ফাইল ছবি
হবিগঞ্জ জেলার লাখাই উপজেলার বামৈ গ্রামে সনাতনী হিন্দু সম্প্রদায়ের বৃহত্তর মন্দির শ্রী শ্রী গোপাল জিউ আশ্রমের প্রতিষ্টাতার ১৬৫ তম জন্ম বার্ষিকী আজ।
প্রতাপশালী শুদ্ধাচার, জমিদার বংশে ১৮৫৯ সালের ১০ জুন শুক্রবার দশহরার দিন ব্যারিস্টার তারা কিশোর চৌধুরী ওরফে শ্রীশ্রী ১০৮ স্বামী সন্তু দাস কাঠিয়া মহারাজ জন্মগ্রহন করেন।পিতা জমিদার এডভোকেট হরকিশোর চৌধুরী ব্রাক্ষণ ছিলেন।মাতা গিরিজা সুন্দরী দেবী একজন সাংসারিক মহিলা ছিলেন। সাত বৎসর বয়সে তারা কিশোর বামৈ গ্রামে নিজেদের প্রতিষ্টিত ইংরেজী স্কুলে ভর্তি হন। এক বৎসর লেখাপড়া করে লস্করপুর স্কুলে ভর্তি হন। নয় বৎসর বয়সে তার মা মারা যান।
চলে যান সিলেটে। ভর্তি হন সিলেট সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ে। ১৮৭৪ সালে সিলেট সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এন্ট্রাস পরীক্ষায় সমগ্র আসাম প্রদেশের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেন। ফলাফলের খবর শুনে বামৈ ভাদিকারা লোকজন আনন্দ উৎফুল্ল হয়ে উঠে। বৃটিশ সরকার তাকে গোল্ড মেডেল পুরষ্কার দেয়। এন্টাস পরীক্ষায় ভাল ফলাফলের জন্য আসাম সরকারের কাছ থেকে পনের টাকা বৃত্তি পেতেন। এন্টাস পাশ করার পর মাধবপুর থানার বেজুড়া গ্রামের প্রসিদ্ধ বিশারদ বংশীয় স্বর্গীয় হরচ ন্দ্র ভট্রাচার্যের কন্যা অন্নদা রানী ভট্রাচার্যের সহিত বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এন্টাস পরীক্ষায় পাশের পর কলকাতা প্রেসিডেন্সী কলেজে ভর্তি হন।
এ সময় কলকাতা মেসে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস নেতা হবিগঞ্জ পৈল গ্রামের সন্তান বিপিন চন্দ্র পাল, সিলেট বিভাগের প্রথম ডাক্তার সুন্দরী মোহন দাশ, সিলেট জেলার অন্যান্য ছাত্ররা এক সাথে থেকে পড়াশুনা করতেন। ১৮৭৬ সালে বৃত্তিসহ প্রথম বিভাগে এফ এ পাশ করেন। ১৮৭৭ সালে কলকাতায় শ্রীহট্র জেলার ছাত্রদেরকে নিয়ে গঠন করেন শ্রীহট্রী সম্মিলনী। তারাকিশোর চৌধুরী ছিলেন প্রধান উদ্যেগতা।১৮৭৯ সালে কলকাতা প্রেসিডেন্সী কলেজ থেকে প্রথম শ্রেণীতে বি এ পাশ করেন। ১৮৮৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শন শাস্ত্রে এম এ এবং আইনে ডিগ্রী লাভ করেন।১৮৮৫ সালে সিলেট বারে আইন পেশায় যোগ দেন। চার বছর সিলেট থাকার পর কলকাতা হাইকোর্টে আইন পেশায় যোগ দেন।
কলকাতা হাইকোর্টে তার যশ খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। কলকাতা হাইকোর্টের শ্রেষ্ট আইনজীবি স্যার রাসবিহারী ঘোষের পরেই ছিল এডভোকেট তারাকিশোর চৌধুরীর স্থান। কলকাতা বাড়ীতে প্রতিদিন নারায়নের নিত্য সেবা হতো। সিলেট জেলার অভাবগ্রস্ত ছাত্রছাত্রী ও অন্যান্য আত্নীয় স্বজন তার বাড়ীতে আশ্রয় পেত। সিলেট জেলার লোকদের চাকুরী,ব্যবসা,লজিং,টিউশনীর ব্যবস্থা করে দিতেন কলকাতা শহরে। ১৯৯৪ সালে ২৪ আগষ্ট স্ত্রীসহ বৃন্দাবনে গমন করেন। বজ্রবিদেহী মহন্ত ও বৈষ্ণব চতু:সম্প্রদায়ের শ্রীমহন্ত শ্রী ১০৮ স্বামী কাটিয়া বাবা মহারাজের কাছ থেকে শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমীর দিন দীক্ষা লাভ করেন। কয়েকদিন বৃন্দাবন অবস্থানের পর কলকাতায় ফিরে আসেন। তিনি ধর্ম নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে থাকেন। ১৮৯৭ সালের ১২ জুন বৃন্দাবনে মন্দির প্রতিষ্টা করেন। তিনি অনেক ধর্মগ্রন্থ রচনা করেন।
১। ব্রক্ষবাদী ঋষি ও এক বিদ্যা।
২। দার্শনিক ব্রক্ষবিদ্যা ৪ খন্ড।
৩। গুরুশিষ্য সংবাদ।
৪। শ্রী মদ্ভাগবদ গীতার টিকা।
৫। শ্রীরামদাস কাটিয়া বাবার জীবন চরিত।
৬। পত্রাবলী ২ য় ভাগ।
১৯১২ সালে বৃটিশ সরকার কলকাতা হাইকোর্টের এটর্ণী জেনারেল পদে নিয়োগ দেন। তিনি হলেন কলকাতা হাইকোর্টের প্রথম বাংগালী এটর্ণী জেনারেল। তিনি যে বেতন পেতেন সব টাকা বৃন্দাবনে পাঠিয়ে দিতেন। ১৯১৫ সালে আগষ্ট মাসে কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি পদে নিয়োগ দেন। বিচারপতির পদ যোগ দেন নাই। ১৯১৫ সালে ত্রিশ বছরের ওকালতি পেশা পরিত্যাগ করে বৃন্দাবনের উদ্দেশ্য রওয়ানা দেন।কলকাতা শহরের বাসা বাড়ী, ধন সম্পদ সবকিছু মানুষকে দান করে যান।অনেক ঋনী লোকের ঋন পরিশোধ করে যান। কলকাতা শহর থেকে বৃন্দাবন যাবার সময় রেলের ভাড়া পর্যন্ত ছিল না। কলকাতার আইনজীবি, ব্যবসায়ী,ছাত্রযুবক, বৃদ্ধ,নারী মিছিল সহকারে তারাকিশোর চৌধুরীকে বিদায় জানান।বৃন্দাবনে সন্নাসী হবার পর নাম হয় সন্তদাস বাবাজী। মহারাজ বৃন্দাবনে আসার পর দিনরাত কেউ ঘুমাতে দেখেন নাই,সব সময় ধ্যান নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন।তিনি সামান্য আহার করতেন। ভারতবর্ষের সবচেয়ে বড় মেলা হল কুম্ভকর্ন মেলা। এই সারা ভারত থেকে কোটি লোকের আগমন ঘটে।এই কুম্ভকর্ন মেলার পরিচালকের দায়িত্ব পান তিনি। ১৯৩১ সালে হাওড়ার শিবপুরে একটি আশ্রম প্রতিষ্টা করেন।১৯৩৪ সালের জুলাই মাসে সিলেট শহরে নিম্বাক আশ্রম প্রতিষ্টা করেন তারাকিশোর চৌধুরী ।১৯৩৫ সালের ৮ নভেম্বর বিকেলে তুফান মেইলে সন্তদাসজী মহারাজ বৃন্দাবনে দেহত্যাগ করেন। মৃত্যুর খবর শোনার পর কয়েক লাখ লোক বৃন্দাবনে জড়ো হতে লাগলো।
একটানা ১৮ ঘন্টা তারাকিশোর চৌধুরীর লাশ নিয়ে মিছিল করলেন। বৃন্দাবনবাসী কান্নায় ভেংগে পড়লেন। সন্ত বাবা কি জয়। সন্ত বাবা কি জয় শ্লোগান দিতে দিতে যমুনার নদীর পাড়ে নিয়ে যাওয়া হয়। তার গুরুদেবের সমাধী স্থানে নিয়ে যাওয়া হল। চন্দন কাঠ দিয়ে সৎকার করা হয়। তার শিষ্যরা ভারাকান্ত মন নিয়ে আস্রমে ফিরে আসেন। লাখাই থানার বামৈ গ্রামে তার মন্দির আছে।৷ শ্রীশ্রী গোপাল জিউর আশ্রম এর সাবেক সভাপতি তাপস কিশোর রায় বলেন
তারাকিশোর চৌধুরীর বিশাল সম্পদ ছিল বামৈ গ্রামে, সকল সম্পদ শ্রীশ্রী গোপাল জিউ মন্দিরের নামে দান করেন । বামৈ হাইস্কুল, উপজেলা হাসপাতাল তার জায়গাতেই গড়ে উঠেছে। তারাকিশোর চৌধুরীর ছোট ভাই যোগেন্দ্র কিশোর চৌধুরী ১৯৬৭ সালে ভারতের ত্রিপুরা থেকে লোক সভার সদস্য ( এম পি) নির্বাচিত হয়েছিলেন।
জৈন্তা বার্তা / আশীষ/ টিটু




