আজ কৃষ্ণপুর গণহ ত্যা দিবস
মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:২০ অপরাহ্ন

আজ কৃষ্ণপুর গণহ ত্যা দিবস

জালাল উদ্দিন লস্কর ,মাধবপুর প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৮/০৯/২০২৪ ০৩:০৯:৫৩ পূর্বাহ্ন

আজ কৃষ্ণপুর গণহ ত্যা দিবস


আজ বুধবার (১৮ সেপ্টেম্বর) হবিগঞ্জ জেলার লাখাই উপজেলার কৃষ্ণপুর গণহত্যা দিবস। ১৯৭১ সালের আজকের দিনে লাখাই উপজেলার কৃষ্ণপুর গ্রামে ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরেরা।

কৃষ্ণপুরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী লাখাই থানা, নাছিরনগর থানা ও অষ্টগ্রাম থানার রাজাকারদের সহযোগিতায় গুলি চালিয়ে এক সাথে ১২৭ জন বাঙালি হিন্দুকে হত্যা করে। এরপর নিহতদের লাশ পানিতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে এটি হবিগঞ্জ জেলায় সবচেয়ে বড় হত্যাকাণ্ড যা কৃষ্ণপুর গণহত্যা নামে পরিচিত।

মুক্তিযুদ্ধের সময় এ গ্রামটি বৃহত্তর সিলেট জেলার একটি প্রত্যন্ত গ্রাম ছিল। বর্তমানে গ্রামটি হবিগঞ্জ জেলার দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে একদম শেষ মাথায় লাখাই উপজেলার অধীনে পড়েছে। লাখাই থানা থেকে কৃষ্ণপুর গ্রামের দূরত্ব মাত্র পাঁচ কিলোমিটার। গ্রামের দক্ষিণ দিকে বলভদ্র নদী বয়ে গেছে যা হবিগঞ্জ এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে পৃথক করেছে। কৃষ্ণপুর গ্রামের পার্শ্ববর্তী অর্থাৎ বলভদ্র নদীর দক্ষিণ পাড়ে চণ্ডীপুর গ্রামটি হিন্দু অধ্যুষিত ছিল। চণ্ডীপুর গ্রামটি আবার ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাছিরনগর উপজেলায় অবস্থিত।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম ছয় মাস কৃষ্ণপুর গ্রামের লোকজন সাধারণভাবে জীবনযাপন করেছিলেন। যুদ্ধের আঁচ তাদের গায়ে লাগেনি। গ্রামটি হাওরের প্রত্যন্ত এলাকায় হওয়ায় প্রায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। আশপাশের অনেক হিন্দু তখন কৃষ্ণপুর গ্রামে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাদের ধারণা ছিল, এই হাওরের গ্রামে কোনোদিন পাকিস্তানের সেনারা আসবে না।

ততদিনে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী হবিগঞ্জের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় এবং লাখাই পর্যন্ত এসে পৌঁছে যায়। কিন্তু তারা কৃষ্ণপুরের দিকে অগ্রসর হয়নি। লাখাই থানায় পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর প্রথম ক্যাম্প ছিল মানপুরে। এরপর তারা ক্যাম্প করে লাখাই থানার সদর দপ্তর স্বজনগ্রামের টাউনশিপে। পরে যোগাযোগ ব্যবস্থার অসুবিধা এবং মুক্তিবাহিনীর প্রতিরোধের মুখে টিকতে না পেরে পাকিস্তানি সেনারা তাদের ক্যাম্প লাখাই থানা থেকে গুটিয়ে কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম নিয়ে যায়।

বিভিন্ন সূত্রে এবং স্থানীয় কিছু প্রবীণ ব্যক্তির সাথে কথা বলে জানা যায়, ১৯৭১ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী, রাজাকার, আলবদররা লাখাই থানায় সুবিধা করতে পারেনি। তবে ১৯৭১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর সব রাজাকারেরা কৃষ্ণপুর গ্রামে গণহত্যা সংঘটিত করার উদ্দেশে অষ্টগ্রামে পাকিস্তানি ক্যাম্পে জড়ো হয়। অষ্টগ্রাম ক্যাম্পে গণহত্যার পরিকল্পনা করা হয়। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে পাক হানাদার বাহিনীর এদেশীয় দোসরেরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। তাদের সমস্ত আক্রোশ গিয়ে পড়েছিল হিন্দুদের ওপর।

১৯৭১ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর রাজাকারেরা গভীর রাতে দেশীয় নৌকা, স্পিড বোট ও লঞ্চ নিয়ে গ্রামটিতে এসে পোঁছে এবং পুরো গ্রাম ঘিরে ফেলে। পরদিন ১৮ সেপ্টেম্বর ভোর ৪টা থেকে ৫টার দিকে কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম থানায় স্থাপিত সেনাবাহিনীর ক্যাম্প থেকে একটি স্পিডবোট ও ১০/১২টি বড় নৌকায় করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর একটি দল কৃষ্ণপুর গ্রামে আসে। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় লাখাই থানার মুড়াকরি গ্রামের রাজাকার খেলু মিয়া, রাজাকার লিয়াকত আলী, রাজাকার বাদশা মিয়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার ফান্দাউকের রাজাকার আহাদ মিয়া, রাজাকার বল্টু মিয়া, কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম থানার রাজাকার লাল খাঁ, 'আমি আলবদর বলছি' বইয়ের লেখক রাজাকার আমিনুল ইসলাম রজব আলী, লাখাই থানার সন্তোষপুর গ্রামের মোর্শেদ কামাল ওরফে শিশু মিয়াসহ ৪০ থেকে ৫০ জনের একদল রাজাকার-আলবদর বাহিনী। এই রাজাকারদের  পরামর্শ ও উস্কানিতে কৃষ্ণপুর গ্রামে হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়।

গ্রামে ঢুকে একটি দল নৌকা থেকে নেমেই নির্বিচারে গুলি ছুঁড়তে শুরু করে জনসাধারণের মাঝে ত্রাসের সঞ্চার করে। অন্য দলটি তখন গ্রাম এবং নৌকা পাহারা দিতে থাকে। ওই সময়ে গ্রামে ঢুকে রাজাকাররাও গুলি চালাতে থাকে এবং গ্রামে ব্যাপক লুটপাট শুরু করে। তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে বন্দুকের মুখে গ্রামবাসীর নগদ টাকা-পয়সা এবং স্বর্ণালঙ্কার লুট করে নিয়ে যায়। রাজাকারদের দ্বারা প্ররোচিত হয়ে পাকিস্তানি সৈন্যরা পুরো গ্রামে আগুন ধরিয়ে দেয়। ১৩১ জন হিন্দুকে স্থানীয় কমলাময়ী উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে চক্রাকারে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ার করা হলে ১২৭ জন সঙ্গে সঙ্গেই নিহত হন। প্রিয়তোষ রায়, নবদ্বীপ রায় এবং হরিদাস রায় বুলেটের আঘাতে জর্জরিত হয়েও প্রাণে বেঁচে যান। উল্লেখিত ৩ জন সারা জীবনের জন্য বিকলাঙ্গ হয়ে পড়েন। তাদের মধ্যে হরিদাশ রায় সেদিনের দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে এখনো বেঁচে আছেন। আর নবদ্বীপ রায় ও প্রিয়তোষ রায় কয়েক বছর আগে মারা গেছেন।

চণ্ডীপুর ও লালচানপুর গ্রামেও অনেক হিন্দু পরিবারের বাস ছিল। লালচাঁদপুর এলাকায় মধু নমঃশূদ্রের বাড়িতে ৫১ জনকে তাদের সবকিছু লুটপাটের পর একই লাইনে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ারের মাধ্যমে হত্যা করা হয়। গোকুলনগরেও একই কায়দায় ৮ জন হিন্দুকে হত্যা করা হয়। তিন স্থানে মিলে ১৮৬ জনকে হত্যা করা হয়।

বেঁচে যাওয়া হরিদাস রায় ২০১০ সালের ৪ মার্চ হবিগঞ্জ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে রাজাকার লিয়াকত আলী এবং অন্যান্য রাজাকারদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। রাজাকার লিয়াকত আলী অত্র উপজেলার মোড়াকরি গ্রামের বাসিন্দা। মামলা করার পরপরই রাজাকারদের কাছ থেকে বাদী হত্যার হুমকি পেতে থাকেন। এ ব্যাপারে ২০১০ সালের ৭ জুন লাখাই থানায়  জিডি করা হয়। ২০১০ সালের ১২ আগস্ট কৃষ্ণপুর গণহত্যা মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রথম মামলা হিসেবে সিলেট বিভাগ থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গৃহীত হয়। লিয়াকত আলী ও রজব আলীর বিরুদ্ধে ৭ অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনের ৩(১), ৪(১) ও ৪(২) ধারায় হত্যা, গণহত্যা, আটক, অপহরণ, নির্যাতন, ধর্ষণ ও লুটপাটের সাতটি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়। রাজাকার লিয়াকত আলী পালিয়ে গিয়ে বর্তমানে আমেরিকায় ও রাজাকার আমিনুল ইসলাম ওরফে রজব আলী পাকিস্তানে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে।

জৈন্তা বার্তা / আরআর



শীর্ষ সংবাদ:

প্রেমের সম্পর্কে কলহ, বি/ষপানের ৯ দিন পর শাবিপ্রবি শিক্ষার্থীর মৃ/ত্যু
সিলেটে নি/ষিদ্ধ ছাত্রলীগের কর্মী গ্রে/প্তার
ওসমানীনগরে ফুটবল খেলা নিয়ে সং/ঘ/র্ষে ওসিসহ আ/হত ২০
গোলাপগঞ্জে ছাত্রকে ধ/র্ষ/ণের মা/মলায় প্রধান শিক্ষক গ্রে/প্তার
‘ইউ আর আ টে/ররি/স্ট’ স্লোগানে নিউইয়র্ক বিমানবন্দরে ড. ইউনূসকে ঘিরে বি/ক্ষো/ভ
অর্থনীতির সং ক ট মোকাবিলায় গবেষণা, নোবেল পেলেন দুই মার্কিন অধ্যাপক
সিলেট নগরীর বিভিন্ন এলাকায় উন্নয়নকাজ পরিদর্শনে সিসিক প্রশাসক
সব ধর্মের মানুষের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিএনপি বদ্ধপরিকর: নাসিম হোসাইন
সিলেটে ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহ শুরু মঙ্গলবার
ধর্মীয় উৎসবে সম্প্রীতি অটুট রাখতে হবে: এমপি ফয়সল