ছবি:সংগৃহীত
মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার সার্বিক সমস্যা ও সম্ভাবনার চিত্র জাতীয় সংসদে তুলে ধরেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব শওকতুল ইসলাম শকু। গত রোববার (২৯ মার্চ) ও সোমবার (৩০ মার্চ) সংসদ অধিবেশনে তিনি এ বিষয়ে বক্তব্য দেন।
প্রথম বক্তব্যের শুরুতে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালকে ধন্যবাদ জানিয়ে মহান স্রষ্টার প্রতি শুকরিয়া এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ মৌলভীবাজার-২ আসনের সর্বস্তরের জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি। এরপর অন্য কোনো প্রসঙ্গ না টেনে কুলাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নানাবিধ সমস্যা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ‘ইমার্জেন্সি বিভাগে গিয়ে দেখি ‘ইমার্জেন্সি’ শব্দটাই বেমানান। নেই টেকনিশিয়ান, নেই পর্যাপ্ত নার্স, নেই গাইনী বিশেষজ্ঞ, নেই ইসিজি ও এক্স-রে মেশিন-সব মিলিয়ে শুধু ‘নেই’ আর ‘নেই’।’ হাসপাতালের শয্যা বৃদ্ধি ও আধুনিকায়নের দাবি জানান তিনি। তার এ বক্তব্য বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করে।
পরদিন রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি কুলাউড়ার প্রায় ১০টি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা ও সম্ভাবনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, প্রায় ৫৪৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই উপজেলায় ১৩টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের বসবাস। মুসলিম, হিন্দু, খ্রিস্টান, মণিপুরী ও খাসিয়াসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষের সহাবস্থানে কুলাউড়া সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য উদাহরণ।
প্রাকৃতিক সম্পদের দিক থেকে সমৃদ্ধ হলেও কুলাউড়া দীর্ঘদিন অবহেলার শিকার বলে উল্লেখ করেন তিনি। বরমচালে তেল-গ্যাসসহ খনিজ সম্পদের সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন।
হাকালুকি হাওর নিয়ে প্রস্তাব
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ মিঠাপানির জলাভূমি হাকালুকি হাওর সংরক্ষণ ও উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, এটি আন্তর্জাতিক মানের ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে সমন্বিত মহাপরিকল্পনা প্রয়োজন। দখল, দূষণ ও অতিরিক্ত মৎস্য আহরণে হাওরের জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে বলেও জানান তিনি।
চা শ্রমিক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী
চা শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার অধিকার নিশ্চিতের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, মণিপুরী ও খাসিয়া জনগোষ্ঠীর ভূমি অধিকার ও সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
স্বাস্থ্য ও পানীয় জল সংকট
তিনি উল্লেখ করেন, কুলাউড়ার অর্ধেকের বেশি পরিবার নিরাপদ পানীয় জল থেকে বঞ্চিত। প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের জন্য উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে উন্নীত করার দাবি জানান।
যোগাযোগ ও অবকাঠামো
কুলাউড়া রেলওয়ে জংশনের জরাজীর্ণ অবস্থা তুলে ধরে তিনি বলেন, রেললাইন, সড়ক ও সেতুর দুরবস্থা উন্নয়নের বড় বাধা। সম্প্রতি ট্রেনের বগি বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনাও এ অবকাঠামোর দুর্বলতার প্রমাণ। জংশনের আধুনিকায়ন ও সড়ক নেটওয়ার্ক উন্নয়নে বিশেষ বরাদ্দের দাবি জানান তিনি।
শিক্ষা ও কর্মসংস্থান
কুলাউড়ার শিক্ষার হার ৫১.৯ শতাংশ উল্লেখ করে তিনি বলেন, মানসম্মত শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে শিল্পায়নের বিকল্প নেই। তেল-গ্যাস ও খনিজ সম্পদ কাজে লাগিয়ে শিল্প স্থাপন করলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব।
বক্তব্যের একপর্যায়ে তিনি বলেন, ‘কুলাউড়ার মানুষ অনেক দিন ধরে অবহেলিত। এবার তাদের প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিত করার সময় এসেছে। বাংলাদেশ নতুনভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, এই অগ্রযাত্রা কেউ থামাতে পারবে না।’
এমপির বক্তব্যে সন্তোষ প্রকাশ করে আইনজীবী অ্যাডভোকেট এবাদুর রহমান শামীম বলেন, তিনি সরাসরি বাস্তব সমস্যাগুলো তুলে ধরেছেন, যা আশাব্যঞ্জক।
যুক্তরাজ্য বিএনপি নেতা শরীফুজ্জামান চৌধুরী তপনও তার বক্তব্যের প্রশংসা করে উন্নয়নে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
উল্লেখ্য, নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী কুলাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১০০ শয্যায় উন্নীতকরণ, চিকিৎসক-নার্স নিয়োগ, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম চালু, চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন এবং হাকালুকি হাওরসহ পর্যটন সম্ভাবনা কাজে লাগানোর প্রতিশ্রুতি দেন এমপি শওকতুল ইসলাম শকু। সংসদে প্রথম বক্তব্যেই এসব বিষয় তুলে ধরে তিনি ইতোমধ্যে ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেছেন।
জৈন্তা বার্তা/ ওয়াদুদ




