প্রতি বছর ৩ মিটার করে নামছে ঢাকার পানির স্তর
রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:০৬ AM

প্রতি বছর ৩ মিটার করে নামছে ঢাকার পানির স্তর

জৈন্তা বার্তা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০/০৯/২০২৬ ০৯:৫৫:৫৯ AM

প্রতি বছর ৩ মিটার করে নামছে ঢাকার পানির স্তর

সংগৃহীত


ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের চাপ, বৃষ্টির পানি মাটিতে ঢোকার সুযোগ কমে যাওয়া এবং দ্রুত কংক্রিটে ঢেকে যাওয়ায় ক্রমেই গভীরে নেমে যাচ্ছে ঢাকার পানির স্তর। গত কয়েক দশকে এ পতন উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ১৯৯৬ সালে যেখানে ঢাকার পানির স্তর ছিল ভূ-পৃষ্ঠের প্রায় ২৫ মিটার নিচে, ২০০৫ সালে তা নেমে যায় ৪৫ মিটারে, ২০১০ সালে ৬০ মিটার, ২০২৩ সালে ৭৫ মিটার এবং ২০২৪ সালে ৮৯ দশমিক ৮৮ মিটারে। চলতি বছরের শেষে কোনো কোনো এলাকায় এ গভীরতা ৯০ থেকে ৯২ মিটারে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। এর মধ্যে মিরপুর, পল্লবী, কাফরুল, তুরাগ ও ক্যান্টনমেন্টের কিছু এলাকায় পানির স্তর ইতোমধ্যে প্রায় ৯২ মিটার নিচে নেমেছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে ঢাকার পানির স্তর ১২০ মিটার পর্যন্ত নেমে যেতে পারে। এতে ভবিষ্যতে নিরাপদ পানি সরবরাহ যেমন কঠিন হবে, তেমনি পানি উত্তোলনের ব্যয়ও বহুগুণ বাড়বে।ঢাকাবাসীর দৈনন্দিন পানির চাহিদা মেটাতে ঢাকা ওয়াসা প্রতিদিন প্রায় ২৮০ থেকে ২৯০ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করে। এর ৬৮ থেকে ৭০ শতাংশই আসে ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে। বাকি ৩০ থেকে ৩২ শতাংশ পানি সরবরাহ করা হয় ভূ-উপরিস্থ উৎস থেকে। অর্থাৎ রাজধানীর পানি সরবরাহ ব্যবস্থা এখনও ব্যাপকভাবে ভূগর্ভস্থ পানিনির্ভর। অথচ প্রায় দুই দশক আগে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা ৭০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল ঢাকা ওয়াসা। নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি সংস্থাটি। বরং নগরীর ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে প্রতিবছর নতুন করে গভীর নলকূপ স্থাপন করতে হচ্ছে।

ওয়াসার নীতিমালায় ছিল পাম্পের ১ হাজার মিটারের মধ্যে গভীর নলকূপের অনুমতি দেওয়া যাবে না। কিন্তু অধিক ঘনবসতিপূর্ণ ঢাকার পানির চাহিদা মেটাতে না পারায় মৌলিক চাহিদার দোহাই দিয়ে সেই নীতিমালা সংশোধন করে ৫০০ মিটার এলাকা নামিয়ে আনা হয়। এখন তাতেও কাজ হচ্ছে না। তাই বাধ্য হয়ে ওয়াসা নিজেই একটা জোনের ভেতর একাধিক ডিপ টিউবওয়েল বা গভীর নলকূপ স্থাপনে বাধ্য হচ্ছে। বর্তমানে ঢাকা ওয়াসার আওতাধীন এলাকায় ১২০০-১৩০০ গভীর নলকূপ রয়েছে। বিশেষ করে নতুন করে গড়ে ওঠা আবাসিক এলাকাগুলোয় এখনও ওয়াসার সরবরাহ লাইন স্থাপন হয়নি। কিন্তু মানুষ তাদের চাহিদা মেটাতে বাধ্য হয়ে গভীর নলকূপের মাধ্যমে পানি উত্তোলন করছে। নগরবিদদের মতে বিশে^র অনেক দেশ কংক্রিট তুলে দিয়ে গ্রিন স্পেসের দিকে যাচ্ছে। আমাদের এখন সেই দিকে যাওয়ার বিকল্প নেই।একদিকে মাত্রা অতিরিক্ত ভূর্গভস্থ পানি উত্তোলন অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণে ঢাকা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে সবুজ চত্বর। পুরো ঢাকা একটা কংক্রিটের জঞ্জালে পরিণত হচ্ছে। ফলে বৃষ্টি হলেও সেই পানি মাটিতে পুনচক্রায়ন হতে না হতেই শুকিয়ে যাচ্ছে। ফলে একদিকে শহরের তাপ বাড়ছে, অন্যদিকে পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৩ মিটার নেমে যাচ্ছে পানির গভীরতা। গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে পানির স্তর নেমে যেতে পারে ১২০ মিটার পর্যন্ত। এতে শুধু পানির সংকটই তৈরি হবে না, উত্তোলন ব্যয়ও বহুগুণ বাড়বে, বাড়বে ভূমিকম্পে ঝুঁকিও। ইতোমধ্যেই মিরপুর, ক্যান্টনমেন্ট ও আশপাশের এলাকায় পানির স্তর ৯২ মিটার নিচে নেমে গেছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে রাজধানীবাসীর জন্য নিরাপদ পানি সরবরাহ করা ঢাকা ওয়াসার জন্য দুষ্কর হয়ে যাবে- জানিয়েছে সংস্থাটি।

ঢাকা মহানগরীর কম-বেশি ২ কোটি ৩২ লাখ মানুষের জন্য প্রতিদিন ২৮০ থেকে ২৯০ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করে ঢাকা ওয়াসা (ঢাকা পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ)। চাহিদার ৬৮ ভাগই ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে সরবরাহ করা হয়। বাকি ৩২ ভাগ সরবরাহ করা হয় ভূ-উপরিস্থ উৎস থেকে। ঢাকা ওয়াসার এ তথ্যই বলছে, প্রতিদিন পানির স্তর নেমে যাওয়ায় কীভাবে ভূমিকা রাখছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ সবসময় বলে আসছে, ‘সারফেস ওয়াটার’ বা ভূ-উপরিস্থ পানির উৎসগুলো অধিকাংশই নষ্ট হয়ে গেছে। বাধ্য হয়ে ভূগর্ভস্থ পানি তুলে সরবরাহ করা হয়। ২০২৫ সালের দিকে ওয়াসার এক জরিপে দেখা গেছে যেসব এলাকায় ভূউপরিস্থ পানির ব্যবহার বেড়েছে, বিশেষ করে পদ্মা জশলদিয়া পানি শোধনাগার থেকে পানি সরবরাহ করার পর আরমানিটোলা এলাকায় পানির স্তুর ওপরে উঠে এসেছে। কারণ সেখানে অনেক গভীর নলকূপ বন্ধ করে দিয়েছিল ঢাকা ওয়াসা। এখন আরমানিটোলা এলাকায় পানির অধিক চাপের কারণে অনেক জায়গায় ট্যাপের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করছে ঢাকা ওয়াসা। এ জন্য গবেষকদের ধারণা ওয়াসা যত বেশি ভূউপরিস্থ পানির দিকে যাবে ততই পানির স্তর ভালো অবস্থানে যাবে। এ জন্য ঢাকা ওয়াসার প্রধান লক্ষ্য পানি শোধনাগার প্রকল্পগুলোর দিকে বেশি নজর দেওয়া। সায়দবাদ ফেস-৩ সহ অন্য পানি শোধনাগারগুলো দ্রুত চালু এবং ঢাকার চারপাশের নদীর পানি ব্যবহার উপযোগী করে তোলার জন্য মহাপরিকল্পনা নিতে হবে।ঢাকায় পানি সংকটের আভাস অনেক আগেই দিয়েছিল পানি উন্নয়ন বোর্ড। তারা ১৯৯৬ সালে ঢাকায় পানির স্তর দেখিয়েছিল ২৫ মিটার, যা ২০০৫ সালে ৪৫ মিটার, ২০১০ সালে ৬০ মিটার, ২০২৩ সালে ৭৫ মিটার এবং ২০২৪ সালে ৮৯ দশমিক ৮৮ মিটারে ঠেকেছে। সংশ্লিষ্ট গবেষকদের মতে, পানির স্তর এভাবে নামতে থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে ১২০ মিটারে চলে যেতে পারে। কারণ, ঢাকায় পানির চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। ওয়াসার হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০ সালে ঢাকায় প্রতিদিন ৪৩ লাখ ঘনমিটার পানির প্রয়োজন হতে পারে। ২০৩৫ সালে সেই চাহিদা পৌঁছাবে প্রতিদিন ৫২ লাখ ঘনমিটারে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) সবশেষ ২০২০ সালে ঢাকার সবুজায়ন নিয়ে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল, কেন্দ্রীয় নগর এলাকায় এখন কংক্রিটে আচ্ছাদিত ভূমি প্রায় ৮২ শতাংশ। ১৯৯৯ সালে যা ছিল ৬৪.৯৯ শতাংশ। ২০০৯ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৭৭.১৮ শতাংশ। জলাভূমির পরিমাণ প্রায় ৪.৩৮ শতাংশ, যা ২০ বছর আগেও ছিল ১৪.২৫ শতাংশ।পানি স্তর নেমে যাওয়া এবং সবুজ কমে যাওয়ার বিষয়ে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান আমাদের সময়কে বলেন, বিশে^র অনেক দেশ কংক্রিট তুলে দিচ্ছে। নতুন করে গ্রিন স্পেস তৈরি করে দিচ্ছে। আমাদের এখন সেদিকে যাওয়ার বিকল্প নেই। অপ্রয়োজনীয় কংক্রিটের আচ্ছাদন তুলে দিলে পানির পুনচক্রায়ন বাড়বে। সর্বোপরি উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ এবং ঢাকার ওপর মানুষের চাপ নিয়ন্ত্রণ জরুরি হয়ে পড়েছে। না হলে ঢাকাকে রক্ষা করা কঠিন হয়ে যাবে।ঢাকা ওয়াসার কোন এলাকায় পানির স্তর কেমন : ওয়াসা ১০ জোনে ভাগ করে পানি সরবরাহ করে থাকে। জোন-১ এলাকায় রয়েছে গেন্ডারিয়া, শ্যামপুর, যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া। এই জোনে পানির স্তর ৮৩.২৫ মিটার নিচে। লালবাগ, বংশাল, ধানমন্ডি এলাকা নিয়ে জোন-২। এখানে পানির স্তর ৬৮.৮৯ মিটার নিচে। ধানমন্ডি, রায়েরবাজার ও মোহাম্মদপুর এলাকা নিয়ে জোন-৩। এখানে পানির স্তর ৬৮.৩৬ মিটার। রোকেয়া সরণির পশ্চিম অংশ জোন-৪। এই এলাকায় পানির স্তর ৮৯.৮৮ মিটার। রোকেয়া সরণির পশ্চিমাংশ জোন-১০ অর্থাৎ মিরপুর-১০, পল্লবী, কাফরুল, তুরাগ, ক্যান্টনমেন্টের কিছু অংশ। এই এলাকায় পানির স্তর ৯২ মিটার নিচে। পুরো উত্তরা এলাকা নিয়ে গঠিত জোন-৯। অর্থাৎ বিমানবন্দর এলাকা, খিলক্ষেত, দক্ষিণ খান, উত্তর খান, উত্তরা। এই এলাকার পানির স্তর ৭৩.৭৮ মিটার। গুলশান, বারিধারা, আফতাবনগর এলাকা নিয়ে জোন-৫। এখানে পানির স্তর ৮৪.২৫ মিটার। খিলগাঁও, রমনা, পল্টন, মতিঝিল নিয়ে জোন-৬। এখানে পানির স্তর ৭৮.৭০ মিটার। গুলশান, বনানী, তেজগাঁও এলাকা নিয়ে জোন-৭। এখানে পানির স্তর ৮৪.২৫ মিটার। যাত্রাবাড়ী, কদমতলী এলাকায় পড়েছে জোন-৭। এখানে পানির স্তর ৮৫.৫০ মিটার নিচে।কেন পানির স্তর নেমে যাচ্ছে : পানির স্তর নেমে যাওয়ার কারণগুলোর অন্যতম হচ্ছে ভূগর্ভ থেকে অতিমাত্রায় পানি তোলা, সবুজায়ন বন্ধ করে কংক্রিটে ঢেকে ফেলা, কম বৃষ্টিপাত, ঢাকা ও আশপাশে অতিরিক্ত শিল্প কারখানা। বৃষ্টিপাত ছাড়া সব কারণ মানবসৃষ্ট। পানির স্তর নামার ফলে যেসব ঝুঁকি : গভীর নলকূপের মাধ্যমে ভূগর্ভ থেকে পানি তোলার ফলে পানির স্তর ক্রমেই নিচে নামছে। এতে পানির সংকট তৈরি হবে। এই সংকট সমাধানে আরও গভীরে নলকূপ বসাতে হবে। ফলে পানি তোলার খরচ বেড়ে যাবে। পানির স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ভূমিকম্প হলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়বে।

পানির স্তর নেমে যাওয়া ঠেকাতে সরকারি ও ব্যক্তি পর্যায়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, মাটির নিচ থেকে পানি তোলার প্রবণতা কমাতে হবে। সারফেস ওয়াটারের গুরুত্ব বাড়াতে হবে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে ব্যবহার বাড়াতে হবে। ঢাকা ও ঢাকার চারপাশে কারখানার অনুমোদন বন্ধ করতে হবে।ভূগর্ভস্থ পানি বিশেষজ্ঞ এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক পরিচালক ড. আনোয়ার জাহিদ আমাদের সময়কে বলেন, পানির স্তর যত নামবে, পানি রিচার্জের ক্ষমতা তত কমবে। এতে এক সময় ঢাকায় পানির ভয়াবহ সংকট দেখা দিতে পারে।

ঢাকা ওয়াসা কোথা থেকে কত লিটার পানি সরবরাহ করে : ঢাকা ওয়াসা মোট পাঁচটি সোর্স থেকে পানি সরবরাহ করে। পদ্মা জশলদিয়া পানি শোধনাগার, সায়দাবাদ পানি শোধনাগার-১, সায়দাবাদ পানি শোধনাগার-২, চাঁদনীঘাট পানি শোধনাগার এবং সাভারের ভাকুর্তা পানি শোধনাগার। ভাকুর্তা পানি শোধনাগারে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করে শোধন করা হয়। পদ্মা জশলদিয়া থেকে আসে ৪৫ কোটি লিটার, সায়দাবাদ-১ ও সায়দাবাদ-২ থেকে আসে ২৩ কোটি লিটার, চাঁদনীঘাট শোধনাগার থেকে ২ কোটি লিটার। বাকি ১৪ কোটি লিটার ভাকুর্তা থেকে।বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকা ওয়াসা ও সরকারি অন্যান্য সংস্থার এখনই সারফেস ওয়াটারের ওপর জোর দিতে হবে। কংক্রিটের ব্যবহার কমাতে হবে। পানির অপব্যবহার রোধ করতে হবে।

জৈন্তাবার্তা/সুলতানা