ছবি: সংগৃহীত
আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঘোষিত তফসিলকে ‘একতরফা’ বলে মন্তব্য করে তা বাতিল করার আহ্বান জানিয়েছেন দেশের ৫৮৬ জন বিশিষ্ট নাগরিক। তারা মনে করেন চলমান উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় না নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে দেশকে আরও সংঘাতের দিকে ঠেলে দিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার রাতে এক যৌথ বিবৃতিতে তারা এই মত দিয়ে একটি নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের লক্ষ্যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী দল নিরপেক্ষ সরকার গঠন ও সংলাপের মাধ্যমে নতুন তফসিল দেওয়ার জন্য আহ্বান জানান।
বিবৃতিতে বলা হয়, গণতন্ত্রের পূর্ব শর্ত হচ্ছে মানুষের ভোটের অধিকার, মানবাধিকার এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ দেশের ৩৬টি রাজনৈতিক দল মানুষের এই ভোটের অধিকার বাস্তবায়নের জন্য দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করে আসছে। কিন্তু সরকার তাতে কর্ণপাত না করে আরেকটি ২০১৪ এবং ২০১৮ মার্কা নির্বাচনের আয়োজন করার পায়তারা চালাচ্ছে। এর পরিণতি শুভকর নয়। জাতীয় নির্বাচন মানুষের জীবনে প্রতি পাঁচ বছর পর পর আসে সেটাকে উৎসবমুখর করে তোলার দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু সরকার বিরোধী দল বিএনপিসহ আন্দোলনকারী দলগুলোর সভা সমাবেশ করার সমস্ত অধিকার ধূলিসাৎ করে দিয়ে কেবলমাত্র তাদের নিজেদের শিবিরের এবং পছন্দের দলগুলোকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সংযুক্ত করছে। একটি দলের অফিসের সামনে উৎসব মুখর পরিবেশ আর একটি দলের অফিসে ঝুলছে তালা, পুলিশের সতর্ক পাহারার কারণে সেখানে প্রবেশ করতে পারছে না কোনো নেতা-কর্মী।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইতিমধ্যে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস ও আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অনেকের বাড়িতে প্রতি রাতে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হানা দিচ্ছে গ্রেপ্তার করার জন্য। অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে গোটা দেশ আজ পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। এখন নতুন কৌশল হিসেবে জাতীয় সংসদের নির্বাচন করতে পারে বিএনপির এমন সব সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিরুদ্ধে ঢালাও সাজা দেওয়া হচ্ছে আদালতকে ব্যবহার করে।
তাঁরা বলেন, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজন করা হলে তার যে চিত্র আমাদের চোখে ভাসে বর্তমান সেটাই আমরা দেখতে পাচ্ছি। এখানে সব রাজনৈতিক দলের জন্য লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হচ্ছে না, ইতিপূর্বেও হয় নাই। যে কারণে বিরোধীদল বিএনপি নির্বাচনকালে একটি দল নিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে অনড় রয়েছে।
বিশিষ্ট নাগরিকেরা বলেন, এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে কোন দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। বিগত দিনে ১১টি জাতীয় নির্বাচনের মধ্যে সাতটি দলীয় সরকারের অধীনে এবং চারটি দল নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়েছে। যে চারটি জাতীয় নির্বাচন দল নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়েছে সেখানে কোন বিতর্ক ছিল না। মানুষ উৎসব মুখর পরিবেশে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছে। বর্তমান সরকার ২০০৮ সালে ক্ষমতায় এসে উচ্চ আদালতের রায়ের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে এবং সংবিধান বিশেষজ্ঞদের সকল মতামত উপেক্ষা করে কেবলমাত্র এক ব্যক্তির ইচ্ছা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সংবিধান থেকে সেই নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিধান বাতিল করা হয়েছে। এরপর থেকে শুরু হয়েছে দখলদারিত্বের মহা উৎসব যেখানে জনগণের কোনো অংশগ্রহণ নেই। ২০১৪ সালে বিনা ভোটে ১৫৪ জন কে সংসদ সদস্য ঘোষণা দিয়ে শপথ নেওয়ার মধ্য দিয়ে স্থাপন করা হলো এক নজিরবিহীন ইতিহাস। আর ২০১৮ সালে দিনের ভোট আগের রাতেই পুলিশ ও প্রশাসনের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ব্যালট পেপারে সিল মেরে ভোটের বাক্স ভরে উপহার দেওয়া হয় পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কিত নির্বাচন।
বিশিষ্ট নাগরিকেরা মনে করেন, সরকার এবং নির্বাচন কমিশন যে পথে হাঁটছে তাতে জনমনে এই ধারণা স্পষ্ট হচ্ছে যে, দেশে ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনের মতোই আরেকটি প্রহসনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এর পরিণতি কখনোই দেশের জন্য ভালো হবে বলে মনে করেন না এই বিশিষ্ট নাগরিকবৃন্দ। তারা সরকারকে এই পথ পরিহার করে একটি সুন্দর সুষ্ঠু নিরপেক্ষ এবং উৎসব মুখর নির্বাচনের আয়োজন করার জন্য জনআকাঙ্ক্ষার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন, প্রফেসর ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী, প্রফেসর ড. মাহবুব উল্লাহ, প্রফেসর ড. আফম ইউসুফ হায়দার, এডভোকেট এজে মোহাম্মদ আলী, সাংবাদিক আলমগীর মহিউদ্দিন, এডভোকেট জয়নুল আবেদীন, প্রফেসর আহমেদ কামাল, অধ্যাপক নুরুল আমিন, প্রফেসর ড. তাজমেরি এসএ ইসলাম, সাংবাদিক রুহুল আমিন গাজী, প্রফেসর ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, কবি ও সাংবাদিক আবদুল হাই শিকদার, প্রফেসর ডা: সিরাজ উদ্দিন আহমেদ, প্রফেসর ডা: ফরহাদ হালিম ডোনার, সাংবাদিক ড. রেজোয়ান হোসেন সিদ্দিকী, ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, সাংবাদিক মোস্তফা কামাল মজুমদার, প্রফেসর ড. আবদুল লতিফ মাসুম, প্রফেসর ড. খলিলুর রহমান প্রমুখ।
এম সি




