ছাতক-দোয়ারা সীমান্ত চোরাকারবারিদের নিরাপদ রুট
শনিবার, ০২ মে ২০২৬, ০৭:০৬ AM

ছাতক-দোয়ারা সীমান্ত চোরাকারবারিদের নিরাপদ রুট

জৈন্তা বার্তা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৫/০৬/২০২৩ ০৮:৪৭:০২ AM

ছাতক-দোয়ারা সীমান্ত চোরাকারবারিদের নিরাপদ রুট

ভারতীয় গরু মহিষ দোয়ারা বাজারের বাংলাবাজার দিয়ে ঢুকছে, ২৪ জুন গভীর রাতের দিকে তুলা


সুনামগঞ্জের ছাতক-দোয়ারার সীমান্ত দিয়ে অবৈধ পথে প্রতিদিন দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করছে গরু-মহিষ মাদকসহ কোটি টাকার ভারতীয় পণ্য। চোরাকারবারিদের নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ছাতক-দোয়ারা সীমান্ত। কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে চোরাকারবারিরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। সীমান্তের ওপার থেকে চোরাই পথে আনা হচ্ছে গরু-মহিষ, মদ-গাজা, হিরোইন, প্রেন্সিডিলসহ বিভিন্ন ধরণের পণ্য। এ সীমান্ত দিয়ে অবাধে ভারতীয় গরু প্রবেশ করায় ঈদে লোকসানের আশংঙ্কা করছেন স্থানীয়র খামারিদের।

সীমান্তের ওপার থেকে গরু-মহিষ, মদ, গাজা, হিরোইন, ফেন্সিডিল, যৌন উত্তেজক ট্যাবলেট, অস্ত্র, মোটর সাইকেল, শাড়ি কাপড়, নাসির বিড়ি, প্রসাধনী সামগ্রীর পাশাপাশি প্রতিদিন চোরাই এই পথে আসছে ভারতীয় চিনি ও পেঁয়াজসহ সরকারি কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে বিভিন্ন ধরনের ভোগ্যপণ্য। সীমান্তরক্ষি বিজিবি, ছাতক ও দোয়ারা থানা পুলিশের নাকের ডগা দিয়ে হরহামেশাই সড়ক পথে ট্রাক- পিকআপ যোগে এবং নদী পথে পরিবহন হচ্ছে এসব অবৈধ পণ্য। আমদানিকৃত গরু মহিষসহ ভারতীয় পণ্য বিক্রি হচ্ছে দেশের বিভিন্ন হাট-বাজারে।

ঢাকায় চড়া দমে বিক্রি হচ্ছে এসব গরু-মহিষ। সব মিলিয়ে বিরাট ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন স্থানীয় খামারিরা। 

প্রশাসনের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত খবরদারি না থাকায় চোরাকারবারিরা নির্বিঘ্নে তাদের এই অবৈধ ব্যবসা স্বাধীন ভাবে চালিয়ে যাচ্ছে। অবৈধ পথে এ ব্যবসার ফল রাতারাতি চোরাকারবারিরা আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছেন। লাভজনক এমন ব্যবসায় উৎসাহিত হয় চোরাকারবারিদের বাড়ছে দৌরাত্ম্য। সেই সাথে বাড়ছে মাদকের হার। 

ছাতকের আফজলাবাদ গবাদিপশু ও কৃষি সমবায় সমিতি লি: এর সম্পাদক মো. কাওসার আহমেদ কাওছার আহমদ জানান, গতবছরে খামারিদের লোকসান হয়েছে বন্যার কারনে। এবছরে মানুষের অভাব তার মধ্যে ভারতীয় গরু মহিষ অবৈধ ভাবে প্রবেশ করে গরীব খামারীরা চরম লোকসানে ফেলছে। সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে।

সারজমিনে ঘুরে জানাযায়, ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলার উত্তর সীমান্তে রয়েছে ভারতের মেঘালয় রাজ্য। ছাতকের ইসলামপুর ইউনিয়নের বনগাঁও, নোয়াকোর্ট ছাড়া সবগুলো সীমান্ত স্পটগুলো রয়েছে দোয়ারাবাজারে। সীমান্তের কাঁটাতার পেরিয়ে কৌশলে প্রতিদিন কোটি টাকার মালামাল অবৈধ পথে দেশের অভ্যন্তরে ঢুকছে। আর এসবের নেতৃত্বে রয়েছে সীমান্তের শক্তিশালী একাধিক চক্র। সীমান্তরক্ষিদের সাথে গোপন আতাত করেই সিন্ডিকেটরা দীর্ঘদিন ধরে এই পথে চোরাচালান আনছে। সীমান্ত রক্ষী, লোকাল পুলিশের সাথে গোপনে মাসুয়ারার মাধ্যমে সিন্ডিকেটরা দীর্ঘদিন ধরে এই পথে চোরাচালান ব্যবসা করে আসছে। এসব তথ্য বিশেষ গোয়েন্দা প্রতিবেদনে রয়েছে বলে জানা গেছে।

এদিকে, বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, এই পথ চোরাকারবারিরা নিরাপদের জন্য বেঁচে নিয়েছে। এই চোরাইপথে প্রতি রাতে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করছে ৩শ থেকে ৪শ’ মহিষ ও ২শতাধিক গরু। এছাড়া মদ, গাজা, হিরোইন, ফেন্সিডিল, অস্ত্র, মোটর সাইকেল, শাড়ী কাপড়, নাসির বিড়ি, কসমেটিক্স, রান্নার মসলা, সাবানসহ চোরাই পথে প্রত্যেহ প্রবেশ করছে ভারতীয় চিনি, পেঁয়াজসহ নানা পণ্য। এ রুট ছাড়াও ইউনিয়নের শিমুলতলা, মৌলাপাড়, বাঁশতলা, ঝুমগাঁও, পেকপাড়া, বোগলা ইউনিয়নের বাগানবাড়ি, গাছুগড়া ও ইদু কোনা, লক্ষিপুরের ভাঙ্গাপাড়া, মাঠগাঁও, নরসিংপুরের শ্যামেরগাঁও, ত্রিপুরা, চারগাঁও ও সোনাপুর সীমান্ত দিয়ে প্রতিরাতে ভারতীয় পণ্য বাংলাদেশে আনা হচ্ছে। সীমান্ত এলাকার সিন্ডিকেটের প্রতিটি সদস্যদের বাড়ি-ঘরে যেন একেকটা ভারতীয় অবৈধ মালামালের মিনি হাট-বাজার! লোকে মূখে অভিযোগ রয়েছে, সীমান্ত দিয়ে অবৈধ পথে দেশে আসা ভারতীয় প্রতিটি মহিষ থেকে ১৮শ’ এবং প্রতিটি গরু থেকে ১২শ’ টাকা করে নিচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। 

সীমান্ত চোরাচালানের ঘটনায় টহলরত পুলিশ-বিজিবি সদস্যরা মাঝে মধ্যে মাদকসহ ভারতীয় বিভিন্ন অবৈধ পণ্য জব্দ এবং বাহকদের আটক করলেও মূল হোতারা থেকে যায় আড়ালে। তারা থাকে ধরাছোঁয়ার বাহিরে। অবৈধ পথে ভারতীয় পণ্য দেশে প্রবেশের পর তাদের বাড়ি থেকে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে আরেক শ্রেনির চোরাকারবারিরা ভারতীয় পণ্য ক্রয় করে। ক্রয়কৃত ভারতীয় পণ্য বাংলাবাজার-নোয়ারাই, বোগলা-দোয়ারা-নোয়ারাই, লক্ষিপুর-দোয়ারা-নোয়ারাই, নোয়ারাই-নরসিংপুর, আদারবাজার-লক্ষিপুর, বাংলাবাজার-দোয়ারায় পৌঁছে সুরমা নদী নৌকায় পাড়ি দিয়ে শ্রীপুর-বড়কাপন সড়ক পথে পরিবহন করে ছাতকবাজার, গোবিন্দগঞ্জ বাজার, জাউয়াবাজার, দোলারবাজার, জগন্নাথপুর উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে এবং সিলেট শহরের বিভিন্ন এলাকায় পাইকারী হিসেবে পণ্য বিক্রি করা হয়। এসব পণ্য পরিবহনের জন্য চোরাকারবারিরা একাধিক ট্রাক, ডিআই পিকআপ ক্রয় করেছে। সিলেট শহর ছাড়াও রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে নিয়ে বিক্রয় করা হয় ভারতীয় গরু-মহিষ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, সীমান্তের বিছনাকান্দির আশ-পাশ এলাকা থেকে সুরমা নদী হয়ে নৌকা যোগে মদ, গাজা, হিরোইন, নাসিরবিড়িসহ ভারতীয় বিভিন্ন পণ্যের চোরাচালান ছাতকের গোবিন্দগঞ্জে আসে। এ কারণে গোবিন্দগঞ্জ বাজারে হাত বাড়ালেই মদ, গাজা, হিরোইন, ইয়াবা, বাবা, ভারতীয় চিনি, পেঁয়াজ, কসমেটিক্সসহ নিষিদ্ধ পণ্য পাওয়া যায়। সুরমা নদীর সাথে সংযুক্ত সোনালী চেলা, মরা চেলাসহ বিভিন্ন নদী পথেও পরিবহন হয়ে থাকে ভারতীয় মাদকসহ বিভিন্ন পণ্য।

ছাতক থানা সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারী থেকে এপ্রিল পর্যন্ত পুলিশের অভিযানে ৪শ কেজি ৯গ্রাম গাজা, ইয়াবা ১৩০পিস, ভারতীয় মদ ১৭০ বোতল, ৩২ লিটার চোলাইমদ, ৭৫০ কেজি চিনি, ২১ হাজার সাবানসহ অন্যান্য ভারতীয় পণ্য জব্দ করা হয়েছে। চোরাচালান ও মাদক মামলায় ৪৮ জনকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। দোয়ারাবাজার থানা সূত্রে জানা গেছে, গেল জানুয়ারী-এপ্রিল পর্যন্ত পুলিশের অভিযানে ইয়াবা ১হাজার ৬৪৮ পিস, ৫৬১ বোতল ভারতীয় মদ, ২১হাজার ৩৮০পিস সাবান, ৫টি মহিষ ও ২হাজার ৪শ’ কেজি ভারতীয় চিনি জব্দ করেছে। এ নিয়ে ১০টি মাদক ও ১৩টি চোরাচালান মামলা দায়ের করা হয়েছে। 

সুনামগঞ্জের সহকারী পুলিশ সুপার (ছাতক-দোয়ারা বাজার সার্কেল) রণজয় চন্দ্র মল্লিক জানান, চোরাচালানের বিরুদ্ধে তাদের নীতি জিরো টলারেন্স। চোরাচালানের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

জৈন্তাবার্তা/এমকে