শেখ হাসিনার যেসব সম্পদ বা/জেয়াপ্ত হতে পারে
সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:২২ PM

শেখ হাসিনার যেসব সম্পদ বা/জেয়াপ্ত হতে পারে

জৈন্তা বার্তা ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৭/০৯/২০২৬ ০৩:৩৫:৪৯ PM

শেখ হাসিনার যেসব সম্পদ বা/জেয়াপ্ত হতে পারে

সংগৃহিত


জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ কয়েকজনের মৃত্যুদণ্ড ও সম্পদ বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। তবে আদালতের এ আদেশ কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, কোন সংস্থা সম্পদ বাজেয়াপ্ত করবে এবং পরে তা কীভাবে জুলাই শহীদদের পরিবারের মধ্যে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়া হবে—এসব বিষয়ে আইনি প্রক্রিয়া নির্ধারণের কাজ চলছে।

সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, আইন বা বিধিতে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত এবং ভুক্তভোগী পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধান রয়েছে। তবে কোন প্রক্রিয়ায় এসব কার্যকর হবে, তা সাধারণ আইনে নির্ধারিত। বিষয়টি স্পষ্ট করতে তিনি ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের সামনে প্রয়োজনীয় নির্দেশনার কথাও তুলে ধরেছেন।

চিফ প্রসিকিউটর জানান, প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হলে এর ‘রেট্রোস্পেকটিভ ইফেক্ট’ থাকবে। অর্থাৎ আগে দেওয়া রায়ের ভিত্তিতেও সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা সম্ভব হবে। তাঁর মতে, এতে আইনগত কোনো জটিলতা থাকবে না।

এখন প্রশ্ন উঠেছে—শেখ হাসিনার নামে কী কী সম্পদ রয়েছে, যেগুলো আদালতের আদেশ অনুযায়ী বাজেয়াপ্ত হতে পারে?

হলফনামায় ঘোষিত সম্পদ

২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গোপালগঞ্জ-৩ আসনের প্রার্থী হিসেবে জমা দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী, শেখ হাসিনা নিজের নামে মোট প্রায় ৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের তথ্য দিয়েছিলেন।

হলফনামায় তাঁর হাতে নগদ অর্থ ছিল প্রায় ২৮ হাজার ৫০০ টাকা। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা ছিল প্রায় ২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। এছাড়া ২৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র এবং ৫৫ লাখ টাকার স্থায়ী আমানত (এফডিআর) দেখানো হয়।

শেখ হাসিনা তিনটি মোটরগাড়ির তথ্যও হলফনামায় উল্লেখ করেন। এর মধ্যে একটি উপহার হিসেবে পাওয়া, যার মূল্য উল্লেখ করা হয়নি। অন্য দুটি গাড়ির মূল্য দেখানো হয় প্রায় ৪৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

এ ছাড়া তাঁর নামে প্রায় ১৩ লাখ ২৫ হাজার টাকার সোনা ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতু এবং ৭ লাখ ৪০ হাজার টাকার আসবাবপত্রের তথ্য দেওয়া হয়।

কৃষিজমি ও বাগানবাড়ি

হলফনামায় শেখ হাসিনা নিজের নামে প্রায় ১৫ দশমিক ৩ বিঘা কৃষিজমির তথ্য দেন। এসব জমির ক্রয়মূল্য দেখানো হয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৭৮ হাজার টাকা। জমিগুলো টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ সদর, গাজীপুর ও রংপুরে রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।

গাজীপুর শহর থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার দূরে মৌচাকের তেলিরচালা এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের পাশে শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের একটি বাগানবাড়ি রয়েছে। স্থানীয় ভূমি কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭০ সালের দিকে স্থানীয় এক ব্যক্তি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে ওই জমি লিখে দেন।

পরবর্তী সময়ে উত্তরাধিকারসূত্রে ওই জমির মালিক হন শেখ হাসিনা ও তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানা। পরে তাঁরা জমির কিছু অংশ তাঁদের সন্তানদের নামে লিখে দেন। নথিপত্র অনুযায়ী, ওই জমির পরিমাণ প্রায় ২৯৭ শতক বা ৯ বিঘা।

পূর্বাচলের প্লট

ঢাকার পূর্বাচলে শেখ হাসিনার নামে একটি প্লট রয়েছে। হলফনামায় এর মূল্য দেখানো হয়েছে প্রায় ৩৪ লাখ ৭৬ হাজার টাকা।

এ ছাড়া শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে তাঁর নামে, তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ, ছোট বোন শেখ রেহানা এবং রেহানার সন্তান রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ও আজমিনা সিদ্দিকের নামে পূর্বাচলে ১০ কাঠা করে প্লট বরাদ্দ দেওয়ার তথ্য রয়েছে।

সব মিলিয়ে পরিবারের ছয় সদস্যের নামে ৬০ কাঠা জমি বরাদ্দের অভিযোগ রয়েছে। ক্ষমতার অপব্যবহার ও বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে এসব প্লট বরাদ্দের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা চলমান রয়েছে।

টুঙ্গিপাড়ায় বাড়ি ও জমি

হলফনামায় শেখ হাসিনা গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় তিনতলা ভবনসহ ৬ দশমিক ১০ শতক জমি নিজের নামে দেখিয়েছেন। ওই সম্পত্তির অর্জনকালীন মূল্য দেখানো হয়েছে ৫ লাখ টাকা।

তবে এ সম্পদ নিয়ে পরবর্তী সময়ে প্রশ্নও উঠেছে। দুদকের এক ব্রিফিংয়ে জানানো হয়েছিল, ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হলফনামায় শেখ হাসিনা নিজের নামে থাকা জমির পরিমাণ ৬ দশমিক ৫০ একর উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু যাচাইয়ে তাঁর নামে ২৮ একর ৪১ শতকের বেশি স্থাবর সম্পদ থাকার তথ্য পাওয়া যায় বলে দুদক দাবি করে।

ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ি কার?

শেখ হাসিনার সম্পদ বাজেয়াপ্তের প্রসঙ্গে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িটির মালিকানা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

ভূমি কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িটির মালিকানা শেখ হাসিনার নামে নয়। বাড়িটির মালিক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট।

অন্যদিকে, শেখ হাসিনার দীর্ঘদিনের বাসভবন ধানমন্ডির সুধা সদনের মালিকানা তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ ও মেয়ে সায়মা ওয়াজেদের নামে রয়েছে বলে ভূমি কার্যালয়ের তথ্য থেকে জানা যায়।

ট্রাইব্যুনালের রায়

মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একই রায়ে তাঁদের সম্পদ বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দেওয়া হয়।

রায়ে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদার উল্লেখ করেন, শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হলো। পাশাপাশি জুলাই আন্দোলনে নিহতদের পরিবারকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়।

এর আগে ও পরে ট্রাইব্যুনালের আরও কয়েকটি মামলার রায়েও অভিযুক্তদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আদেশ দেওয়া হয়েছে। আশুলিয়ায় হত্যা ও ছয়জনের মরদেহ পোড়ানোর মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলামের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আদেশও রয়েছে।

এখন মূল বিষয় হলো—ট্রাইব্যুনালের দেওয়া সম্পদ বাজেয়াপ্তের আদেশ কীভাবে কার্যকর করা হবে এবং বাজেয়াপ্ত সম্পদ থেকে জুলাই হত্যাকাণ্ডে নিহতদের পরিবার কীভাবে ক্ষতিপূরণ পাবেন। এ বিষয়ে আইনি প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হওয়ার পর বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।

জৈন্তা বর্তা / ওয়াদুদ