অন্ধকার জয় করে আলো ছড়াচ্ছেন সমিরঞ্জন বিশ্বাস, শিক্ষার্থী থেকে ব্রেইল শিক্ষক
শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:০৭ PM

অন্ধকার জয় করে আলো ছড়াচ্ছেন সমিরঞ্জন বিশ্বাস, শিক্ষার্থী থেকে ব্রেইল শিক্ষক

জৈন্তা বার্তা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৪/০৪/২০২৬ ১০:২৪:৫৮ PM

অন্ধকার জয় করে আলো ছড়াচ্ছেন সমিরঞ্জন বিশ্বাস, শিক্ষার্থী থেকে ব্রেইল শিক্ষক

ছবি:সংগৃহীত


দৃষ্টি নেই, তবুও থেমে নেই পথচলা-অদম্য ইচ্ছাশক্তি, সাহস ও পরিশ্রমের মাধ্যমে জীবনের প্রতিকূলতাকে জয় করে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন সিলেটের দৃষ্টি প্রতিবন্ধী তরুণ সমিরঞ্জন বিশ্বাস। একসময় যে প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন, আজ সেই প্রতিষ্ঠানেই ব্রেইল শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়ে তিনি নতুন ইতিহাস গড়েছেন।

সিলেট নগরের জিন্দাবাজারে অবস্থিত গ্রীণ ডিসএ্যাবল্ড ফাউন্ডেশন (জিডিএফ) পরিচালিত জিডিএফ ডিকেফ দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ে গত ১ এপ্রিল থেকে ব্রেইল শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সমিরঞ্জন। শিক্ষার্থী থেকে শিক্ষক হওয়ার এই অর্জন তাকে যেমন গর্বিত করেছে, তেমনি অনুপ্রাণিত করেছে অন্যদেরও।

দরিদ্র পরিবারের ছয় ভাই-বোনের মধ্যে দ্বিতীয় সন্তান সমিরঞ্জন জন্ম থেকেই দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। পিতা সুবল বিশ্বাস ও মাতা ললিতা রানী বিশ্বাসের এই সন্তান শৈশব থেকেই নানা প্রতিকূলতার মধ্যে বেড়ে ওঠেন। এলাকায় উপযুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না থাকায় প্রথমে তার শিক্ষাজীবন থমকে ছিল। পরে সুনামগঞ্জ বার্ড চক্ষু হাসপাতালের মাধ্যমে তার পরিবার জিডিএফ-এর সন্ধান পায় এবং সেখানে তিনি আবাসিক সুবিধাসহ পড়াশোনার সুযোগ পান।

এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা, জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরামের সভাপতি মরহুম রজব আলী খান নজীবের অবদান সমিরঞ্জনের জীবনে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। নিজেও দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হওয়া সত্ত্বেও তিনি অসংখ্য দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশুর শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে নিরলসভাবে কাজ করেছেন। তারই হাতে গড়া এই প্রতিষ্ঠান থেকেই সমিরঞ্জনের শিক্ষা ও বিকাশের ভিত্তি তৈরি হয়।

২০০৬ সালে জিডিএফ-এ ভর্তি হয়ে সমিরঞ্জন নিয়মিত পড়াশোনার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও অংশগ্রহণ করেন। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হওয়ায় তিনি শ্রুতি লেখকের সহায়তায় পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ধারাবাহিকভাবে উত্তীর্ণ হন-২০১০ সালে পিএসসি, ২০১৩ সালে জেএসসি (জিপিএ ৩.১৯), ২০১৬ সালে এসএসসি (জিপিএ ৩.০৬) এবং ২০১৮ সালে এইচএসসি (জিপিএ ৩.০০)। পরবর্তীতে তিনি সিলেটের সরকারি মদন মোহন কলেজ থেকে ২০২২ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।

শিক্ষাজীবন শেষে চাকরির জন্য বিভিন্ন স্থানে চেষ্টা করেও দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হওয়ার কারণে তিনি সফল হননি। তবে হতাশ না হয়ে তিনি আবার জিডিএফ-এ ফিরে এসে দক্ষতা উন্নয়নের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এদিকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ বেতারের লোকসংগীত বিভাগে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শিল্পী হিসেবেও স্বীকৃতি অর্জন করেন।

পরবর্তীতে জিডিএফ-এর মহাসচিব ও নির্বাহী পরিচালক বায়জিদ খানের উদ্যোগে বিভিন্ন প্রচেষ্টা চালিয়েও চাকরির ব্যবস্থা না হওয়ায়, শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তে সমিরঞ্জন বিশ্বাসকে ব্রেইল শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

নিজ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পেয়ে সমিরঞ্জন বিশ্বাস জানান, তার মতো দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা যাতে পিছিয়ে না পড়ে, সেজন্য তিনি তাদের পাশে থেকে কাজ করতে চান। অর্জিত জ্ঞান ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়াই তার লক্ষ্য।

সমিরঞ্জনের এই সাফল্যে গ্রীণ ডিসএ্যাবল্ড ফাউন্ডেশন (জিডিএফ) কর্তৃপক্ষ, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট সবাই সন্তোষ প্রকাশ করেছেন এবং তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করেছেন।

উল্লেখ্য, তার এই অনুপ্রেরণামূলক গল্পটি লিখেছেন জিডিএফ-এর কম্পিউটার অপারেটর তাজকিরা জান্নাত সুইটি।

জৈন্তা বার্তা/ ওয়াদুদ