১৬ ডিসেম্বর চালুর লক্ষ্য, জাপানি কনসোর্টিয়ামের কঠিন শর্তে থার্ড টার্মিনাল অনিশ্চিত
মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৩৫ AM

১৬ ডিসেম্বর চালুর লক্ষ্য, জাপানি কনসোর্টিয়ামের কঠিন শর্তে থার্ড টার্মিনাল অনিশ্চিত

জৈন্তা বার্তা ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৮/০৯/২০২৬ ১০:২৩:২৭ AM

১৬ ডিসেম্বর চালুর লক্ষ্য, জাপানি কনসোর্টিয়ামের কঠিন শর্তে থার্ড টার্মিনাল অনিশ্চিত

সংগৃহীত


নির্মাণকাজ প্রায় শেষ, ঋণের কিস্তিও শুরু হয়ে গেছে। অথচ বিপুল ব্যয়ে নির্মিত হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল এখনও চালু হয়নি। আগামী ১৬ ডিসেম্বর টার্মিনালটি চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। কিন্তু সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে চুক্তির আর্থিক ও পরিচালনাগত শর্ত। দীর্ঘ দুই বছরে অন্তত ২৫ দফা বৈঠক করেও সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। মন্ত্রী পর্যায়েও হয়েছে একাধিক বৈঠক। শেষ পর্যন্ত গত ২৫ আগস্ট জাপানি কনসোর্টিয়ামের সাব-ওয়ার্কিং গ্রুপ তাদের কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাব জমা দিয়েছে। সেই প্রস্তাবের ভিত্তিতেই আজ মঙ্গলবার শুরু হচ্ছে চূড়ান্ত আর্থিক নেগোসিয়েশন।সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাপানি কনসোর্টিয়াম টার্মিনাল পরিচালনার ক্ষেত্রে বেশ কিছু কঠিন শর্ত দিয়েছে। বিশেষ করে রাজস্ব ভাগাভাগি ও পরিচালন কাঠামো নিয়ে তাদের প্রস্তাব সরকারের জন্য বড় ধরনের আর্থিক প্রশ্ন তৈরি করেছে। এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের মতে, থার্ড টার্মিনাল দ্রুত চালু করা জরুরি হলেও তাড়াহুড়ো করে দীর্ঘমেয়াদি কোনো চুক্তিতে যাওয়া ঠিক হবে না। অপারেটরকে দেওয়ার প্রস্তাবটি অর্থনৈতিকভাবে কতটা যৌক্তিক, তা বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা প্রয়োজন। এভিয়েশন বিশেষজ্ঞকাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, টার্মিনাল দ্রুত চালু করা জরুরি, এটি নির্মাণে বিপুল রাষ্ট্রীয় অর্থ ও ঋণ ব্যবহৃত হয়েছে এবং সেই ঋণের কিস্তিও শুরু হয়েছে। নেগোসিয়েশনে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। বেবিচকের সদস্য (প্রশাসন) এসএম লাভলুর রহমান বলেন, জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে নেগোসিয়েশন বৈঠক আজ মঙ্গলবার থেকে শুরু হবে। টানা কয়েকটি বৈঠক হবে। আগামী ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে টার্মিনালটি চালুর লক্ষ্যে আমরা যত দ্রুত সম্ভব একটি যৌক্তিক সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছি।প্রাপ্ত তথ্যমতে, পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ, রাজস্ব বণ্টন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিয়ে জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে দীর্ঘ টানাপড়েনের পর গত ২৫ আগস্ট কনসোর্টিয়ামের সাব-ওয়ার্কিং গ্রুপ (এসডব্লিউজি) তাদের আনুষ্ঠানিক কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাব বেবিচকের কাছে জমা দেয়। কনসোর্টিয়ামের পক্ষে প্রস্তাবটি জমা দেন মাসাহিরু হিরাই। প্রস্তাবটি মূল্যায়নের পর আজ জাপানি পক্ষের সঙ্গে চূড়ান্ত আর্থিক দরকষাকষিতে বসছে বেবিচক। এ বৈঠক থেকেই চুক্তির দিনক্ষণ নির্ধারণ হবে। নেগোসিয়েশনের ফলের ওপরই নির্ভর করছে চুক্তি স্বাক্ষরের পরবর্তী ধাপ। তবে নেগোসিয়েশন শুরু হলেও সরকারের ঘোষিত আগামী ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে টার্মিনাল পুরোপুরি চালুর লক্ষ্য নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন অনিশ্চয়তা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, জাপানি কনসোর্টিয়াম টার্মিনাল পরিচালনার ক্ষেত্রে বেশ কিছু কঠিন শর্ত দিয়েছে। বিশেষ করে রাজস্ব ভাগাভাগি ও পরিচালন কাঠামো নিয়ে তাদের প্রস্তাব সরকারের জন্য বড় ধরনের আর্থিক প্রশ্ন তৈরি করেছে। প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, এমবারকেশন ফি, দোকান ও লাউঞ্জ ভাড়া, কার্গো হ্যান্ডলিং চার্জ এবং কার পার্কিং ভাড়া থেকে আদায় করা রাজস্বের ৭৩ শতাংশ পাবে জাপানি কনসোর্টিয়াম, বাংলাদেশ পাবে মাত্র ২৭ শতাংশ।অন্যদিকে, টার্মিনাল চালু না হলেও এর অর্থায়নে নেওয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হয়ে গেছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন থেকেই ঋণের কিস্তি দেওয়া শুরু হয়েছে, যা চলবে ২০৫৬ সাল পর্যন্ত। ফলে একদিকে টার্মিনাল থেকে আয় হচ্ছে না, অন্যদিকে ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ছে। এই অবস্থায় দ্রুত টার্মিনাল চালু করতে মরিয়া সরকার।টার্মিনাল পরিচালনার জন্য জাপানি চার প্রতিষ্ঠানের কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে গত দুই বছরে অন্তত ২০ দফা বৈঠক করেছে বেবিচক। সরকারের মন্ত্রী পর্যায়েও হয়েছে একাধিক বৈঠক। কিন্তু পরিচালনা ও আর্থিক কাঠামোর বিভিন্ন শর্তে মতপার্থক্যের কারণে এতদিনেও চুক্তি চূড়ান্ত হয়নি।

সরকারের লক্ষ্য আগামী ১৬ ডিসেম্বর থার্ড টার্মিনাল উদ্বোধন ও চালু করা। কিন্তু চুক্তি সই হলেই যে টার্মিনাল বাণিজ্যিকভাবে চালুর উপযোগী হয়ে যাবে, বাস্তবতা তেমন নয়। চুক্তির পর টার্মিনালে স্থাপিত বিভিন্ন যন্ত্রপাতির দায়িত্ব নেবে জাপানি কনসোর্টিয়াম। এরপর শুরু হবে যন্ত্রপাতি পরিচালনা, পরীক্ষা ও ক্যালিব্রেশন। একই সঙ্গে তাদের প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ করতে হবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এত বড় একটি আন্তর্জাতিক টার্মিনালের যন্ত্রপাতি ক্যালিব্রেশন ও পরীক্ষামূলক পরিচালনাতেই কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। ফলে আজ নেগোসিয়েশন শুরু হলেও চুক্তি, দায়িত্ব হস্তান্তর, জনবল নিয়োগ, ক্যালিব্রেশন, পরীক্ষামূলক পরিচালনা— সব মিলিয়ে মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ অপারেশন শুরু করা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।জাপানি কনসোর্টিয়াম সূত্রে জানা গেছে, চুক্তিগত বিষয়ে বাংলাদেশ চাপ দিলেও কনসোর্টিয়ামের অবস্থানে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম। চুক্তি সম্পন্ন হলেও প্রকল্পের বাস্তব অপারেশন শুরু করতে তাদের আরও চার-পাঁচ মাস সময় প্রয়োজন হতে পারে। চুক্তির পর যন্ত্রপাতির ক্যালিব্রেশন, পরীক্ষামূলক পরিচালনা, জনবল নিয়োগ ও প্রশিক্ষণসহ বেশ কিছু প্রস্তুতিমূলক কাজ করতে হবে। এদিকে বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) ট্রানজেকশন অ্যাডভাইজার হিসেবে কাজ করছে এবং তাদের মাধ্যমেই জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে মূল আলোচনা এগোচ্ছে।জাপানি কনসোর্টিয়ামের প্রস্তাবে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় রাজস্ব বণ্টন হলেও বিমানবন্দরের সব আয় এ কাঠামোর আওতায় থাকছে না। ওভারফ্লাইং চার্জ ও বিমান অবতরণ ফি বেবিচকের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে। একইভাবে কাস্টমস, নিরাপত্তা ও ইমিগ্রেশন কার্যক্রম বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। তবে মূল প্রশ্ন উঠেছে, বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত টার্মিনালের বাণিজ্যিক আয়ের বড় অংশ বিদেশি অপারেটরের হাতে গেলে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের প্রকৃত আর্থিক লাভ কতটা হবে। যদিও জাইকার অর্থায়নে নির্মিত এই বিশাল অবকাঠামোর পরিচালনার দায়িত্ব জাপানি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার বিষয়টি শুরু থেকেই আলোচনায় ছিল। থার্ড টার্মিনাল পরিচালনার জন্য প্রস্তাব দেওয়া জাপানি কনসোর্টিয়ামে রয়েছে জাপান এয়ারপোর্ট টার্মিনাল কোম্পানি, সুমিতোমো করপোরেশন, সোজিৎজ করপোরেশন এবং নারিতা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট করপোরেশন। এখন মূল প্রশ্ন— কোন শর্তে সেই দায়িত্ব দেওয়া হবে এবং বাংলাদেশের আর্থিক স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত থাকবে।

জৈন্তাবার্তা/সুলতানা



শীর্ষ সংবাদ: