নিজস্ব
শাল্লা উপজেলায় টানা বর্ষণে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে হাওরে ফসলহানিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য সরকারের ঘোষিত মানবিক সহায়তা কর্মসূচির তালিকা প্রণয়নে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। তালিকা যাচাই বাছাইয়ের দায়িত্বে থাকা ইউপি সদস্যরা নিজের পছন্দের ব্যক্তিদেরকে দিয়ে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন বলে অভিযোগ স্থানীয় কৃষকদের। এমনকি কয়েকটি ওয়ার্ডের ইউপি সদস্যরাও তাদের পরিবারের ৭/৮ জন সদস্যদের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্তের প্রমান পাওয়া গেছে। শুধু তাই নয়, মৃত ব্যক্তি ও ঢাকায় গার্মেন্টসে কর্মরত শ্রমিকদের নামও বাদ পড়েনি ক্ষতিগ্রস্তের তালিকা থেকে। এতে ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে কৃষকদের মধ্যে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অভিযোগ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালীদের মাধ্যমে তালিকা প্রস্তুত হওয়ায় প্রকৃত কৃষকদের পরিবর্তে তাদের পছন্দের ব্যক্তি ও স্বজনদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনায়ও প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা বাদ পড়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া কৃষি সহায়তার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য অর্থ নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। শুধু তাই নয়, অভিযোগ রয়েছে টাকার বিনিময়ে গ শ্রেনীর কৃষককে ক শ্রেনীর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আবার ঢাকায় গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে কর্মরত ব্যক্তিরাও ক শ্রেনীর কৃষক তালিকায় রয়েছে।
৩ নং বাহারা ইউনিয়ন পরিষের ২নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য দেবব্রত সরকার(মাতব্বর) এর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। উনার পরিবারের ৭ সদস্যের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে একজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকও রয়েছে। আবার একই গ্রামে গ্রুপিং থাকায় মেম্বার দেবব্রত সরকারের গ্রুপ ব্যতিত অন্য গ্রুপটির কাউকেই ক্ষতিগ্রস্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার পোড়ারপাড় গ্রামের প্রায় ৩০ টি পরিবারের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা এই তালিকার বাহিরে রয়েছে।
এ বিষয়ে ইউপি সদস্য দেবব্রত দাসের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও ফোনটি বন্ধ থাকায় বক্তব্য দেয়া সম্ভব হয়নি।
এদিকে ৫ নং ওয়ার্ডে ক্ষতিগ্রস্তের তালিকায় মৃত ব্যক্তিদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়াও শিক্ষক, এনজিওকর্মী, ঢাকায় কর্মরত গার্মেন্টস শ্রমিক ও ভূমিহীন ব্যক্তিদেরকেও তালিকার ক শ্রেনীতে রাখা হয়েছে৷ তবে হাওরে জমি না করা সত্ত্বেও ইউপি ইউপি সদস্যের আত্মীয় স্বজনরা এই তালিকার প্রথম সাঁরিতে রয়েছে।
তালিকার ৩২৫ নাম্বার ক্রমিকের লোক অখিল চন্দ্র চৌধুরী ইউপি সদস্য মিহির চৌধুরীর আপন কাকা। উনি ঢাকায় থাকেন। হাওরে কোনো জমি করেননি। আবার ১১৬ নং এর জিপেশ সুত্রধরও ঢাকায় রয়েছে। উনিও হাওরে কোনো জমি করেননি। ১০৭ নং তালিকায় আবার জিপেশ সুত্রধরের আপন ভাইও রয়েছে। ২৮৮ নং মনমোহন চৌধুরী নামে এক ব্যক্তির নাম রয়েছে। তিনি ইউপি সদস্যের বাবা। ৫ মাস ধরে মেয়ের বাসা ঢাকায় রয়েছে। তিনিও ক্ষতিগ্রস্তের তালিকায়। আবার ইউপি সদস্য মিহির চৌধুরী হাওরে ৫ কেয়ার জমি করলেও বৃষ্টির আগেই সব ফসল কেটে ফেলেন। উনার ফসলের কোনো ক্ষতি না হলেও ক্ষতিগ্রস্ত তালিকায় ২৮৬ নং ক্রমিকে উনার নাম রয়েছে। গ্রাম্য ভাষায় বলা যায় বাপে পুতে মিলে সবকিছু খাচ্ছে ঘিলে। এই ঘটনায় এলাকায় নানা আলোচনা সমালোচনা তৈরি হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট ইউপি সদস্যের দাবী তালিকা তৈরিতে উনার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক কৃষক জানান, হাওরে ২০ কেয়ার জমি করেছে। এর মধ্যে ৮ কেয়ার জমি কাটা হয়েছে। এত ক্ষতি হওয়ার পরও তিনি ক্ষতিগ্রস্ত তালিকায় পড়েননি। অথচ মেম্বারের বাবা, মেম্বারের নিজের নামসহ আত্মীয় স্বজনে জমি না করেও তালিকার প্রথম স্থানে রয়েছে।
এ বিষয়ে ইউপি সদস্য মিহির চৌধুরী বলেন, আমার তালিকা অন্যরা করেছেন। তালিকায় কিছু মৃত ব্যক্তির নাম আসতে পারে। এগুলো বাদ দেওয়ার বিষয়ে পরিষদে আলোচনা হয়েছে।
শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পিয়াস চন্দ্র দাস বলেন, তালিকায় মৃত ব্যক্তি বা অযোগ্য কারও নাম পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মতিউর রহমান খান বলেন, সুনামগঞ্জে ১ লাখ ২৯ হাজার ৫৫৯ জন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা প্রস্তুত করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। যাচাই-বাছাইয়ে কোনো অকৃষকের নাম পাওয়া গেলে তদন্ত সাপেক্ষে তা বাদ দেওয়া হবে।
জৈন্তাবার্তা/সুলতানা




