বারবার সড়ক দু*র্ঘটনা, কারণ জানা থাকলেও প্র*তিকার কোথায়?
শনিবার, ০৮ অগাস্ট ২০২৬, ০৯:১৪ PM

জুলাইয়ে সিলেটের সড়কে ঝ*রল ৩১ প্রা*ণ, নি*হ*তদের ১৩ জনই মোটরসাইকেল চালক-আরোহী

বারবার সড়ক দু*র্ঘটনা, কারণ জানা থাকলেও প্র*তিকার কোথায়?

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৮/০৮/২০২৬ ০৭:৩৬:৩৯ PM

বারবার সড়ক দু*র্ঘটনা, কারণ জানা থাকলেও প্র*তিকার কোথায়?

এআই দিয়ে করা


সিলেট বিভাগে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি যেন থামছেই না। এক মাসের ব্যবধানে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির সংখ্যা বেড়েছে। গত জুন মাসের তুলনায় জুলাইয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়েছে। শুধু জুলাই মাসেই সিলেট বিভাগের চার জেলায় ২৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩১ জন। আহত হয়েছেন আরও ৭৫ জন। নিহতদের মধ্যে ১৩ জনই মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহী।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত গতি, বেপরোয়া গাড়ি চালানো, নিয়ম না মেনে ওভারটেকিং, অদক্ষ চালক, মোটরসাইকেল চালক ও আরোহীদের মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার না করা, পথচারীদের অসচেতনতা এবং সড়কের নির্মাণগত ত্রুটি দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। এসব কারণ চিহ্নিত হলেও কার্যকর প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ায় একই ধরনের দুর্ঘটনা বারবার ঘটছে এবং অকালে ঝরে যাচ্ছে মানুষের প্রাণ।

শনিবার (৮ আগস্ট) নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) সিলেট বিভাগীয় কমিটি প্রকাশিত জুলাই মাসের সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই মাসে সিলেট জেলায় ১৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১৫ জন নিহত ও ১৭ জন আহত হয়েছেন। সুনামগঞ্জে ৪টি দুর্ঘটনায় ৪ জন নিহত ও ১৪ জন আহত, মৌলভীবাজারে ৪টি দুর্ঘটনায় ৪ জন নিহত ও ১২ জন আহত এবং হবিগঞ্জে ৫টি দুর্ঘটনায় ৮ জন নিহত ও ৩২ জন আহত হয়েছেন। চার জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে সিলেট জেলায়। আর আহতের সংখ্যায় এগিয়ে রয়েছে হবিগঞ্জ।

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনাই বড় উদ্বেগ

জুলাই মাসে সিলেট বিভাগে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের একটি বড় অংশ ছিলেন মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৯টি দুর্ঘটনায় ১৩ জন মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী নিহত হয়েছেন। অতিরিক্ত গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, হেলমেট না পরা কিংবা মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার না করা এবং প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার ঘাটতি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এ ছাড়া ৬টি দুর্ঘটনায় সিএনজি ও টমটমের চালক-আরোহীসহ ৬ জন, ৮টি দুর্ঘটনায় ৯ জন চালক এবং ৬টি দুর্ঘটনায় ৬ জন পথচারী নিহত হয়েছেন।

নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ও মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণহানি

দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণ করলেও সড়কে নিরাপত্তাহীনতার চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জুলাই মাসে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাড়ি উল্টে যাওয়ার ৫টি দুর্ঘটনায় ৬ জন নিহত হয়েছেন। মুখোমুখি সংঘর্ষের ৭টি দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ৮ জনের। এ ছাড়া গাছ ও বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে যানবাহনের ধাক্কায় ২টি দুর্ঘটনায় ৩ জন নিহত হয়েছেন।

এ ধরনের দুর্ঘটনার পেছনে অতিরিক্ত গতি, চালকের অসতর্কতা, সড়কের ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক, পর্যাপ্ত সড়কবাতির অভাব, যানবাহনের ফিটনেস ঘাটতি এবং সড়ক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও দায়ী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পুরুষের পাশাপাশি প্রাণ গেছে নারী ও শিশুর

জুলাই মাসে সিলেট বিভাগে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৩১ জনের মধ্যে ২৫ জন পুরুষ, ২ জন নারী ও ৪ জন শিশু রয়েছেন। প্রতিটি দুর্ঘটনার পেছনে একটি করে পরিবার স্বজন হারিয়েছে। কেউ হারিয়েছেন বাবা, কেউ সন্তান, কেউ স্বামী কিংবা পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে।

সড়ক দুর্ঘটনার পর আহতদের অনেকেই দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক ও আর্থিক সংকটে পড়েন। ফলে দুর্ঘটনার প্রকৃত ক্ষতি শুধু নিহতের সংখ্যায় সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব পড়ে পুরো পরিবার ও সমাজে।

জুনের তুলনায় জুলাইয়ে বেড়েছে প্রাণহানি

নিসচার তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে সিলেট বিভাগে ২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৯ জন নিহত ও ৩৬ জন আহত হয়েছিলেন। এক মাস পর জুলাইয়ে দুর্ঘটনার সংখ্যা কিছুটা কমে ২৮ হলেও নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১ জনে। একই সময়ে আহতের সংখ্যাও দ্বিগুণের বেশি বেড়ে ৭৫ জন হয়েছে।

অর্থাৎ দুর্ঘটনার সংখ্যা সামান্য কমলেও দুর্ঘটনাগুলো আরও প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে।

কারণ জানা থাকলেও প্রতিকার কোথায়?

প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনার পর অতিরিক্ত গতি, বেপরোয়া চালানো, অবৈধ ওভারটেকিং, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, চালকের অদক্ষতা, হেলমেট না পরা এবং সড়কের ত্রুটির কথা সামনে আসে। কিন্তু এসব কারণ প্রতিরোধে কার্যকর ও ধারাবাহিক ব্যবস্থা না থাকায় পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হচ্ছে না।

সড়কের ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করে দ্রুত সংস্কার, দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড ও সড়কবাতি স্থাপন, অতিরিক্ত গতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, নিয়ম না মেনে ওভারটেকিং বন্ধে নজরদারি, ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও অদক্ষ চালকদের বিরুদ্ধে অভিযান এবং মোটরসাইকেল চালক-আরোহীদের মানসম্মত হেলমেট ব্যবহারে কঠোরতা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে চালকদের প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধি, পথচারীদের নিরাপদে রাস্তা পারাপারের ব্যবস্থা, ফুটপাত ও পারাপারের স্থান নিশ্চিত করা এবং দুর্ঘটনার পর কারণ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।

শুধু দুর্ঘটনার পর ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সহায়তা কিংবা দায়সারা অভিযান চালিয়ে সড়কে প্রাণহানি বন্ধ করা সম্ভব নয়। দুর্ঘটনার কারণগুলো চিহ্নিত করে দুর্ঘটনা ঘটার আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। না হলে জুন-জুলাইয়ের মতো মাসে মাসে সড়কে প্রাণহানির সংখ্যা বাড়তেই থাকবে।

নিসচা কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক, সিলেট বিভাগীয় কমিটির সদস্য সচিব ও সিলেট জেলার আহ্বায়ক জহিরুল ইসলাম মিশু জানান, পাঁচটি স্থানীয় দৈনিক ও বিভিন্ন অনলাইন সংবাদমাধ্যমের তথ্য, দুটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদন, অনুমেয় অনুজ্জ্বল বা অপ্রকাশিত ঘটনা এবং নিসচার সিলেটের বিভিন্ন শাখার তথ্যের ভিত্তিতে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।

সড়ক নিরাপদ করতে এখন প্রয়োজন শুধু দুর্ঘটনার পর পরিসংখ্যান প্রকাশ নয়; বরং প্রতিটি দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করে দায় ও ঝুঁকি চিহ্নিত করা এবং দ্রুত কার্যকর প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়া। তবেই সিলেটের সড়কে অকাল মৃত্যুর মিছিল থামানো সম্ভব হবে।

জৈন্তা বার্তা/ ওয়াদুদ