ছবি : সংগৃহীত
১২০ মিনিটের মহাকাব্যিক লড়াই শেষ! রেফারি শেষ বাঁশি বাজাতেই বিশ্বকাপের আকাশে স্পেনের উৎসব শুরু। মাঠ থেকে গ্যালারি—সবখানেই নেমেই এলো লাল উল্লাসের ঢেউ। এই প্রবল আনন্দের ভিড়ে মাঝমাঠে একা আকাশ পানে তাকিয়ে লিওনেল মেসি। এরপর ধীরে ধীরে মাঠের ঘাসে বসে পড়লেন একাই!
মনে হলো, পৃথিবীর সবচেয়ে কোলাহলময় জায়গাটিতেও হঠাৎ তার চারপাশে নেমে এসেছে এক অদৃশ্য নিস্তব্ধতা। একটু দূরে নতুন বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের উৎসব, আর এদিকে ৩৯ বছরের এক ফুটবলারের পাশে এসে বসেছে তার দীর্ঘ পথচলার সমস্ত স্মৃতি—রোজারিওর ছোট্ট উঠান, বার্সেলোনার প্রথম সকাল, আর্জেন্টিনার জার্সিতে অসংখ্য প্রশ্ন, একের পর এক ভাঙা স্বপ্ন, মারাকানার মুক্তি এবং কাতারের সেই সোনালি রাত, কিংবা ২০২৬ বিশ্বকাপের কতশত স্মৃতি!
মেসি মাথা নিচু করে সে সময় বুটের ফিতা খুলছিলেন। যেন খেলা শেষে খুব সাধারণ কোনো কাজ। অথচ তার প্রতিটি ধীর নড়াচড়ার মধ্যে লুকিয়ে ছিল বিদায়ের অসহনীয় ভার। কিছু দুঃখ চোখের জল হয়ে ঝরে পড়ে, আর কিছু দুঃখ মানুষকে শুধু চুপ করিয়ে দেয়। মেসির দুঃখটি ছিল দুয়েরই মিশেল—নিঃশব্দ, স্থির, অথচ সমুদ্রের মতো গভীর।
নিউ জার্সির বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের কাছে আর্জেন্টিনা হেরেছে ১–০ গোলে। নির্ধারিত ৯০ মিনিট গোলশূন্য থাকার পর অতিরিক্ত সময়ের ১০৬ মিনিটে বদলি খেলোয়াড় ফেরান তোরেসের গোল স্পেনকে এনে দেয় দ্বিতীয় বিশ্বকাপ।
গোলটির কিছুক্ষণ আগে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন এনজো ফার্নান্দেজ। দশজনের আর্জেন্টিনার পক্ষে এরপর আর ফিরে আসা সম্ভব হয়নি। ১৬ বছর পর বিশ্বকাপের মুকুট নিজেদের করে নিয়েছে স্প্যানিশরা।
স্পেনের আধিপত্যের সামনে ফাইনালে মেসিকে খুব কমই নিজের মতো দেখা গেছে। মাঝমাঠে বল নিতে নিচে নেমেছেন, প্রতিপক্ষের কয়েকজনকে টেনে জায়গা তৈরি করার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু তার বাঁ পায়ের সামনে খোলা পথ রাখেনি স্পেন। রদ্রি ও স্প্যানিশ রক্ষণ তাকে ঘিরে এমন এক দেয়াল তুলেছিল, যেখানে ব্যক্তিগত জাদুর চেয়ে দলীয় সংগঠন শেষ পর্যন্ত বড় হয়ে ওঠে।
আর্জেন্টিনা নির্ধারিত সময়ে লক্ষ্যে একটি শটও রাখতে পারেনি; মেসি নিজেও পুরো সময়ে স্পেনের ডি বক্সের ভেতরে বলে স্পর্শ করতে পারেননি একবারও। উল্টো স্প্যানিশদের একের পর এক আক্রমণ অসাধারণ সব সেভ দীর্ঘ সময় দলকে ম্যাচে টিকিয়ে রেখেছিলেন এমিলিয়ানো মার্তিনেজ।
কিন্তু একটি রাত দিয়ে মেসির এই বিশ্বকাপকে বিচার করা কি ঠিক হবে? উত্তরটা একদম না। ৩৯ বছর বয়সে আর্জেন্টাইন মহাতারকা এই টুর্নামেন্টে এসেছিলেন সময়ের স্বাভাবিক নিয়মকে অস্বীকার করতে।
কাতারের লুসাইলে ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর তার আর কিছু প্রমাণের প্রয়োজন ছিল না। তবু চার বছর পর তিনি শুধু অংশ নিতে আসেননি; এসেছিলেন আবারও আর্জেন্টিনার আক্রমণের কেন্দ্র হয়ে। ফাইনালের আগে সাত ম্যাচে তার গোল ছিল আটটি, সঙ্গে চারটি অ্যাসিস্ট—এই বয়সে যে পরিসংখ্যান বাস্তবতার চেয়ে রূপকথার কাছাকাছি।
গ্রুপ পর্ব শেষেই ছয় গোল করে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে এগিয়ে ছিলেন মেসিই। নকআউট পর্বে তার ভূমিকা শুধু গোলের সংখ্যায় আটকে থাকেনি। কেপ ভার্দে ও মিসরের বিপক্ষে কঠিন লড়াই পেরিয়ে আর্জেন্টিনা সামনে এগিয়েছে।
কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডকে ৩–১ গোলে হারিয়েছে। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়ার পর আর্জেন্টিনার প্রত্যাবর্তনের সুরটিও বেঁধেছিলেন মেসি—তার তৈরি আক্রমণ থেকে এনজো ফার্নান্দেজ ও লাওতারো মার্তিনেজের গোলে ২–১ ব্যবধানে জয় আসে।
তিনি হয়তো আগের মতো প্রতিটি ম্যাচে পুরো মাঠ দৌড়ে বেড়াননি। তাকে অনেক সময় হাঁটতে দেখা গেছে, অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। কিন্তু সেই অপেক্ষার মধ্যেও ছিল হিসাব। কখন জায়গা তৈরি হবে, কখন একটি পাস প্রতিপক্ষের রক্ষণকে দুই ভাগ করে দেবে, কখন তার এক মুহূর্তের স্পর্শ ম্যাচের গতিপথ বদলে দেবে—মেসি যেন সময়ের সঙ্গে লড়েননি, বরং সময়কে নিজের মতো ব্যবহার করেছেন।
এই বিশ্বকাপ মেসিকে আরেকটি ট্রফি দেয়নি, কিন্তু তার গল্পে নতুন একটি স্তর যোগ করেছে। তিনি তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলা বিরল ফুটবলারদের একজন হয়ে গেলেন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে আর্জেন্টিনার সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে আগেই নিজের নাম উঁচুতে তুলেছেন।
একসময় বলা হতো, দেশের হয়ে মেসি ক্লাবের মেসি নন। বলা হতো, বিশ্বকাপ ছাড়া তার রাজত্ব অসম্পূর্ণ। সেই মানুষটিই আর্জেন্টিনাকে কোপা আমেরিকা জিতিয়েছেন, ২০২২ সালে বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি তুলে ধরেছেন, আবার ৩৯ বছর বয়সে দলকে আরেকটি বিশ্বকাপ ফাইনালে নিয়ে গেছেন। তাই এই হার তার উত্তরাধিকার থেকে কিছু কেড়ে নেয় না। বরং মেসি যে চিরন্তন সেই প্রমাণই রেখে যায়!
মাঠে বসে থাকা মেসির ছবিটি মনে করিয়ে দেয়—কিংবদন্তিরাও মানুষ। তারাও ক্লান্ত হন, হারেন, কাঁদেন। কিন্তু মহত্ত্বের অর্থ সব সময় শেষ ম্যাচটি জেতা নয়। মহত্ত্ব হলো এমন একটি পথ রেখে যাওয়া, যে পথে হাঁটতে গিয়ে পরবর্তী প্রজন্ম বারবার আপনার নাম উচ্চারণ করবে।
স্পেন ট্রফি জিতেছে, প্রাপ্য দল হিসেবেই। কিন্তু শেষ বাঁশির পর কোটি মানুষের চোখ ছিল মাঠের ঘাসে বসে থাকা মানুষটির দিকে। কারণ নিউ জার্সির ফাইনালে শুধু একটি দল হারেনি; ধীরে ধীরে পর্দা নেমেছে ফুটবলের সবচেয়ে সুন্দর যুগগুলোর একটির।
ফিফা বিশ্বকাপ আবার আসবে। নতুন নায়ক আসবে, নতুন রেকর্ড হবে, নতুন কোনো হাতে উঠবে সোনালি ট্রফি। শুধু সেই ছোট্ট মানুষটিকে আর দেখা যাবে না, যিনি বল পায়ে নিলে পৃথিবী কয়েক মুহূর্তের জন্য থেমে যেত। যার বাঁ পায়ের জাদুতে বুঁদ হয়ে থাকতো গোটা পৃথিবীর হাজারও চোখ!
বহু বছর পর যখন কেউ প্রশ্ন করবে, “তুমি কি লিওনেল মেসিকে বিশ্বকাপে খেলতে দেখেছিলে?” উত্তরে তখন কেউ তার গোল সংখ্যা বলবে না। দেবে না ট্রফির হিসাবও। শুধু একটু থেমে বলবে— “হ্যাঁ, আমরা এমন একজনকে দেখেছিলাম, যিনি ফুটবল খেলতেন না; ফুটবলকে মানুষের সুখ, অশ্রু এবং ভালোবাসার ভাষায় অনুবাদ করে দিতেন। তিনিই লিওনেল আন্দ্রেস মেসি!”
জৈন্তাবার্তা/আরআর




