সুরের ভেলায় দর্শকের হৃদয় ছুঁতে চান বিথী
বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৪১ PM

সুরের ভেলায় দর্শকের হৃদয় ছুঁতে চান বিথী

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৯/০৯/২০২৬ ০৬:৫৮:৪৩ PM

সুরের ভেলায় দর্শকের হৃদয় ছুঁতে চান বিথী

ছবি:সংগৃহীত


গান তাঁর কাছে শুধু বিনোদন নয়, বেঁচে থাকার শক্তি। সুরের ভেলায় চড়ে তিনি খুঁজে ফেরেন জীবনের আনন্দ, ভুলে থাকার চেষ্টা করেন কষ্ট। কণ্ঠে গান তুলে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়াই তাঁর স্বপ্ন। তিনি সিলেটের পরিচিত সংগীতশিল্পী বিথী রাণী নাথ।

১৯৯৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর সুনামগঞ্জে জন্ম বিথীর। বাবা দীপেন্দ্র দেবনাথ ও মা দ্রৌপদী দেবনাথের তিন সন্তানের মধ্যে তিনি সবার ছোট। বিএসএস পরীক্ষাও সম্পন্ন করেছেন তিনি। তবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি সংগীতই হয়ে উঠেছে তাঁর জীবনের প্রধান সাধনা।

২০০৫ সালে বাবার কাছে সংগীতে হাতেখড়ি বিথীর। ‘সা, রে, গা, মা, পা, ধা, নি, সা’ দিয়ে শুরু হয়েছিল তাঁর সংগীতযাত্রা। পরে জগন্নাথপুরের শিবু চক্রবর্তী, সুনামগঞ্জের প্রীতিভূষণ চক্রবর্তীর কাছে তালিম নেন তিনি। সিলেটের নজরুলসংগীতশিল্পী ও শিক্ষক হিমাংশু বিশ্বাস, সংগীতজ্ঞ নকুল কুমার বিশ্বাস, অর্জুন বিশ্বাস, আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল ও বারী সিদ্দিকীর কাছ থেকেও দীর্ঘদিন সংগীতের তালিম নিয়েছেন বিথী। এখনো তাঁর শেখার আগ্রহ থামেনি।

২০০৯ সালে শেখ রাসেল জাতীয় পুরস্কার পাওয়ার পর বিভিন্ন সংগীতবিষয়ক রিয়েলিটি শোতে অংশ নেওয়া শুরু করেন তিনি। ২০১২ সালে ‘পাওয়ার ভয়েস’ এবং ২০১৪ সালে চ্যানেল আই সেরাকণ্ঠ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে দর্শক-শ্রোতার নজর কাড়েন।

বিথীর কণ্ঠে প্রকাশিত হয়েছে বেশ কিছু গান। এর মধ্যে ‘কন্যা বিদায়’, ‘কিবা জাদু জানে রে বন্ধু’, ‘বারাকুটি’, ‘তালইয়ের ঘরের ভাই’, ‘চাঁদবদনী কন্যা’ ও ‘রূপের বিয়াই’ উল্লেখযোগ্য। ইউটিউবেও তাঁর একাধিক গান প্রকাশিত হয়েছে। লোকগীতি ও সিলেটের আঞ্চলিক ভাষার গানে তাঁর সাবলীল পরিবেশনা শ্রোতাদের কাছে আলাদা আবেদন তৈরি করেছে।

তবে বিথীর সংগীতজীবনের গল্প কেবল সাফল্যের নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কঠিন সংগ্রামের কথাও।

মাত্র দুই বছর বয়সে টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে বাম পায়ের স্বাভাবিক চলাচলের সক্ষমতা হারান তিনি। ছোটবেলা থেকেই স্ক্র্যাচ ব্যবহার করে চলাফেরা করতে হয় তাঁকে। শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে নানা সময় মানুষের অবহেলা ও কটূক্তির শিকারও হয়েছেন।

কিন্তু এসব তাঁকে থামাতে পারেনি। বরং মায়ের দেওয়া সাহস তাঁকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি দিয়েছে।

বিথী বলেন, ছোটবেলায় তাঁর মা হাতে হারমোনিয়াম তুলে দিয়ে বলেছিলেন, গানই একদিন তাঁর দুঃখ-কষ্ট ভুলিয়ে দেবে। মানুষের মন জয় করার পাশাপাশি গান তাঁকে সংগ্রাম করার সাহস দেবে।

মায়ের সেই কথাই যেন জীবনের মন্ত্র করে নিয়েছেন বিথী।

২০০৫ সালে নিজের এলাকায় প্রথম মঞ্চে গান করেন তিনি। সেই প্রথম মঞ্চে তাঁর কোমল কণ্ঠের গান মুগ্ধ করেছিল উপস্থিত দর্শক-শ্রোতাদের। সেই দিনের স্মৃতি এখনো তাঁর মনে উজ্জ্বল।

সংগীতের পাশাপাশি গান শেখাতেও যুক্ত হয়েছেন বিথী। সিলেটে প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘বিথী মিউজিক স্কুল’। সেখানে ভালোবাসা ও যত্ন নিয়ে শিক্ষার্থীদের সংগীতের তালিম দেন তিনি।

বিথীর ভাষায়, ‘সঙ্গীত হলো গুরুমুখী বিদ্যা। সঙ্গীত শিখতে হলে সঠিক গুরুর কাছে তালিম নিতে হয়। এর জন্য একাগ্রতা প্রয়োজন। হৃদয় দিয়ে সঙ্গীতকে অনুধাবন করতে পারলেই সঙ্গীত তার নিজস্ব সৌন্দর্যে প্রকাশ পায়।’

হাছন রাজা উৎসব ও সিলেটি উৎসবসহ বিভিন্ন আয়োজনে সম্মাননাও পেয়েছেন বিথী। তাঁর স্বপ্ন সিলেটের আঞ্চলিক ভাষার গান, মৌলিক লোকগীতি ও গীতকে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বদরবারে তুলে ধরা।

বিথী বলেন, ‘আমি গান গেয়ে মানুষের মন জয় করতে চাই। সিলেটের আঞ্চলিক গান ও মৌলিক লোকগীতিকে বিশ্বসমাজে নান্দনিকভাবে তুলে ধরার ইচ্ছা আমার দীর্ঘদিনের।’

সংগীতশিল্পী হওয়ার পাশাপাশি অন্য একটি স্বপ্নও ছিল তাঁর। বিথী জানান, সংগীতশিল্পী না হলে তিনি ব্যারিস্টার হওয়ার চেষ্টা করতেন।

জীবনের এই দীর্ঘ পথচলায় বিথীর সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা তাঁর মা। মায়ের হাতের যেকোনো খাবারই তাঁর প্রিয়। প্রিয় গান ‘কন্যা বিদায়’। বসন্ত তাঁর প্রিয় ঋতু। প্রিয় শিল্পীদের তালিকায় আছেন রুনা লায়লা ও শ্রেয়া ঘোষাল। ‘হাজার বছর ধরে’ চলচ্চিত্রটিও তাঁর পছন্দের।

শারীরিক সীমাবদ্ধতা ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও বিথী এখনো স্বপ্ন দেখেন আরও বড় পরিসরে গান করার। তাঁর প্রত্যাশা, সংগীতজীবন এগিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাবেন।

বিথী বলেন, ‘আমার সংগীতজীবনের পথচলা এবং পারিবারিক জীবনের অগ্রযাত্রাকে এগিয়ে নিতে আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন। মানবিক দিক বিবেচনা করে সরকারের সহযোগিতা প্রত্যাশা করছি।’

কষ্ট, প্রতিবন্ধকতা আর মানুষের কটূক্তিকে পেছনে ফেলে বিথী এগিয়ে চলেছেন সুরের পথ ধরে। তাঁর কাছে গান যেন একসঙ্গে আশ্রয়, ভালোবাসা ও স্বপ্নের নাম। সেই স্বপ্ন-নিজের কণ্ঠের সুরে আরও বেশি মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া।

জৈন্তা বার্তা/ ওয়াদুদ