ছবি: নিজস্ব
কৃতি মানুষের পদাঙ্ক অনুসরণ করে কীর্তিমান হওয়া যায়। নিজদের স্বার্থে তাঁদেরকে স্মরণ করা, তাঁদের জীবনালেখ্য জনসম্মুখে প্রকাশ করা নৈতিকতার অন্তর্ভুক্ত। আমাদের দেশের ৬৮ হাজার গ্রামের প্রতিটি গ্রামেই তেমনি গুনীজনের জন্ম হয়েছে। তাঁরা হয়তো এখন পৃথিবীতে নেই কিন্তু তাঁদের রয়েছে উল্লেখ করার মতো কর্মজীবন। সেসব কর্মবীরদের স্মরণীয় করে রাখতে আমার এ প্রয়াস।
সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার আলীনগর ইউনিয়ন একটি রত্নগর্ভা ইউনিয়ন। এ ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে অনেক গুনীজন জন্মগ্রহণ করেছেন। তাঁদের মধ্যে আলীনগর গ্রামের সৈয়দ নবীব আলী হাকিম, নিজ মোহাম্মদপুর গ্রামের আজহার আলী চৌধুরী ডিআই, কাদিমলিক গ্রামের জালাল উদ্দীন চৌধুরী জজ, উত্তরভাগ গ্রামের মশরফ উল্লাহ হাকিম ও বিচারপতি আব্দুল্লাহ জাবিদ প্রমুখের নাম সর্বাগ্রে উল্লেখযোগ্য।
আমার আজকের আলোচ্য দুই গুনী ব্যক্তি হলেন উত্তরভাগ গ্রামের মরহুম মশরফ উল্লাহ হাকিম ও তদীয় পুত্র মরহুম বিচারপতি আব্দুল্লাহ জাবিদ।
মশরফ উল্লাহ হাকিমের পিতার নাম ছিল মো. হাজীর উল্লাহ। হাজীর উল্লাহ ছিলেন তিন পুত্র ও চার কন্যা সন্তানের জনক। প্রথম ছেলের নাম ইউছুফ উল্লাহ, দ্বিতীয় ছেলের নাম মশরফ উল্লাহ এবং তৃতীয় ছেলের নাম মশদ উল্লাহ। ইউছুফ উল্লাহ ছিলেন একজন সুফি ভাবাদর্শের মানুষ। তিনি সুফিবাদ চর্চা করে জীবন অতিবাহিত করেন। মশদ উল্লাহ ছিলেন খাদ্য বিভাগের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। অবিবাহিত অবস্থায় এক দুর্ঘটনায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
আমার আলোচ্য ব্যক্তি মশরফ উল্লাহ হাকিম লেখাপড়া শেষ করে ব্রিটিশ ভারতের সিভিল সার্ভিসে যোগদান করেন। কর্মজীবনে তিনি করিমগঞ্জ, শিলং, দার্জিলিং সহ বিভিন্ন জায়গায় দায়িত্ব পালন করেন। কর্মজীবনের শেষ পর্যায়ে পদোন্নতি পেয়ে তিনি জেলা কমিশনার হিসেবে বিভিন্ন জায়গায় দায়িত্ব পালন করে সগৌরবে অবসরে যান।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, অবসর জীবনে তিনি কলকাতা, ঢাকা ও সিলেটের দরগা মহল্লায় বসবাস করেন। শেষ বয়সে তিনি তাঁর পৈতৃক বাড়িতে অবস্থান করেন এবং এখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁকে সমাহিত করা হয় আলীনগর গ্রামের ধোপা দীঘির উত্তর পাশের পুরাতন পারিবারিক কবরস্থানে।
মশরফ উল্লাহ হাকিম জীবনসঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করেন লংলার জমিদার পরিবারের সন্তান আজম উল্লাহ এর সুশিক্ষিতা কন্যা সকিনা বিবিকে। তাঁদের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন এক গৌরাঙ্গ শিশু। নাম রাখা হয় আব্দুল্লাহ জাবিদ। আব্দুল্লাহ জাবিদও লেখাপড়া শেষ করে ব্রিটিশ ভারতের সিভিল সার্ভিসে যোগদান করেন।
আব্দুল্লাহ জাবিদ কর্মজীবনে বিভিন্ন জেলায় জেলা হাকিমের দায়িত্ব পালন করেন। দেশ বিভাগের পরে তিনি পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে যোগদান করে বিভিন্ন জেলার হাকিমের দায়িত্ব পালন করেন এবং পূর্বপাকিস্তানের প্রধান বিচারালয়ের বিচারপতি হিসেবে অধিষ্ঠিত হন। মুক্তিযুদ্ধ পূর্ববর্তী সময়ে তিনি অবসরে আসেন। আব্দুল্লাহ জাবিদ বিচারপতির পদ থেকে অবসর জীবনে এসে ঢাকা ও করাচী শহরে কিছুদিন বসবাস করেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে তাঁর সুসম্পর্ক ছিল। শেষ বয়সে সিলেট শহরের দরগা মহল্লায় তাঁর নিজ বাসায় বসবাস করেন এবং ১৯৮৪ সালে সেখানেই শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁকে সমাহিত করা হয় হযরত শাহজালাল (র.) এর মাজার গোরস্থানে।
দুঃখজনক বিষয় হলো, আমরা আমাদের কীর্তিমানদের বেমালুম ভুলে বসে আছি। অথচ, তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে, তাঁদেরকে স্মরণ করে আমরা আমাদের প্রজন্মকে উৎসাহিত করতে পারতাম। মুলত মরহুম
মশরফ উল্লা হাকিমের সাথে ছিল আমাদের পরিবারের আত্নীয়তার রক্তের সম্পর্ক। তিনি ছিলেন আমার পিতা মরহুম আব্দুল গণী মিয়ার শ্রদ্ধা ভাজন নানা। এবং বিচারপতি আবদুল্লাহ জাবেদ ছিলেন তিনির শ্রদ্ধা ভাজন মামা।
সবসময় পিতার নিকট হতে এবং দাদিমা মরহুমা সন্তরী বিবির নিকট হতে তাঁদের অমর স্মৃতি অবদান অবিস্মরণীয় কৃতি গুলোর গল্প কাহিনী শুনেছে এবং জেনেছি। তাই তাঁদের স্মৃতি নিয়ে অমর কৃতি গুলো নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করলাম। এই গুনী জন হলেন, এ জনপদের নতুন প্রজন্মের অহংকার, অনুপ্রেরণা। তাই ওদের স্মৃতি চির জাগ্রত চির অম্লান করে রাখার জন্য ওদের নামে নামকরণ করে রাস্তা স্কুল কলেজ প্রতিষ্ঠা করতে হবে বলে অভিজ্ঞ মহলের অভিমত।
মোহাম্মদ আনোয়ার হুসেইন,
লেখক : সাংবাদিক ,'উপলক্ষ' স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী গ্রন্থের সম্পাদক।
এস এইচ টি/




