ছবি:সংগৃহীত
দেশে ২০১৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সাড়ে ১২ বছরের বেশি সময়ে ৭২ হাজার ৭৩৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১ লাখ ২৫ হাজার ৪০৫ জন নিহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ১ লাখ ৭৬ হাজার ২৪৯ জন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি।
সংগঠনটির অভিযোগ, কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা উপেক্ষা করে রেল ও নৌপথের পরিবর্তে সড়কনির্ভর যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার কারণে দেশে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েছে। বিগত সরকারের ভুলনীতি, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও পরিবহন খাতের অনিয়মকে এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী করেছে সংগঠনটি।
জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস-২০২৬ উপলক্ষে বুধবার (২১ অক্টোবর) সকালে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এসব কথা বলেন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী।
বিবৃতিতে তিনি বলেন, স্বাধীনতার আগে দেশের মানুষের যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম ছিল নৌপথ, এরপর ছিল রেলপথ। তুলনামূলক নিরাপদ ও সাশ্রয়ী এ দুই মাধ্যমে মানুষের বড় অংশ যাতায়াত করতেন। কিন্তু স্বাধীনতার পর রেল ও নৌপথের উন্নয়ন ও ব্যবহার বাড়ানোর পরিবর্তে একের পর এক সড়ক নির্মাণ ও সম্প্রসারণ করা হয়েছে। ফলে যোগাযোগব্যবস্থা ক্রমেই সড়কনির্ভর হয়ে পড়েছে।
মোজাম্মেল হক চৌধুরীর অভিযোগ, পরিবহন খাতে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও পরিকল্পনার অভাবের পাশাপাশি সমন্বিত গণপরিবহনব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় সড়কের ওপর চাপ বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে দুর্ঘটনার সংখ্যায়ও। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির দায় অতীতের সব সরকারকেই নিতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
দুর্ঘটনার পেছনে যেসব কারণ
বিবৃতিতে সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছে যাত্রী কল্যাণ সমিতি। এর মধ্যে রয়েছে মোটরসাইকেল, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার বেপরোয়া বৃদ্ধি ও চলাচল; সড়কে রোড ডিভাইডারের অভাব; গাছপালার কারণে বাঁকে দৃষ্টিসীমা বাধাগ্রস্ত হওয়া; মহাসড়কের নির্মাণত্রুটি; যানবাহনের ত্রুটি এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করা।
এ ছাড়া উল্টো পথে যানবাহন চালানো, সড়কে চাঁদাবাজি, পণ্যবাহী যানবাহনে যাত্রী পরিবহন, অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, বেপরোয়া গতি ও ঝুঁকিপূর্ণভাবে ওভারটেকিংকে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে সংগঠনটি। চালকদের দীর্ঘ সময় বিরতি ছাড়া গাড়ি চালানোর বিষয়টিও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায় বলে বিবৃতিতে বলা হয়।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির ভাষ্য, উন্নত গণপরিবহন ও সমন্বিত যোগাযোগব্যবস্থার অভাবে মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতে ভোগান্তি বাড়ছে। এ সুযোগে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, রাইড শেয়ারিং মোটরসাইকেল, স্থানীয়ভাবে তৈরি নসিমন-করিমন এবং বিভিন্ন ধরনের ছোট যানবাহনে যাত্রী পরিবহন বেড়েছে। এতে সড়কে যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।
সংগঠনটি আরও দাবি করেছে, গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে তারা দুর্ঘটনা ও হতাহতের যে হিসাব পেয়েছে, বাস্তবে হাসপাতালসহ অন্যান্য উৎসের তথ্য যুক্ত হলে এ সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
দুর্ঘটনা রোধে ১০ দফা সুপারিশ
সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে ১০ দফা সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। এগুলোর মধ্যে রয়েছে—
১. সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষকে (বিআরটিএ) পরিবহন বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে পরিচালনা করা।
২. উন্নত বিশ্বের আদলে প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক বাস নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা।
৩. প্রযুক্তিনির্ভর সড়ক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা চালু করা।
৪. চালকদের উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে দক্ষতা যাচাইয়ের মাধ্যমে লাইসেন্স দেওয়া নিশ্চিত করা।
৫. গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় মহাসড়কে ফুটপাত ও সার্ভিস লেন নির্মাণ করা।
৬. কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে সড়কে চাঁদাবাজি বন্ধ করা এবং চালকদের বেতন ও কর্মঘণ্টা নির্ধারণ নিশ্চিত করা।
৭. মহাসড়কে পথচারীদের চলাচল ও নিরাপদে রাস্তা পারাপারের ব্যবস্থা, রোড সাইন এবং রোড মার্কিং নিশ্চিত করা।
৮. মানসম্মত সড়ক নির্মাণ ও মেরামতের পাশাপাশি নিয়মিত সড়ক নিরাপত্তা নিরীক্ষা করা।
৯. যানবাহনের ফিটনেস সনদ দেওয়ার পদ্ধতি আধুনিক করা এবং মেয়াদোত্তীর্ণ গণপরিবহন চলাচল থেকে প্রত্যাহার করা।
১০. বিআরটিএর সক্ষমতা বাড়ানো এবং চালকদের প্রশিক্ষণের জন্য ট্রাফিক ট্রেনিং একাডেমি প্রতিষ্ঠা করা।
সংগঠনটির মতে, সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে শুধু সড়ক নির্মাণ ও সম্প্রসারণ যথেষ্ট নয়; বরং নিরাপদ রেল ও নৌপথের ব্যবহার বাড়ানো, উন্নত গণপরিবহন নিশ্চিত করা, চালকদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
জৈন্তা বার্তা/ ওয়াদুদ




