচারিতায়। একজন শিক্ষার্থীর সামনে খালি বেঞ্চের সারি। তাকে ঘিরে রয়েছে ১৯ জন শিক্ষক-কর্মচারী। সরেজমিনে এমন চিত্র দেখা গেছে, কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার নাজিমখান ইউনিয়নের সোমনারায়ণ মৌজার হাসারপাড় বড়বাড়ি গ্রামের বড়বাড়ী মহসিনিয়া দাখিল মাদ্রাসায়।

গত বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে এমপিওভুক্ত ওই মাদ্রাসায় গিয়ে দেখা যায়, নথিতে শিক্ষার্থী ১৮৮ জন। শিক্ষক-কর্মচারী ১৯ জন। এর মধ্যে শিক্ষক ১৪ জন এবং কর্মচারী পাঁচজন। সংশ্লিষ্ট তথ্যানুযায়ী, প্রতি মাসে সরকারি কোষাগার থেকে বেতন-ভাতা বাবদ দেওয়া হচ্ছে ৪ লাখ ৪৫ হাজার ৬৫৪ টাকা। কিন্তু শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি ছিল একজন।মাদ্রাসার তথ্যানুযায়ী, প্রথম থেকে চতুর্থ শ্রেণিতে কোনো শিক্ষার্থী নেই। পঞ্চম শ্রেণিতে ২২, ষষ্ঠে ২৪, সপ্তমে ২৭, অষ্টমে ৩৪, নবমে ৪১ এবং দশম শ্রেণিতে ৪০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। সব মিলিয়ে নথিতে শিক্ষার্থী ১৮৮ জন। অথচ সরেজমিনে অষ্টম শ্রেণির কক্ষে বই নিয়ে বসে থাকা বৃষ্টি আক্তার ছাড়া অন্য শ্রেণি কক্ষগুলোতে শিক্ষার্থী উপস্থিতি দেখা যায়নি। বৃষ্টি বলে, আমরা মাদ্রাসায় প্রতিদিন পাঁচ-ছয়জন করে আসি। ক্লাস বেশি হয় না। তাই শিক্ষার্থীও আসে না। মাদ্রাসাটিতে শিক্ষক ১৪ জন ও কর্মচারী পাঁচজন। অর্থাৎ একজন শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত থাকলেও প্রতিষ্ঠানটির জনবল ১৯ জন।

প্রতিষ্ঠানটির সূত্রে জানা গেছে, আরও শিক্ষক নিয়োগের জন্য এনটিআরসিএতে শূন্য পদের চাহিদা দেওয়া হয়েছে। প্রতিবছর প্রায় ৭০ জন শিক্ষার্থী উপবৃত্তিও পায়। প্রতিষ্ঠানটি ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং ১ জানুয়ারি ১৯৮৬ সালে স্বীকৃতি পায়। শিক্ষার্থী উপস্থিতির পাশাপাশি সাম্প্রতিক পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। চলতি বছরের দাখিল পরীক্ষায় মাদ্রাসাটি থেকে ৩১ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। পাস করেছে মাত্র দুজন। স্থানীয় বাসিন্দা নুর ইসলাম অভিযোগ করেন, কাগজে-কলমে শিক্ষার্থী দেখানো হলেও দাখিল পরীক্ষার সময় হাফেজিয়া মাদ্রাসা থেকে লোক এনে পরীক্ষা দেওয়ানো হয়। তাদের অটোভাড়া, খাবার ও পকেট খরচ দেওয়া হয়।সাবেক শিক্ষার্থী সাগর ইসলামও একই ধরনের অভিযোগ করেন। তার দাবি, মাদ্রাসা থেকে পাস করার পর তাকে অন্যের হয়ে তিনবার প্রক্সি পরীক্ষা দিতে হয়েছে। এ জন্য তাকে অটোভাড়া ও পকেট খরচ দেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি। মাদ্রাসার শিক্ষক সামছুল হক বলেন, মাদ্রাসাগুলোতে শিক্ষার্থী এমনিতেই কম। সেটা সবাই জানে।

মাদ্রাসার সহকারী সুপার আব্দুস সুবহান বলেন, মাদ্রাসাটি তিস্তা নদীর পাশে এবং হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় হওয়ায় শিক্ষার্থী পাওয়া যায় না। প্রতিষ্ঠানের সুপারিনটেনডেন্ট মো. শাহ আলম বলেন, আশপাশের প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীরা মাদ্রাসায় আসে না। হাফেজিয়া মাদ্রাসা থেকে যারা ভর্তি হয়, তাদের অনেকেই গণিত ও ইংরেজিতে দুর্বল। মাদ্রাসার সভাপতি ও কুড়িগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক (ব্যবসায় শিক্ষা) মো. লাল মিঞা সরকার বলেন, তিনি শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতির বিষয়টি অবগত। নদী এলাকা ও হিন্দু অধ্যুষিত হওয়ায় শিক্ষার্থী পাওয়া যায় না। আগামীতে শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের বুঝিয়ে মাদ্রাসামুখী করতে কাজ করার প্রস্তুতি চলছে। রাজারহাট উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম বলেন, দুই-একদিনের মধ্যে পরিদর্শন করাব। সমস্যা পাওয়া গেলে অবশ্যই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

জৈন্তাবার্তা/সুলতানা