ছবি : সংগৃহীত
‘জলে কুমির ডাঙ্গায় বাঘ, তার সঙ্গেই বসবাস’ এ প্রবাদটির বাস্তব চিত্র মিলবে কয়রার শাকবাড়িয়া নদীপারের বাসিন্দাদের মধ্যে। ট্যাপা লঞ্চঘাটের পূর্ব দিকের ৬ নম্বর কয়রায় বসবাস ৪২টি আদিবাসী পরিবারের। এর মধ্যে অর্ধেকেরই বাস ওয়াপদার বেড়িবাঁধের বাইরে, অর্থাৎ শাকবাড়িয়া নদীতীরে। ঘরের বারান্দায় প্রতি জোয়ারেই পানি ছুঁই ছুঁই থাকে।
আর গোনের জোয়ারে তো পানি বারান্দা পেরিয়ে ঘরও ছুঁয়ে যায়। স্বাভাবিক জোয়ারের সময় এমন চিত্র দেখা গেলেও প্রাকৃতিক দুর্যোগ-ঝড়-ঝঞ্জার সময় কি অবস্থা দাঁড়ায় সেটি বাস্তবে না দেখলে অনুমান করা কঠিন। ঘরে বসে একটু জোরে ডাক দিলেই ওপারের সুন্দরবন থেকে আওয়াজ শোনা যাবে। সুন্দরবনসংলগ্ন এসব মানুষের জীবন-জীবিকাও সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল।
এ জন্য শত কষ্টেও তারা ওই স্থান ছাড়তে নারাজ। তাই সরকারের কাছেও তাদের দাবি, যদি তাদের নিয়ে পুনর্বাসনের কোনো পরিকল্পনাও করা হয় তা যেন সেখানে রেখেই।
কাঁকড়া বা মাছ ধরা তাদের প্রধান পেশা। পুরুষদের কেউ কেউ দিন মজুরিতে নিয়োজিত থাকলেও নারী ও শিশুদের দেখা যায় মাছ বা কাঁকড়া ধরতে।
যা আয় হয় তাই হয় সংসারের সহায়ক। সুন্দরবনের ওপর তারা এতোটাই নির্ভরশীল যে, যদি রান্নার জন্য জরুরি ভিত্তিতে খড়ি বা জ্বালানি প্রয়োজন হয় তখনো নৌকা নিয়ে বনে গিয়ে মরা গাছের ডাল-পালা-পাতা কুড়িয়ে আনেন। এ কাজে বেশি জড়িত নারী ও শিশুরা। পানির সঙ্গে তারা এতটাই জড়িত যে ছোট-বড় সবাই নৌকা চালাতে পারে। কারণ তাদের প্রধান বাহনই নৌকা।
আর পানির সঙ্গে বেড়ে ওঠা বলে হাঁটার আগে শিখতে হয় সাঁতার। খুলনার উপকূলীয় এলাকার জীবনচিত্র নিয়েই তৈরি হয়েছে আজকের প্রতিবেদন।
টেপাখালী মুণ্ডাপাড়ার জীবনচিত্র
কয়রার টেপাখালী মুণ্ডাপাড়াটি সুন্দরবনঘেঁষা শাকবাড়িয়া নদীর পারে গড়ে উঠেছে। ওই পরিবারগুলোর জীবনচিত্র বড়ই বিচিত্র। খাবার পানির জন্য যেতে হয় দুই কিলোমিটার দূরের পুকুরে। যাদের একটু টাকা আছে তারা কয়রা থেকে আনা টিউবওয়েলের ৩০ লিটারের পানির জার কেনে। যার একটি জারের মূল্য ৩০ টাকা। অর্থাৎ টিউবওয়েলের পানির মূল্যও প্রতি লিটার এক টাকা। গোসল করে শাকবাড়িয়া নদীর লোনা পানিতে। নদীর ময়লা-আবর্জনার মধ্যেই বেড়ে ওঠা তাদের। এ জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকিও আছে অনেক। কিন্তু আশপাশে নেই কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্রও।
সন্তানদের লেখাপড়ার জন্য পাশের ৬ নং কয়রা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি দেড় কিলোমিটার দূরে। পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারণে জীবনযাত্রা বদলায়নি মুণ্ডাদের।
স্থানীয় ইউপি সদস্য হরেন্দ্রনাথ সরকার বলেন, ‘মুণ্ডাদের প্রধান জীবিকাই হচ্ছে সুন্দরবন আর অন্যের বাড়িতে দিনমজুরি দেওয়া। ওয়াপদার বাইরে যারা বাস করে তাদের প্রতিনিয়তই পানির সঙ্গে যুদ্ধ করেই থাকতে হয়। বিশেষ করে প্রাকৃতিক দুর্যোগে তারা একেবারেই অসহায় হয়ে পড়ে।’
কর্মসংস্থানের সুযোগ হতে পারে ওয়াচ টাওয়ার
সম্প্রতি মুণ্ডাপাড়া পরিদর্শনকালে কথা হয় সেখানকার বাসিন্দা বাসন্তী রানী মুণ্ডার সঙ্গে। তার আশঙ্কা শাকবাড়িয়া নদীতীরে নির্মাণাধীন কয়রা-সুন্দরবন ক্যাওরাকাটা ইকো ট্যুরিজম টাওয়ার বা ওয়াচ টাওয়ারটি স্থাপন হলে হয়তো মুণ্ডাদের সেখান থেকে সরে যেতে হতে পারে। যদিও এমন ঘোষণা এখনো সরকার থেকে দেওয়া হয়নি। ট্যুরিজম বোর্ডের বাস্তবায়নাধীন ওই টাওয়ারটি নির্মাণ হলে সেখান থেকে পর্যটকরা একদিকে যেমন সুন্দরবন দেখতে পাবেন, তেমনি টাওয়ারের আশপাশে পর্যটকদের আকর্ষণের জন্য থাকবে নানা প্রকার দর্শনীয় সামগ্রীও। এক কোটি টাকার বেশি ব্যয় হচ্ছে ওয়াচ টাওয়ারটি।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, মুণ্ডাদের ওই স্থান থেকে বাম্তুচ্যুত না করে বরং টাওয়ারকেন্দ্রিকই তাদের জন্য হতে পারে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা।
যেমনটি কুয়াকাটায় যাওয়া পর্যটকদের আকর্ষণ থাকে আদিবাসীদের জীবনচিত্র এবং তাদের তৈরি তাঁতের কাপড়সহ অন্যান্য পণ্য সামগ্রীর প্রতি। কয়রার মুণ্ডাদের নিয়েও হতে পারে এমন পরিকল্পনা। এমনটি জানালেন সেখানকার বাসিন্দারা।
বনদস্যুদের উৎপাত
সুন্দরবনসংলগ্ন ওই এলাকার বাসিন্দাদের আর একটি সংকট সাম্প্রতিককালের বেড়ে যাওয়া বনদস্যুদের উৎপাত। অনেক সময় স্থানীয় বাসিন্দারা জঙ্গলে গেলে তাদেরকে বনদস্যুরা জিম্মি করে অর্থ দাবি করে এমন ঘটনা সাম্প্রতিককালে ঘটেছে বেশ কয়েকবার। অনেকে মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়িয়ে আনেন স্বজনদের। এ ক্ষেত্রে নারীরা আরো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বলেও জানায় স্থানীয়রা।
মুণ্ডাপাড়ার চতুর মুণ্ডার সঙ্গে যখন প্রতিবেদকের কথা হচ্ছিল তখন তার স্ত্রী জঙ্গলে গেছেন কাঁকড়া ধরতে। সঙ্গে রয়েছেন আরো কয়েকজন নারী। ভয়ে-আতঙ্কেও ছিলেন চতুর মুণ্ডা। কিন্তু অভাবের সংসারের সহায়ক স্ত্রীকে ছাড়তে বাধ্য তিনি। সাত মেয়ের বাবা চতুর মুণ্ডা দুটি মেয়ে নিয়েই স্বামী-স্ত্রী বাস করেন মুণ্ডাপাড়ায়। অন্য পাঁচ মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে।
আশ্রয়কেন্দ্রও অনিরাপদ
খুলনা জেলার উপকূলবর্তী দুটি উপজেলার একটি কয়রা অপরটি দাকোপ। সেখানকার উপজেলা নির্বাহী অফিসারের দেওয়া তথ্য মতে, এ দুটির মধ্যে কয়রায় ১১৭টি ও দাকোপে ১৩০টি আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে। তবে দাকোপের ঝুলন্তপাড়া বলে খ্যাত সুতারখালীতে আরো একটি আধুনিক মানের আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে। কিন্তু পূর্বের আশ্রয়কেন্দ্রগুলো নারী ও শিশুদের জন্য অনিরাপদ উল্লেখ করে কয়রার বাসিন্দারা।
সম্প্রতি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর মোস্তাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত এক জরিপেও উঠে এসেছে অনিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রের চিত্র। ওই গবেষণায় বলা হয়, ‘দুর্যোগে একজন পুরুষের বিপরীতে চারজন নারীর মৃত্যু হয়। এ জন্য নারীর ক্ষমতায়নই পারে জীবনহানি ও সম্পদের ক্ষতি কমাতে।’
অবশ্য দাকোপের সুতারখালীতে নির্মাণাধীন আশ্রয়কেন্দ্রটি নতুন নকশা করে হচ্ছে বলে জানান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আসমত হোসেন।
কয়রার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুলি বিশ্বাস বলেন, ‘১১৭টি সরকারি কেন্দ্র ছাড়াও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দুর্যোগকালে মানুষ আশ্রয় নেয়। ওই উপজেলায় যেসব আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে তার ধারণ ক্ষমতা ৫০ হাজারের মতো। কিন্তু লোকসংখ্যা প্রায় দুই লাখ। যার মধ্যে একেবারেই দুর্যোগপ্রবণ এলাকার লোকসংখ্যা এক লাখের কাছাকাছি। সে ক্ষেত্রে ওই উপজেলায় আরো আশ্রয়কেন্দ্র প্রয়োজন বলেও স্থানীয় সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে দাবি তোলা হয়েছে।’
এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘উপকূলীয় উপজেলাগুলো থেকে তথ্য নিয়ে সরকারের কাছে প্রস্তাব দেওয়া হবে যাতে আধুনিক মানের আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়।’
জৈন্তাবার্তা / মনোয়ার




