ছবি নিজস্ব
হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার বিভিন্ন চা-বাগানে সোহাগা (বোরাক্স) মিশিয়ে তৈরি করা অবৈধ চোলাই বা চোয়ানি মদের বিস্তার উদ্বেগজনক আকার ধারণ করেছে। সস্তা নেশার এই মারাত্মক প্রবণতায় প্রতিনিয়ত অসুস্থ হয়ে পড়ছেন শ্রমিকরা। কেউ কেউ প্রাণও হারাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের মতে, দারিদ্র্যতা, সচেতনতার অভাব ও অপর্যাপ্ত নজরদারির কারণে চা-বাগান এলাকায় এটি এক নতুন সামাজিক সংকটে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার নোয়াপাড়া, সুরমা, জগদীশপুর, তেলিয়াপাড়া ও আরও কয়েকটি চা-বাগান এলাকায় গোপনে সোহাগা মিশ্রিত চোলাই মদ উৎপাদন ও বিক্রি হচ্ছে। অল্প দাম ও সহজলভ্য হওয়ায় অনেক শ্রমিক এই মদের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছেন।
নোয়াপাড়া চা-বাগানের শ্রমিক অরুণ সাঁওতাল বলেন, ২০ থেকে ৩০ টাকায় সোহাগা মিশ্রিত মদ পাওয়া যায়। এটি পান করলে দ্রæত নেশা হয়, তবে পরে শরীর খুব খারাপ লাগে। অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং কাজে যেতে পারেন না।
এক প্রবীণ নারী শ্রমিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বিষাক্ত মদ পানের কারণে অনেক শ্রমিক অকালেই মৃত্যুবরণ করছেন। তার ভাষায়, চা-বাগানে স্বামীহারা নারীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। অনেকের লিভার ও কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে শরীরে পানি জমে মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।
সুরমা চা-বাগানের সর্দার বাবুল বাক্তি বলেন, অবৈধভাবে উৎপাদিত চোলাই মদের কারণে শুধু শ্রমিকরাই নয়, আশপাশের বিভিন্ন এলাকার মানুষও মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছেন। তিনি বাগান এলাকায় অবৈধ মদ উৎপাদন ও বিক্রি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান।
মাধবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ইমরুল হাসান জাহাঙ্গীর বলেন, সোহাগা বা বোরাক্স কোনোভাবেই খাদ্য উপযোগী নয়। এটি শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত একটি রাসায়নিক পদার্থ। এটি মদের সঙ্গে মিশে শরীরে প্রবেশ করলে লিভার, কিডনি ও স্নায়ুতন্ত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে অল্প পরিমাণেও মৃত্যুঝুঁকি তৈরি হয়।
শ্রমিক নেতাদের দাবি, সচেতনতার অভাব ও হতাশা থেকে অনেক শ্রমিক সস্তা নেশার দিকে ঝুঁকছেন। সামাজিক চা শ্রমিক কল্যাণ সংঘের নেতা ফিলিপন মুর্মু বলেন, শ্রমিকদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান, বিনোদন ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত না করলে এই সমস্যা দূর করা সম্ভব নয়। সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি সামাজিক উদ্যোগও জরুরি।
জগদীশপুর চা-বাগান এলাকার ইউপি সদস্য সন্তোষ মুন্ডা বলেন, এটি এখন সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে। বেকারত্ব, দারিদ্র্য ও হতাশা মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ পথে ঠেলে দিচ্ছে।
মাধবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সোহেল রানা জানান, সম্প্রতি তেলিয়াপাড়া চা-বাগানসহ কয়েকটি স্থানে অভিযান চালিয়ে অবৈধ মদ জব্দ এবং কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে চক্রটি বারবার সক্রিয় হয়ে উঠছে। মাদক নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সহযোগিতা ও সচেতনতা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে চা-বাগান এলাকায় বিষাক্ত মদের কারণে অসুস্থতা ও মৃত্যুর ঘটনা আরও বাড়তে পারে।
জৈন্তাবার্তা/আরআর




