ছবি:সংগৃহীত
লিবিয়া থেকে সাগরপথে ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত রূপ নিয়েছে এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডিতে। ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবি ও খাদ্য-পানির সংকটে অন্তত ২২ অভিবাসনপ্রত্যাশীর মৃত্যু হয়েছে, যাদের মধ্যে ১২ জন সুনামগঞ্জ জেলার বাসিন্দা বলে নিশ্চিত করেছে প্রশাসন। এদের মধ্যে দিরাই উপজেলার ৬ জন, জগন্নাথপুর উপজেলার ৫ জন এবং দোয়ারাবাজার উপজেলার ১ জন যুবক রয়েছেন। তাদের মৃত্যুতে এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া, চলছে স্বজনদের আহাজারি।
ছয় দিন সাগরে ভাসমান মৃত্যুপুরী
সংশ্লিষ্ট সূত্র ও বেঁচে ফেরা ব্যক্তিদের বরাতে জানা গেছে, পূর্ব লিবিয়ার তোবরুক বন্দর থেকে রাবারের একটি ছোট নৌকায় করে তারা গ্রিসের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। কিন্তু প্রতিকূল আবহাওয়া ও দিকভ্রান্তির কারণে নৌকাটি পথ হারিয়ে টানা ছয় দিন সাগরে ভাসতে থাকে।
এই সময় নৌকায় থাকা যাত্রীদের জন্য পর্যাপ্ত খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাব দেখা দেয়। একপর্যায়ে ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও অসুস্থতায় একে একে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন অনেকে। বেঁচে থাকা ব্যক্তিরা জানান, মৃতদের মরদেহ দুই দিন নৌকায় রাখার পর পাচারকারীদের নির্দেশে সাগরে ফেলে দেওয়া হয়-যা এই ঘটনার নির্মমতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
পরবর্তীতে গ্রিক কোস্টগার্ড অভিযান চালিয়ে জীবিতদের উদ্ধার করে। বর্তমানে তাদের গ্রিসের একটি শরণার্থী ক্যাম্পে রাখা হয়েছে। আহতদের মধ্যে দুজনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
সুনামগঞ্জে শোকের মাতম
সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুজন সরকার জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত ১২ জনের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে দিরাই উপজেলার ৬ জন, জগন্নাথপুর উপজেলার ৫ জন এবং দোয়ারাবাজার উপজেলার ১ জন রয়েছেন।
জগন্নাথপুর উপজেলার পাইলগাঁও গ্রামের আমিনুর রহমান, টিয়ারগাঁও গ্রামের শায়ক আহমেদ, ইছগাঁও গ্রামের মোহাম্মদ আলী, বাউরি গ্রামের সুহানুর রহমান এবং কবিরপুর গ্রামের নাঈমসহ কয়েকজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ায় তাদের পরিবারে চলছে শোকের মাতম। অনেক পরিবার তাদের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়েছে।
স্বপ্নভঙ্গের পেছনে দালাল চক্র
স্বজনদের অভিযোগ, জনপ্রতি ১০ থেকে ১২ লাখ টাকার বিনিময়ে একটি সংঘবদ্ধ দালাল চক্র ইউরোপে নেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে এসব যুবকদের নিয়ে যায়। অনেককে লিবিয়ায় মাসের পর মাস আটকে রেখে নির্যাতন ও অমানবিক আচরণের শিকার করা হয়।
স্থানীয়ভাবে দুলাল মিয়া ও তার ভাই বিল্লালের নাম এই মানবপাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে। তারা দেশে-বিদেশে বসে এই নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীদের পরিবার।
আইনি ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক তৎপরতা
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া জানিয়েছেন, এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে গ্রিক কোস্টগার্ড জানিয়েছে, এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে ইতোমধ্যে দুই মানবপাচারকারীকে আটক করা হয়েছে।
দাবি উঠেছে কঠোর পদক্ষেপের
নিহতদের পরিবার ও এলাকাবাসী দালালদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঠেকাতে মানবপাচার চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালানো এবং নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
এই হৃদয়বিদারক ঘটনায় আবারও সামনে এসেছে অবৈধ পথে ইউরোপগামী অভিবাসনের ভয়াবহ ঝুঁকি-যেখানে স্বপ্নের বিনিময়ে দিতে হচ্ছে প্রাণের মাশুল।
জৈন্তা বার্তা/ ওয়াদুদ




