জুতা সেলাই করে আর সংসার চলে না মুচিদের
শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:০৩ AM

জুতা সেলাই করে আর সংসার চলে না মুচিদের

রেজুওয়ান কোরেশী, জগন্নাথপুর প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৯/০৫/২০২৫ ০১:৩৮:২৪ AM

জুতা সেলাই করে আর সংসার চলে না মুচিদের

ছবি নিজস্ব


যুগ যুগ ধরে বংশানুক্রমে জুতা সেলাইয়ের কাজ করছেন সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরের মুচি সম্প্রদায়ের অসংখ্য মানুষ। বর্তমান সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে জীবনযাত্রার মান পরিবর্তন করে একাংশ এ পেশা ছাড়লেও এখনও অনেকে বংশ পরম্পরায় বাপ-দাদার এ ঐতিহ্যবাহী পেশায় টিকে রয়েছেন। তবে কালের বিবর্তনে আর দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে স্বাভাবিক জীবনযাপনে হিমশিম খেতে হচ্ছে সমাজে পিছিয়ে থাকা এ সম্প্রদায়কে।

এ প্রতিবেদকের সাথে কথা হয় জগন্নাথপুর বাজারে ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে জুতা সেলাইয়ের পেশায় থাকা মুচি সম্প্রদায়ের লোকজনের সাথে। আলাপকালে জানা যায়, বংশ মোতাবেক বাপ-দাদারা জুতা সেলাই করতেন। তাদের পরম্পরায় একই পেশায় অনেকে যুক্ত রয়েছেন। কিন্তু এ পেশা থেকে উপার্জিত অর্থ দিয়ে তাদের পরিবার এখন আর চলে না। তাছাড়া মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তন হয়েছে, টাকা হয়েছে। এখন আর ছেঁড়া জুতা সেলাই করে পায়ে দেয় না তেমন কেউ। জুতা ছিঁড়লে মানুষ নতুন জুতা কিনে নেয়।

স্থানীয় মুচি কাচা রবিদাস বলেন, প্রায় ২০-২৫ বছর ধরে এই কাজ করে সংসার চালিয়েছি। কিন্তু এখন আর পারছি না। ঈদ-পূজায় কিছু কাজ হয়। তখন আমরা কয়টা টাকা-পয়সা পাই। পরে আর কেউ আসে না। আয়-রোজগার একদমই নেই। সারাদিন কাজ করে ২০০-৩০০ টাকা আয় হয়। এই টাকায় সংসার চালানো কঠিন।

তিনি আরো বলেন, সারাদিন কাজ করে বাড়িতে যাওয়ার সময় ঠিকমতো চাল-ডাল পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারি না। খেয়ে না খেয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে কোনোরকম চলছে আমাদের জীবন। এমনকি অনেকে এ পেশা ছেড়ে নাপিতের (সেলুন) পেশায় ঝুঁকছে।

সমর রবিদাস বলেন, জুতা কালির কাজ করে আর পেট চলে না। বাচ্চাদের লেখাপড়া করার খরচ দিতে পারি না। বড় কষ্টে আছি। 

লক্ষন রবিদাস বলেন, পরিবারে ১৫ জন সদস্যের মধ্যে তিন ভাতিজি কলেজে পড়ে, বাকিগুলো হাইস্কুলে লেখাপড়া করে। ঠিকমতো তাদের খরচ দিতে পারছি না। প্রতিদিন যা পাই, তা চাল-ডাল আনতেই ফুরিয়ে যায়। মাছ-মাংস কেনা অনেক দূরের কথা।

জানা গেছে, জীবনযাত্রার মান পরিবর্তনে ছোটবেলা থেকে যারা মুচি হিসেবে কাজ করে আসছেন তারাও চান না তাদের পরবর্তী প্রজন্ম এই কাজ শিখুক। কারণ এই পেশায় কাজ করে সংসার চালানো বেশ কষ্টসাধ্য। এমনকি মানুষ এখন তাদেরকে ভালো চোখে দেখে না বলেও অভিযোগ অনেকের। 

জগন্নাথপুর গ্রামের সমাজসেবক খেজর মিয়া জানান, মুচি সম্প্রদায়ের অনেকে দীর্ঘদিন ধরে জগন্নাথপুর বাজারে জুতা সেলাই করে আসছেন। তারা আসলেই মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তাদের ব্যাপারে উদ্যোগী হওয়া দরকার, কিছু করা দরকার। কেননা তারা এই পেশা ছেড়ে দিলে প্রয়োজনের সময়ে আমাদেরকেই সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে।

জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরকত উল্লাহ বলেন, আসলেই মুচিরা একটি অবহেলিত সম্প্রদায়। পুরাতন জুতার মেরামত করেই চলে তাদের সংসার। আধুনিকতার যুগে তাদের পেশা এখন হারিয়ে যেতে বসেছে।

ইউএনও আরও বলেন, তারা যে কোনো ধরনের সহযোগিতা পান না তা আমার জানা ছিল না। আপনার মাধ্যমে জানতে পারলাম। তাদের বলবেন আমার অফিসে এসে দেখা করতে। তাদের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে।

জৈন্তা বার্তা/আরআর