অ্যাডভোকেট কামিনী কুমার চন্দ : এক উজ্জ্বল ইতিহাস
শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬, ০২:৫১ AM

হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার ঐতিহাসিক ছাতিয়াইন গ্রামের কৃতী সন্তান

অ্যাডভোকেট কামিনী কুমার চন্দ : এক উজ্জ্বল ইতিহাস

জালাল উদ্দিন লস্কর ,মাধবপুর প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১০/০৭/২০২৬ ০৮:২৪:৩৪ PM

অ্যাডভোকেট কামিনী কুমার চন্দ : এক উজ্জ্বল ইতিহাস

ছবি:সংগৃহীত



হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার ঐতিহাসিক ছাতিয়াইন গ্রামের কৃতী সন্তান অ্যাডভোকেট কামিনী কুমার চন্দ ছিলেন উপমহাদেশের একজন খ্যাতিমান আইনজীবী, রাজনীতিবিদ ও সমাজসংস্কারক। আইন, রাজনীতি, শিক্ষা ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে তাঁর অসামান্য অবদান আজও ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে আছে। ছাতিয়াইন বাজার ও ছাতিয়াইন রেলওয়ে স্টেশন প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকার কথাও স্থানীয় ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়।
১৮৬২ সালের ৪ সেপ্টেম্বর হবিগঞ্জ জেলার (বর্তমান) মাধবপুর উপজেলার ছাতিয়াইন গ্রামে এক কায়স্থ পরিবারে তাঁর জন্ম। ১৮৭৮ সালে শিলচর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় আসাম প্রদেশে তৃতীয় স্থান অধিকার করেন। পরে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ১৮৮০ সালে আইএ, ১৮৮২ সালে বিএ এবং ১৮৮৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ ও আইন ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৮৮৮ সালে তিনি শিলচর বারে আইন পেশায় যোগ দেন। ১৮৯০ সালের আলোচিত বালাধন হত্যা মামলায় সিলেটের চা-বাগানের নিরীহ মণিপুরি যুবকদের পক্ষে আইনজীবী হিসেবে দাঁড়িয়ে ব্যাপক সুনাম অর্জন করেন। এ মামলায় আর্থিক সহায়তা দিয়েছিলেন জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। এর পর থেকেই ঠাকুর পরিবারের সঙ্গে কামিনী কুমার চন্দের পরিবারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
১৮৯৯ সালে সিলেটের ভানুগাছ প্রজা বিদ্রোহ মামলায় আসামি পক্ষের আইনজীবী হিসেবে সফলতা অর্জনের মাধ্যমে তিনি সমগ্র ভারতবর্ষে প্রশংসিত হন। ভারতীয় পূর্ব রেলের আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বিনা ভাড়ায় রেলের সেলুন ক্লাসে ভ্রমণের সুযোগ পেতেন। এ কারণে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্নেহভরে তাঁকে ‘রেলচর’ বলে সম্বোধন করতেন বলে জানা যায়।
ছাত্রজীবন থেকেই তিনি কংগ্রেসের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ও পণ্ডিত মতিলাল নেহরুর নেতৃত্বে গঠিত নিখিল ভারত স্বরাজ্য দলে যোগ দেন। ১৯০৫ সালে কলকাতা হাইকোর্টে আইন পেশায় যোগ দিয়ে জাতীয় আন্দোলনেও সক্রিয় ভূমিকা রাখেন এবং আসামের অন্যতম শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।

১৯০৬ সালের ১১ আগস্ট সিলেটে অনুষ্ঠিত সুরমা উপত্যকা জাতীয় সম্মেলনের সভাপতিত্ব করেন তিনি। ১৯১৩ সালে শিলচর পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯১৬ সালে আসাম লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলির সদস্য এবং ১৯১৯ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক রাষ্ট্রীয় সম্মেলনের সভাপতি নির্বাচিত হন। একই বছর তিনি বেঙ্গল প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। ১৯২৬ সালে তিনি ভারতবর্ষের কেন্দ্রীয় আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন।
পারিবারিক জীবনেও তিনি একটি ঐতিহাসিক সম্পর্কের অংশ ছিলেন। লাখাইয়ের দত্ত বংশের কৃতী সন্তান অ্যাডভোকেট মহেশচন্দ্র দত্তের পরিবারের সঙ্গে পারস্পরিক বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে দুই ঐতিহ্যবাহী পরিবারের আত্মীয়তার বন্ধন আরও দৃঢ় হয়। তাঁর ছেলে ব্যারিস্টার অরুণ কুমার চন্দ বিয়ে করেন মহেশচন্দ্র দত্তের কন্যা জ্যোৎস্না দত্তকে। অন্যদিকে তাঁর কন্যা হীরণ কুমারী চন্দের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন রায়বাহাদুর অ্যাডভোকেট হেমচন্দ্র দত্ত।
মহাত্মা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী আসাম সফরকালে শিলচরের ‘চন্দ ভবন’-এ তাঁর অতিথি ছিলেন। এছাড়া নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুসহ তৎকালীন বহু জাতীয় নেতা ওই ভবনে আতিথ্য গ্রহণ করেন।

১৯১৯ সালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বরাক উপত্যকা সফরকালে শিলচর পৌরসভার চেয়ারম্যান হিসেবে কামিনী কুমার চন্দের বিশেষ উদ্যোগে করিমগঞ্জ রেলস্টেশনে কবিগুরুকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়।
১৯৩৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি শিলচরে অ্যাডভোকেট কামিনী কুমার চন্দ মৃত্যুবরণ করেন। তিনি চার পুত্র ও দুই কন্যার জনক ছিলেন।

তাঁর সন্তানরাও নিজ নিজ ক্ষেত্রে খ্যাতি অর্জন করেন। জ্যেষ্ঠ পুত্র অপূর্ব চন্দের ব্যক্তিত্ব থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসের অমিত চরিত্রটি নির্মাণ করেছিলেন বলে প্রচলিত রয়েছে। দ্বিতীয় পুত্র ব্যারিস্টার অরুণ কুমার চন্দ ছিলেন হবিগঞ্জ মহকুমার দ্বিতীয় ব্যারিস্টার এবং আসাম পার্লামেন্টের বিরোধীদলীয় উপনেতা। তৃতীয় পুত্র অশোক কুমার চন্দ ভারতের প্রথম অডিটর জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কনিষ্ঠ পুত্র অনিল কুমার চন্দ ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একান্ত সচিব। পরে ১৯৫২ সালে তিনি পশ্চিমবঙ্গের বোলপুর আসন থেকে লোকসভা সদস্য নির্বাচিত হন এবং ভারতের কেন্দ্রীয় পররাষ্ট্র উপমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
স্থানীয় ইতিহাসবিদদের মতে, আইন, রাজনীতি, শিক্ষা ও জনসেবায় অ্যাডভোকেট কামিনী কুমার চন্দের অবদান শুধু ছাতিয়াইন বা হবিগঞ্জেই নয়, সমগ্র উপমহাদেশের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তাঁর কর্মময় জীবন ও অবদান নতুন প্রজন্মের কাছে অনুকরণীয় হয়ে থাকবে।



জৈন্তা বার্তা/ ওয়াদুদ



শীর্ষ সংবাদ: