সংগৃহীত
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বারে অবস্থিত বাব আল-মান্দেব প্রণালি এখন বৈশ্বিক কূটনীতি ও অর্থনীতির সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ইয়েমেনের ইরানসমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা সম্প্রতি লোহিত সাগর উপকূলে সামরিক অভিযান চালিয়ে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পেরিম বা মায়ুন দ্বীপ এবং এর আশপাশের এলাকা দখল করে নিয়েছে। এর ফলে এই সংকীর্ণ জলপথটি এখন পুরোপুরি বিদ্রোহীদের নাগালের মধ্যে চলে এসেছে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত বাব আল-মান্দেবকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার চলমান উত্তেজনার মাঝে হুথিদের এই হঠাৎ অগ্রগতি প্রমাণ করে, হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি এই জলপথটিকেও নিজেদের কৌশলগত লাভের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে ইরান এবং বাব আল-মান্দেব এখন ইরানের তুরুপের তাস হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।ইয়েমেনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রাভিযান এবং সৌদি আরবের ভেতরে একের পর এক হামলার ঘটনা পরিস্থিতিকে দ্রুত অবনতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সৌদি আরবের খামিস মুশাইত, আবহা এবং তায়েফ শহরের বেসামরিক ও সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হুথিরা ডজন ডজন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। সৌদি আরবের তিন শহরে হুথিদের এই ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ফলে ১৩ জন বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছেন এবং বেশ কিছু বাড়িঘর ও যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব হামলার জবাবে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনের বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র বিমান হামলা শুরু করেছে এবং মারিব ও তায়েজের পশ্চিমাঞ্চলে দুপক্ষের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলছে। এই সংঘাতের জেরেইয়েমেনে ইতোমধ্যেই প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার মানুষ ঘরছাড়া হয়েছেন, যাদের একটি বড়, অংশ নারী ও শিশু।জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রেও এই সংঘাত মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। গত সপ্তাহে একটি ড্রোন হামলায় সৌদি আরবে তেল পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় রিয়াদ এর কার্যক্রম স্থগিত করতে বাধ্য হয়। প্রতিদিন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল তেল বহনকারী এই পাইপলাইনটি হরমুজ প্রণালির বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন ইতোমধ্যেই মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে, আর ঠিক এমন এক সংকটময় মুহূর্তে এই পাইপলাইন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৭ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের শঙ্কা, এই পাইপলাইন দ্রুত সচল করা না গেলে বিশ্ববাজারে প্রায় ৪ শতাংশ তেল সরবরাহ স্থায়ীভাবে ব্যাহত হতে পারে।
এদিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেও পাল্টা হামলা অব্যাহত আছে। গতকাল মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালির কাছে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি এমকিউ-১ ড্রোন ধ্বংস করার দাবি করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। এক বিবৃতিতে জানানো হয়, হরমুজ প্রণালির পূর্বদিকে দেশটির সমন্বিত বিমান প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কের অংশ বিশেষ ব্যবহার করে ড্রোনটি ভূপাতিত করা হয়। এর আগে মঙ্গলবারই প্রণালির পশ্চিমদিকে আরেকটি এমকিউ-১ ড্রোন প্রতিহত করার কথা জানিয়েছিল আইআরজিসি। এমনকি এর আগের দিনও অনুরূপ আরেকটি ড্রোন ধ্বংস করার দাবি করেছিল ইরানের রাষ্ট্রীয় মাধ্যম।উদ্ভূত পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় আরব দেশগুলো ইরানের সঙ্গে তাদের পূর্বনির্ধারিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠক স্থগিত করেছে এবং সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সলমান জেদ্দায় মার্কিন সেন্টকম কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের সঙ্গে বৈঠক করে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেছেন।
এদিকে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক কূটনৈতিক অঙ্গনে নানা জটিল সমীকরণ দেখা যাচ্ছে। ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও হুথিদের মধ্যে এখনও যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে এবং বর্তমান সংঘাত প্রধানত সৌদি আরব ও ইয়েমেনের মাঝেই সীমাবদ্ধ।ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী তাদের সরকারকে হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি একক সামরিক পদক্ষেপ না নিয়ে বরং কূটনৈতিক উপায়ে এই সংকটের মোকাবিলার পরামর্শ দিয়েছে এবং হুথিদের ওপর হামলা না করার জন্য নেতানিয়াহুকে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী কঠোর বার্তা দিয়েছে।অন্যদিকে তেহরানের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও চাপ বন্ধ হওয়াসহ সুনির্দিষ্ট শর্তপূরণ না হলে ট্রাম্পের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা নয়। বৈশ্বিক এই সংকটকালে ইরানের ওপর আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপ বজায় রাখার অংশ হিসেবে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বেইজিং সফরে যাচ্ছেন।
এই বহুমুখী সংকটের মধ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনীও এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। মার্কিন সরকারের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে লিপ্ত থাকার ফলে মার্কিন সামরিক বাহিনী বর্তমানে গুরুতর অস্ত্র সংকট ও কৌশলগত সরঞ্জাম ঘাটতির মুখোমুখি হয়েছে। উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র এবং আকাশ প্রতিরক্ষার ইন্টারসেপ্টর বা আটকের অস্ত্রভাণ্ডার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে প্রতিরক্ষা ঠিকাদারদের অন্তত তিন বছর সময় লাগবে বলে ওই প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের হামলায় কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ইরাক, ওমান ও জর্ডানের মার্কিন ঘাঁটিতে শত শত স্থাপনা এবং বেশ কিছু ড্রোন ও বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।ফরাসি উদ্যোগে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ বাব আল-মান্দেবের পরিস্থিতি নিয়ে জরুরি বৈঠক আহ্বান করেছে এবং তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান উপসাগরীয় অঞ্চলে পারস্পরিক এই হামলাকে শান্তি প্রচেষ্টার জন্য ক্ষতিকর বলে অভিহিত করে অবিলম্বে তা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। সব মিলিয়ে, হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব এই দুই জলপথেই একযোগে তৈরি হওয়া নিরাপত্তা সংকট মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য পুরোপুরি বদলে দিয়েছে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিকে এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
জৈন্তাবার্তা/সুলতানা




