ছবি:সংগৃহীত
মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলায় চা শ্রমিকদের মজুরি বন্ধ এবং বাংলাদেশ চা বোর্ডের অডিট টিমের সদস্যদের আপত্তিকর মন্তব্যের অভিযোগকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। প্রায় দেড় হাজার বিক্ষুব্ধ চা শ্রমিক বাগান ম্যানেজার, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও অডিট টিমের সদস্যদের প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে বাগান কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখেন।
মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) বাংলাদেশ চা বোর্ড নিয়ন্ত্রিত বড়লেখা উপজেলার নিউ সমনবাগ চা বাগানে এ ঘটনা ঘটে।
খবর পেয়ে বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গালিব চৌধুরী, বড়লেখা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান খান এবং স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ইমরান আহমদ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। প্রশাসনের হস্তক্ষেপে বেলা দেড়টার দিকে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা অবরোধ প্রত্যাহার করেন।
জানা গেছে, চা পাতা চয়ন বন্ধকালীন সময়ে শ্রমিকদের গড় মজুরি দেওয়ার নিয়ম থাকলেও এবার তা মানা হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী শ্রমিকদের সাপ্তাহিক ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা পাওয়ার কথা থাকলেও বাগান কর্তৃপক্ষ মাত্র ১০০ থেকে ২০০ টাকা প্রদান করেছে। এছাড়া টানা তিন সপ্তাহ ধরে শ্রমিকদের সাপ্তাহিক মজুরি বন্ধ রয়েছে বলে অভিযোগ শ্রমিকদের।
এরই মধ্যে গত ৫ জানুয়ারি চা শ্রমিকদের ডাটাবেজ তৈরির লক্ষ্যে বাংলাদেশ চা বোর্ড থেকে ছয় সদস্যের একটি অডিট টিম নিউ সমনবাগ চা বাগানে তথ্য সংগ্রহে আসে। অভিযোগ রয়েছে, তথ্য সংগ্রহের সময় অডিট টিমের কয়েকজন সদস্য বিশেষ করে নারী চা শ্রমিকদের সঙ্গে অশোভন আচরণ ও আপত্তিকর মন্তব্য করেন। এতে শ্রমিকদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়।
এই ঘটনার জেরে মঙ্গলবার সকাল ১০টা থেকে নিউ সমনবাগ, পাথারিয়া চা বাগান ও মোকাম ডিভিশনের প্রায় দেড় হাজার শ্রমিক নিউ সমনবাগ চা বাগান কার্যালয়ের সামনে জড়ো হন। ক্ষুব্ধ শ্রমিকরা বাগান ম্যানেজার এমদাদুর রহমান, অফিস স্টাফ, কর্মচারী ও অডিট টিমের সদস্যদের অবরুদ্ধ করে রাখেন।
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে প্রশাসনের কর্মকর্তারা শ্রমিক নেতা, বাগান ব্যবস্থাপক ও অডিট টিমের সদস্যদের সঙ্গে প্রায় দেড় ঘণ্টা রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন জুড়ী ভ্যালির সভাপতি শ্রীমতি বাউরী, সমনবাগ চা বাগান পঞ্চায়েতের সভাপতি নারায়ন কালোয়ার, পাথারিয়া চা বাগানের সভাপতি মোহন রিকমুন, মোকাম ডিভিশনের সভাপতি ফজল তাতি, ইউপি সদস্য সমীরণ মুন্ডাসহ সংশ্লিষ্ট নেতৃবৃন্দ।
বৈঠক শেষে ইউএনও শ্রমিকদের সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দিলে পরিস্থিতি শান্ত হয় এবং শ্রমিকরা অবরোধ প্রত্যাহার করেন।
এ সময় প্রশাসনের উপস্থিতিতে অডিট টিমের প্রধান ও বাংলাদেশ চা বোর্ডের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম নারী শ্রমিকদের প্রতি আপত্তিকর মন্তব্যের অভিযোগে দুঃখ প্রকাশ করেন।
চা শ্রমিক জুড়ী ভ্যালির সভাপতি শ্রীমতি বাউরীসহ শ্রমিক নেত্রী স্বরস্বতী সাওতাল, জানকি গড়াইত, হেমন্তী রবি দাস, স্বরস্বতী কানুসহ অন্যান্য শ্রমিকরা অভিযোগ করে বলেন,
‘আমরা মানবেতর জীবন যাপন করছি। সামনে পৌষ সংক্রান্তি উৎসব, অথচ তিন সপ্তাহ ধরে মজুরি ও এরিয়ার টাকা পাচ্ছি না। আমাদের ঘরবাড়ি জরাজীর্ণ, সংস্কার হচ্ছে না। চা চয়ন বন্ধকালীন গড় মজুরি দেওয়ার নিয়ম থাকলেও এবার তা দেওয়া হয়নি। এর ওপর অডিট টিম নারী শ্রমিকদের সঙ্গে অশোভন আচরণ করেছে। এতে আমরা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠি।’
বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গালিব চৌধুরী বলেন,‘চা বাগান ব্যবস্থাপনা ও শ্রমিকদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব ছিল। আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। শ্রমিকরা লিখিতভাবে তাদের সমস্যাগুলো জানালে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
অডিট টিমের প্রধান ও বাংলাদেশ চা বোর্ডের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘চা শ্রমিকদের ডাটাবেজ তৈরির জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছিল। ভাষাগত ভুল বোঝাবুঝির কারণে বিষয়টি আপত্তিকর হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এজন্য আমরা দুঃখ প্রকাশ করেছি। ইউএনও, থানার ওসি, ইউপি চেয়ারম্যান ও শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টির সমাধান করা হয়েছে।’
জৈন্তা বার্তা/ ওয়াদুদ




