ভালো কাজের লোভ দেখিয়ে মানুষ বিক্রি : জনমনে উদ্বেগ
শনিবার, ৩০ মে ২০২৬, ০৮:২৪ PM

ভালো কাজের লোভ দেখিয়ে মানুষ বিক্রি : জনমনে উদ্বেগ

জৈন্তাবার্তা প্রতিবেদন

প্রকাশিত: ৩০/০৪/২০২৫ ০১:৫৭:৫২ AM

ভালো কাজের লোভ দেখিয়ে মানুষ বিক্রি : জনমনে উদ্বেগ

প্রতীকী ছবি


ভালো কাজের লোভ দেখিয়ে সিলেটের হতদরিদ্র পরিবারগুলোকে ফাঁদে ফেলছে প্রতারক চক্র। সম্প্রতি পরপর দুটি অপহরণের ঘটনায় সিলেটজুড়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। গেল এক সপ্তাহের ব্যবধানে ৬ শ্রমিক ও ২ কিশোরীকে অপহরণকারীদের হাত থেকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। এতে সাধারণ মানুষের মাঝে মানব পাচার আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। 

সর্বশেষ গত ৭ এপ্রিল ঢাকায় গার্মেন্টসে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে সিলেটের দুই কিশোরীকে (১৬) পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য ও পাচারের চেষ্টা করে একটি চক্র। এ ঘটনায় শাহনাজ ও তার স্বামী মুরাদ আহমেদ রাজুকে আটক করেছে পুলিশ। গত সোমবার ভোর সাড়ে ৪ টার দিকে পীরের বাজার টিকেরপাড়া এলাকা থেকে তাদের আটক করা হয়। 

জানা গেছে, ঢাকায় গার্মেন্টসে কাজ দেওয়ার কথা বলে সিলেট থেকে দুই কিশোরীকে কক্সবাজার নিয়ে আবাসিক হোটেলে বিক্রি করে দিয়েছিল পাচারকারী চক্র। ১৪ দিন নির্যাতন সহ্য করে ওই দুই তরুণী ফিরেছেন সিলেটে। 

ভুক্তভোগীরা জানান, তাদের উভয়ের বাড়ি শহরতলীর পীরেরবাজারে। শাহনাজ নামের এক প্রতিবেশি নারী তাদেরকে গার্মেন্টসে কাজ দেওয়ার কথা বলে ৭ এপ্রিল তাদেরকে কক্সবাজারে পাঠান। ডলফিন মোড় থেকে তাদেরকে রিসিভ করে ওই নারীর ছেলে ইমন। সে তাদেরকে তার বাসায় নিয়ে যায়। পরদিন গার্মেন্টসে নেয়ার নাম করে কক্সবাজারের একটি আবাসিক হোটেলে নিয়ে ইমন তাদেরকে সেখানে রেখে চলে আসে। পরে তাদেরকে হোটেলে আটকে রেখে ১৪ দিন জোরপূর্বক অনৈতিক কাজে বাধ্য করা হয়। 

এদিকে, মেয়েদের খোঁজ না পেয়ে তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে ৯ এপ্রিল শাহপরাণ থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। এক পর্যায়ে মুক্তি পেয়ে তারা গত বৃহস্পতিবার সিলেট ফিরে আসেন। পরে তাদেরকে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। 

এর আগে গত ২২ এপ্রিল টেকনাফের রাজার ছড়া গ্রামের দুর্গম পাহাড় থেকে আরও ৬ শ্রমিককে উদ্ধার করা হয়। কাজের উদ্দেশ্যে তারা কক্সবাজার গিয়েছিলেন। পুলিশ জানায় ওই ছয় শ্রমিককে জনপ্রতি ২০ হাজার টাকা করে বিক্রি করে মানবপাচার চক্র। অপহৃতদের উদ্ধারের পর জানা গেছে, মানবপাচারচক্র মালয়েশিয়ায় পাঠানোর জন্য ছয়জনকে জনপ্রতি ২০ হাজার টাকা করে কিনে নেয়। তাদেরকে বিক্রি করে শহিদুল নামের এক ঠিকাদার। সেই ঠিকাদার ছাড়া আর কাউকেই তারা চিনতে পারেনি। শহিদুলই তাদেরকে কাজের কথা বলে মানবপাচারকারীদের হাতে তুলে দেয়। 

ফিরে আসা ৬ শ্রমিক জানিয়েছেন, দালালদের হাত বদলের মাধ্যমে তাদেরকে ইন্দোনেশিয়ায় পাচারের চেষ্টা করা হয়েছিল। চট্টগ্রামের শফিউল্লাহ নামের এক ঠিকাদার রাজমিস্ত্রির কাজ দেওয়ার কথা বলে সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার খলাছড়া ইউনিয়নের পশ্চিম লোহারমহল গ্রামের রশিদ আহমদ, মারুফ আহমদ, শাহিন আহমদ, এমাদ উদ্দিন, খালেদ হাসান ও আবদুল জলিলকে কক্সবাজার নিয়ে যান। ১৬ এপ্রিল কক্সবাজার পৌঁছে তারা পরিবারের সাথে ফোন কথা বলেন। এরপর থেকে তাদের ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। 

২১ এপ্রিল তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে কক্সবাজার থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়। পরদিন ২২ এপ্রিল নিখোঁজ রশিদ আহমদ তার ভাই বাহার উদ্দিনকে ফোন দিয়ে জানান, তাদেরকে টেকনাফের বাহারছড়ার একটি পাহাড়ি এলাকায় বন্দি করে রাখা হয়েছে। আজ রাতেই তাদেরকে ট্রলারে করে ইন্দোনেশিয়া পাঠিয়ে দেওয়া হবে। সাথে সাথে বাহার উদ্দিন বিষয়টি জানালে পুলিশ বাহারছড়ার শিলখালির আস্তানা থেকে ওই ৬ জনকে উদ্ধার করে। 

অপহৃতরা জানিয়েছেন, বাহারছড়ার একটি আস্তানায় আটকে রাখার পর তারা বুঝতে পারেন তারা পাচারকারীদের খপ্পরে পড়েছেন। তখন তারা ছেড়ে দেওয়ার জন্য কান্নাকাটি শুরু করলে দালাল জানায় সে জনপ্রতি ২০ হাজার টাকা দিয়ে তাদেরকে কিনেছে। এখন তাদেরকে ইন্দোনেশিয়ার একটি গ্রæপের কাছে জনপ্রতি ৪ লাখ টাকা করে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। ট্রলারে করে বাহারছড়া ঘাট থেকে তাদেরকে পাচারের আগেই সুযোগ পেয়ে রশিদ আহমদ তার ভাইকে ফোন দেন। এরপর তাদেরকে উদ্ধার করা হয়। 

এ বিষয়ে সিলেট জেলা পুলিশের মিডিয়া ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা মো. সম্রাট তালুকদার বলেন, ‘পরপর দুটি অপহরণের ঘটনা অবশ্যই উদ্বেগের। এই চক্রে সিলেটের কারা জড়িত তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। অপরহণকারী চক্রের ব্যাপারে পুলিশ সর্তক রয়েছে বলে জানান তিনি।’


জৈন্তাবার্তা / রহমান