ছবি:সংগৃহীত
ঘন বর্ষার সন্ধ্যায় সিলেটে স্মরণ করা হলো ভাটি বাংলার শিল্পী-সংগ্রামী, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাংস্কৃতিক সংগঠক শ্রীকান্ত দাশকে। জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, শ্রীকান্ত দাশ কেবল একজন রাজনৈতিক কর্মী বা সংস্কৃতিকর্মী ছিলেন না; তিনি ছিলেন সংগ্রাম, মানবিকতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক উজ্জ্বল প্রতীক।
শুক্রবার (১০ জুলাই) সন্ধ্যায় নগরীর অভ্র সেন্টারে অভ্র প্রকাশন আয়োজিত ‘শ্রীকান্ত দাশ অবলোকন: সংগ্রাম-সংস্কৃতি ও মানবমুক্তি’ শীর্ষক আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে লেখক, গবেষক ও অনুবাদক মিহিরকান্তি চৌধুরী মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, শ্রীকান্ত দাশকে বুঝতে হলে প্রচলিত রাজনৈতিক ইতিহাসের গণ্ডির বাইরে গিয়ে সাধারণ মানুষের সংগ্রাম, কৃষক আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, গণসংস্কৃতি ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনের ধারার মধ্যে তাঁর জীবনকে মূল্যায়ন করতে হবে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বা পদ-পদবির মাধ্যমে নয়, মানুষের জন্য আজীবন নিরলস সাংগঠনিক কাজের মধ্য দিয়েই তিনি নিজের পরিচয় নির্মাণ করেছেন।
লেখক-গবেষক ড. আবুল ফতেহ ফাত্তাহর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সিলেট মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জহিরুল হক শাকিল।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, শ্রীকান্ত দাশ ছিলেন বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী। তিনি একাধারে রাজনৈতিক নেতা, শিল্পী, সাংস্কৃতিক সংগঠক ও মুক্তিযোদ্ধা। তাঁর উদ্যোগেই শাল্লায় উদীচীর কার্যক্রম শুরু হয়। আদর্শিক রাজনীতির কারণে জীবনের দীর্ঘ সময় আত্মগোপনে থাকলেও তিনি কখনো নীতিচ্যুত হননি।
তিনি আরও বলেন, শ্রীকান্ত দাশ তাঁর পরিবারকেও মানবিক ও প্রগতিশীল আদর্শে গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর স্ত্রী ছায়া রানী দাশও মৃত্যুর পর দেহদান করেছেন এবং তাঁর সন্তানরাও সেই মানবিক আদর্শ ধারণ করে চলছেন।
সভাপতির বক্তব্যে ড. আবুল ফতেহ ফাত্তাহ বলেন, শ্রীকান্ত দাশের জীবন ছিল ত্যাগ, মানবিকতা ও আদর্শের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। শিল্পী ও গীতিকার হিসেবেও তাঁর অবদান স্মরণীয়। সমাজ, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও মানবিক মূল্যবোধের অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছিল তাঁর জীবনে। তিনি আমাদের সমাজের এক বাতিঘর।
মুক্তিযুদ্ধ গবেষক অপূর্ব শর্মার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন আইডিয়ার নির্বাহী পরিচালক নাজমুল হক, অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ মনির উদ্দিন এবং শিক্ষক পার্থ সারথী দাশ।
এছাড়া কবি ও শিক্ষক রাজেশ কান্তি দাশ, আজমিরীগঞ্জ কলেজের শিক্ষক মানিক চৌধুরী, সিলেট জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আহমেদুর রশীদ চৌধুরী, লেখক ও অ্যাডভোকেট সুব্রত দাশ বক্তব্য রাখেন। পরিবারের পক্ষ থেকে স্মৃতিচারণ করেন শ্রীকান্ত দাশের ছেলে সুশান্ত দাশ ও নাতনি দীপা দাশ।
আলোচনা শেষে অনুষ্ঠিত সাংস্কৃতিক পর্বে সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী বিমান তালুকদার, বিমলেন্দু দাশ ও মুগ্ধ দাশ। কবিতা আবৃত্তি করেন প্রিয়ন্তী দাশ।
উল্লেখ্য, শ্রীকান্ত দাশ ২০০৯ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজে মৃত্যুর পর দেহদানকারী প্রথম ব্যক্তি এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র দেহদাতা হিসেবে পরিচিত। তবে বক্তারা বলেন, তাঁর প্রকৃত পরিচয় দেহদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; আজীবন মানুষের মুক্তি, সংস্কৃতি ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামই তাঁকে অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করেছে।
বিকল্প শিরোনাম
সংগ্রাম, সংস্কৃতি ও মানবিকতার প্রতীক শ্রীকান্ত দাশকে স্মরণ
জন্মজয়ন্তীতে শ্রীকান্ত দাশ: আদর্শ, সংগ্রাম ও মানবমুক্তির পাঠ
ভাটির শিল্পী-সংগ্রামী শ্রীকান্ত দাশকে স্মরণে আলোচনা ও সাংস্কৃতিক আয়োজন
‘শ্রীকান্ত দাশকে বুঝতে হলে মানুষের ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে’
জৈন্তা বার্তা/ ওয়াদুদ




