ছবি:সংগৃহীত
মৌলভীবাজারের বড়লেখায় গৃহবধূ মরিয়ম আক্তার মুন্নির মৃত্যু নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা ও আলোচনা তৈরি হয়েছে। মুন্নির পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে নির্যাতনের পর হত্যা করে মরদেহ ঝুলিয়ে রাখার অভিযোগ তোলা হলেও পুলিশের দাবি, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে তার মৃত্যুকে আত্মহত্যাজনিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ অবস্থায় মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন, মামলা গ্রহণ, জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবিতে মানববন্ধন করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) বিকেলে বড়লেখা শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এতে বক্তারা মুন্নির মৃত্যুর ঘটনায় নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানান। একই সঙ্গে পুলিশ প্রশাসনকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আলটিমেটাম দেন তারা। অন্যথায় থানা ঘেরাওয়ের কর্মসূচি দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, মুন্নির মৃত্যুর ঘটনাকে ঘিরে কোনো ধরনের টালবাহানা মেনে নেওয়া হবে না। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে উদ্ঘাটন করতে হবে। ঘটনার সঙ্গে কেউ জড়িত থাকলে তাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
মানববন্ধনে সভাপতিত্ব করেন বড়লেখা হাজীগঞ্জ বাজার বণিক সমিতির আহ্বায়ক ও সমাজসেবক আব্দুল গনি। সমাজসেবক আব্দুল কাদির পলাশ ও সাবেক ছাত্রনেতা মুস্তাফিজুর রহমান রাজন অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন।
এ সময় বক্তব্য দেন প্রবাসী রাজনীতিবিদ ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট আহমদ রিয়াজ, বড়লেখা সদর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ফখরুল ইসলাম, বড়লেখা পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর আব্দুল হাফিজ ললন, সমাজসেবক খালেদ আহমদ, রবিউল ইসলাম সুহেল, শাহিন আহমদ, সুরমান আহমদ, শিপার আহমদ, সাংবাদিক হাসান শামীম, ছাত্রনেতা তানিম আহমদ, আরিফুল ইসলামসহ অনেকে।
মুন্নির পরিবারের পক্ষ থেকে বক্তব্য দেন তার বাবা মকবুল আলী, মা রেনু বেগম ও ভাই মাছুম আহমদ।
পরিবারের সদস্যদের দাবি, গত ২১ আগস্ট শ্বশুরবাড়ির লোকজনের সঙ্গে মুন্নির বিরোধ হয়। একপর্যায়ে তাকে নির্যাতন করা হয়। ওই সময় মুন্নি ভিডিও ও খুদে বার্তার মাধ্যমে তার বাবা-মাকে বিষয়টি জানান।
মেয়ের কাছ থেকে এমন খবর পেয়ে তার বাবা স্থানীয় কয়েকজন মুরব্বির সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টি সমাধানের অনুরোধ করেন। পরে একজন মুরব্বি তাকে ফোন করে জানান, বিষয়টি মীমাংসা হয়ে গেছে।
পরিবারের দাবি, এর কিছুক্ষণ পর স্থানীয় জনপ্রতিনিধির পরিচয় দিয়ে এক ব্যক্তি মুন্নির বাবাকে শ্বশুরবাড়িতে যেতে বলেন। সেখানে গিয়ে তিনি বাথরুমের কাঠের বিমের সঙ্গে মেয়ের ঝুলন্ত মরদেহ দেখতে পান।
মুন্নির পরিবারের অভিযোগ, তাকে নির্যাতনের পর হত্যা করে মরদেহ ঝুলিয়ে রাখা হয়ে থাকতে পারে। এ ঘটনায় তারা সুষ্ঠু তদন্ত, মামলা গ্রহণ, জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবি জানিয়ে আসছেন।
পুলিশের বক্তব্য ও ময়নাতদন্তের তথ্য
এর আগে শুক্রবার সকালে বড়লেখা থানায় সংবাদ সম্মেলনে ওসি মনিরুজ্জামান মুন্নির মৃত্যুর বিষয়ে পুলিশের তদন্ত ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরেন।
পুলিশ জানায়, গত ২১ আগস্ট বিকেল ৫টার দিকে মুরিরগুল গ্রামে মুন্নির আত্মহত্যার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে তার বসতবাড়ির টয়লেটের টিনের চালার কাঠের তীরের সঙ্গে ওড়না দিয়ে ঝুলন্ত অবস্থায় মরদেহ দেখতে পায় পুলিশ।
মুন্নির বাবা হাজী মকবুল আলী মেয়ের মানসিক চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজপত্র দেখিয়ে ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ দাফনের অনুরোধ করেছিলেন বলে জানায় পুলিশ। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে ময়নাতদন্ত প্রয়োজন মনে করে পুলিশ। পরে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৪ ধারায় বড়লেখা থানায় অপমৃত্যু মামলা (ইউডি) নম্বর ৩১ করা হয় এবং মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট সদর হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগে পাঠানো হয়।
ওসি মনিরুজ্জামান জানান, গত ৩ সেপ্টেম্বর পাওয়া ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে চিকিৎসক মতামত দিয়েছেন-ঝুলে থাকার কারণে শ্বাসরোধে মুন্নির মৃত্যু হয়েছে এবং ঘটনাটি আত্মহত্যাজনিত।
তবে মুন্নির পরিবারের পক্ষ থেকে পরবর্তীতে শ্বশুরবাড়ির কয়েকজনের বিরুদ্ধে নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগ তোলা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, পরিবারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ দেওয়া হলে তা গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুন্নির মৃত্যুকে ‘হত্যাকাণ্ড’ উল্লেখ করে বিভিন্ন বক্তব্য ও প্রচারণা চালানো হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি না করতে প্রকৃত তথ্য ও আইনগত অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর বা উসকানিমূলক তথ্য প্রচার না করার আহ্বান জানিয়েছে পুলিশ।
অন্যদিকে মানববন্ধনে অংশ নেওয়া স্থানীয় বাসিন্দা ও মুন্নির স্বজনদের দাবি, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনসহ সব তথ্য সামনে রেখে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ আরও গভীরভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
বক্তারা বলেন, ‘মুন্নির মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন করতে হবে। কোনো পক্ষের প্রভাব বা চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে আইন অনুযায়ী নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে।’
তাদের দেওয়া ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটামকে কেন্দ্র করে এখন পুলিশের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন মুন্নির পরিবার ও স্থানীয়রা।
জৈন্তা বার্তা/ ওয়াদুদ




