জৈন্তা বার্তা
মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার প্রান্তিক এলাকার দরিদ্র মানুষের প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন ইউনিয়নে নির্মাণ করা হয়েছে ২১টি কমিউনিটি ক্লিনিক (সিসি)। এর মধ্যে অন্তত তিনটি কমিউনিটি ক্লিনিকের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। জরাজীর্ণ এসব ভবনের দেয়াল, মেঝে ও ছাদে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। যেকোনো সময় ভবন ধসে পড়ে মারাত্মক দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে।
বনজঙ্গল, আগাছা, ঘাস ও শ্যাওলায় ঢেকে থাকা এসব ভবন দেখলে মনে হয় পরিত্যক্ত কোনো গোয়ালঘর। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডাররা (সিএইচসিপি)। অন্যদিকে দক্ষিণভাগ দক্ষিণ ইউনিয়নের সাবেক ২ নম্বর ওয়ার্ডের হরিপুর কমিউনিটি ক্লিনিকে প্রায় দুই বছর ধরে তালা ঝুলছে। ফলে সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষ চিকিৎসাসেবা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
এদিকে উপজেলার বিভিন্ন কমিউনিটি ক্লিনিকে রোগীদের চাহিদা অনুযায়ী ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। নির্ধারিত টার্মে প্রয়োজনের তুলনায় অর্ধেকেরও কম ওষুধ সরবরাহ পাওয়ায় সেবা নিতে আসা মানুষের তোপের মুখে পড়তে হচ্ছে সিএইচসিপিদের।
পূর্ব-হাতলিয়া কমিউনিটি ক্লিনিক
সরেজমিনে দক্ষিণভাগ দক্ষিণ ইউনিয়নের সাবেক ১ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব-হাতলিয়া কমিউনিটি ক্লিনিকে গিয়ে দেখা যায়, ২০০১ সালে নির্মিত ভবনটির পূর্বদিকের একাংশ দেবে গেছে। মূল ভবন, বারান্দা ও ভেতরের দেয়ালে দেখা দিয়েছে বড় বড় ফাটল। অনেক জায়গায় পলেস্তারা উঠে গেছে। ছাদও ধসে পড়ার উপক্রম।
দুর্ঘটনার আশঙ্কা নিয়ে কয়েক বছর ধরে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেই দায়িত্ব পালন করছেন সিএইচসিপি সাজু দেব। তিনি বলেন, প্রতিদিনই দেয়াল ধসে দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কায় ভীত থাকতে হয়। বিশাল এলাকার একমাত্র কমিউনিটি ক্লিনিক হওয়ায় এখানে ওষুধের চাহিদাও ব্যাপক। কিন্তু পর্যাপ্ত ওষুধ না থাকায় সবাইকে চাহিদামতো ওষুধ দেওয়া সম্ভব হয় না।
সাজু দেব জানান, কখনও তিন মাস, আবার কখনও চার-পাঁচ মাস পর ২২ ধরনের ওষুধ মিলিয়ে এক কার্টন ওষুধ সরবরাহ করা হয়। ওই ওষুধ দিয়ে এক থেকে দেড় মাসও চালানো যায় না। বাকি সময়ে ওষুধ দিতে না পারায় স্থানীয়দের দেন-দরবার ও নানা প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। এমনকি কেউ কেউ তাকে ‘ওষুধ চোর’ বলেও মন্তব্য করেন বলে জানান তিনি।
দুই বছরেও খোলেনি হরিপুর ক্লিনিক
একই ইউনিয়নের হরিপুর কমিউনিটি ক্লিনিকে গিয়ে দেখা যায়, ক্লিনিকের প্রধান ফটকে তালা ঝুলছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ২০২০ সালে ক্লিনিকটি নির্মাণ করা হলেও প্রায় দুই বছর ধরে এটি খোলা হয়নি। ফলে কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভবনটি এলাকাবাসীর কোনো কাজে আসছে না।
অহিরকুঞ্জি ক্লিনিকও ঝুঁকিপূর্ণ
উপজেলার দাসেরবাজার ইউনিয়নের অহিরকুঞ্জি কমিউনিটি ক্লিনিকের অবস্থাও নাজুক। অনেক আগেই ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। ছাদ চুইয়ে বৃষ্টির পানি পড়ে। কয়েক বছর আগেই দেয়াল ও ছাদের পলেস্তারা খসে পড়েছে। আগাছা, ঘাস ও শ্যাওলায় ভবনের দেয়াল ও ছাদ বিবর্ণ হয়ে গেছে। ভবনটি কখন ভেঙে পড়ে—এ আশঙ্কায় দায়িত্ব পালন করছেন সিএইচসিপি।
ক্লিনিকটির অবস্থা দেখে মনে হয়, এটি যেন পরিত্যক্ত কোনো গোয়ালঘর। ভবনটি ঠিক কবে থেকে ঝুঁকিপূর্ণ বা ড্যামেজ হয়েছে, তা নিশ্চিত করে বলতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা।
চিকিৎসা ও ওষুধ নিতে আসা স্থানীয় বাসিন্দা স্বপন বিশ্বাস, মায়ারানী বিশ্বাস, সুলতা রানী বিশ্বাস, মিন্টু বিশ্বাস, অনিবাস বিশ্বাস ও কল্পনা বিশ্বাস অভিযোগ করেন, তারা প্রায়ই চিকিৎসা নিতে এসে চাহিদা অনুযায়ী ওষুধ পান না। অনেক সময় সিএইচসিপি সঞ্চিতা রানী বিশ্বাসও প্রয়োজনীয় ওষুধ পান না বলে তারা জানান। তাদের অভিযোগ, মাঝেমধ্যে সিএইচসিপি সকাল ১১টা থেকে ১২টার দিকে ক্লিনিকে আসেন।
তবে সিএইচসিপি সঞ্চিতা রানী বিশ্বাস বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি সবসময় আতঙ্কে থাকেন। কখন ভবন ভেঙে পড়ে দুর্ঘটনা ঘটে, সেই আশঙ্কায় থাকতে হয়। ক্লিনিকের দরজা-জানালাও অনেক আগেই ভেঙে গেছে।
তিনি বলেন, ওষুধের সরবরাহ কম থাকায় সবসময় রোগীদের চাহিদা অনুযায়ী ওষুধ দেওয়া সম্ভব হয় না। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে আগে ২২ ধরনের তিন কার্টন ওষুধ দেওয়া হতো। গত দুই টার্ম ধরে মাত্র এক কার্টন ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। ফলে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত রোগীদের ওষুধ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।
নতুন ভবনের জন্য চিঠি
বড়লেখা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ফেরদৌস আক্তার বলেন, হরিপুর কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি মামলা-সংক্রান্ত জটিলতায় সাময়িক বরখাস্ত থাকায় ওই ক্লিনিকটি নিয়মিত খোলা রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি বলেন, অধিদপ্তর থেকে চাহিদা অনুযায়ী ওষুধ সরবরাহ না থাকায় কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
ডা. ফেরদৌস আক্তার আরও জানান, অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অহিরকুঞ্জি, পূর্ব-হাতলিয়া ও সুজাউল কমিউনিটি ক্লিনিকের পুরোনো ভবন ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণের জন্য স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে অনেক আগেই চিঠি পাঠানো হয়েছে।
জৈন্তা বার্তা / ওয়াদুদ




