ছবি:সংগৃহীত
আব্দুল ওয়াদুদ:
মেঘলা সন্ধ্যা। বাইরে ছিল শরতের নরম আবহ। আর ভেতরে দর্শকে কানায় কানায় পূর্ণ কবি কাজী নজরুল অডিটোরিয়াম। মঞ্চে এক প্রান্তিক মানুষের গল্প-অধিকার হারানোর গল্প, শোষণের গল্প, প্রতিবাদের গল্প এবং শেষ পর্যন্ত মানুষকে ভেঙে ফেলার এক নির্মম প্রক্রিয়ার গল্প। অপু শহীদের রচনা ও ফয়েজ জহিরের নির্দেশনায় কথাকলি সিলেটের নতুন নাটক ‘কিংবদন্তীর কথা’ মঞ্চায়নের মধ্য দিয়ে শুক্রবার সন্ধ্যায় এমনই এক আবহ তৈরি হয় সিলেটের নাট্যাঙ্গনে।
নাটকজুড়ে দর্শককে ভাবিয়েছে একজন অধিকারহীন মানুষের জীবন ও তার ওপর রাষ্ট্র-সমাজের নিয়ন্ত্রণের চিত্র। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র একজন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ। তাকে বেঁধে আদালতে আনা হয়েছে। তার ঘর নেই, বাড়ি নেই, বাপ-দাদার নামে কোনো মৌজায় জমি নেই। এমনকি তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগও নেই।
তার অপরাধ-সে সমাজের প্রচলিত অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। পাহাড়, নদী, গাছপালা ও প্রকৃতির সান্নিধ্যে নিজের মতো করে বেঁচে থাকতে চেয়েছিল। যে প্রকৃতি একসময় তার অধিকার ছিল, সময়ের সঙ্গে রাষ্ট্র ও সমাজ সেই অধিকারও কেড়ে নিয়েছে। শোষণ ও বঞ্চনার একপর্যায়ে সে সমাজপতির বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আর সেই প্রতিবাদই হয়ে ওঠে তার অপরাধ।
গরাদের ভেতরে আটকে রেখে তাকে বশে আনার চেষ্টা চলে। শুরুতে তার মধ্যে থাকে প্রবল তেজ। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সে প্রতিবাদ করে, মাথা নত করতে চায় না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে ক্ষুধা, ভয় ও নির্যাতনের কাছে তার সেই প্রতিরোধ ক্রমেই দুর্বল হতে থাকে।
নাটকের সবচেয়ে তীব্র মুহূর্ত তৈরি হয় প্রশিক্ষণের নামে একজন তেজী মানুষকে ধীরে ধীরে ভেঙে ফেলার দৃশ্যগুলোতে। একসময় যে মানুষটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তাকেই নতজানু করে পায়ের কাছে ফেলে দেওয়া হয়। শরীরের মুক্তি এলেও তখন তার ভেতরের স্বাধীন মানুষটি যেন আর বেঁচে থাকে না।
শেষ পর্যন্ত তাকে মুক্ত করে দেওয়া হয়। কিন্তু ততক্ষণে তার প্রতিবাদী সত্তা, আত্মমর্যাদা ও মুক্ত মানুষ হিসেবে নিজেকে ভাবার ক্ষমতা প্রায় নিঃশেষ হয়ে গেছে। নাটকটি তাই শুধু একজন মানুষের গল্প নয়; বরং অধিকার কেড়ে নেওয়া, শোষণ, ক্ষমতার দাপট এবং মানুষের স্বাধীন সত্তাকে ধ্বংস করে দেওয়ার এক প্রতীকী আখ্যান।
নাটকের এই গভীর ও প্রতীকী বক্তব্যের পাশাপাশি অভিনেতাদের অভিনয়ও দর্শকদের মুগ্ধ করে। চরিত্রের আবেগ, ক্ষোভ, অসহায়ত্ব ও প্রতিরোধকে অভিনয়ের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলতে শিল্পীদের আন্তরিক প্রচেষ্টা ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় চরিত্রের মানসিক পরিবর্তন ও ভেতরের ভাঙন দর্শকদের মধ্যে গভীর ছাপ ফেলে।
‘কিংবদন্তীর কথা’য় অভিনয় করেছেন সাইমা শহীদ, আমিরুল ইসলাম সুমন, হাবিবা ফেরদৌস বিন্তু, আব্দুল বাসিত সাদাফ, আব্দুল মালিক, রকি দাস, সুজন আচার্য্য ও নীলাঞ্জন দাস টুকু।
নাটকের প্রদর্শনী দেখতে সন্ধ্যার আগেই অডিটোরিয়ামে দর্শকদের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। মেঘলা আবহের মধ্যেও নাট্যপ্রেমীদের ভিড়ে মুখর হয়ে ওঠে প্রাঙ্গণ। প্রদর্শনী শুরু হলে পূর্ণ মিলনায়তনে দর্শকদের গভীর মনোযোগে তৈরি হয় অন্যরকম পরিবেশ। নাটকের বিভিন্ন দৃশ্যে দর্শকদের প্রতিক্রিয়া ও করতালিতে বারবার মুখর হয়ে ওঠে অডিটোরিয়াম।
তবে নাটক দেখে মুগ্ধতার পাশাপাশি অডিটোরিয়ামের অব্যবস্থাপনা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন দর্শক ও নাট্যকর্মীরা। বিশেষ করে প্রদর্শনীর সময় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (এসি) নষ্ট থাকায় ভ্যাপসা গরমে দর্শকদের কষ্ট করে নাটক দেখতে হয়েছে।
নাট্যকর্মী প্রলয় বলেন, ‘ডিসি আসেন, ডিসি যান। সুন্দর সুন্দর কথা বলেন, প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ছোটান। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। এটা নাটক ও সংস্কৃতির প্রতি বৈষম্য ছাড়া আর কিছু নয়।’
তিনি বলেন, ‘নাট্য সংগঠন ও নাট্যকর্মীরা নাটকের প্রতি আনুগত্য ও দায়বোধ থেকেই সীমাহীন অব্যবস্থাপনার মধ্যেও নাটক মঞ্চায়ন করেন।’
নাটক শেষে মঞ্চেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন কথাকলি সিলেটের সাবেক সভাপতি সামসুল বাসিত শেরো। নাটকের দৃশ্যের সঙ্গে অডিটোরিয়ামের বাস্তব পরিস্থিতির একটি প্রতীকী মিল তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এই নাটকে গরাদের ভেতরে আটকে রেখে যেভাবে একজন মানুষকে বশে আনার চেষ্টা করা হয়েছে, সিলেটের নাট্যকর্মীদেরও এভাবে সমস্যার বেড়াজাল দিয়ে বশে আনার চেষ্টা করছে প্রশাসন।’
তিনি আরও বলেন, ‘গত দুই বছর ধরে বেহাল অবস্থায় থাকা এই অডিটোরিয়ামটির দিকে নজর নেই কারও।’
নাট্যকর্মী মঞ্জুর আহমদ বলেন, ‘ডিসি সারওয়ার আলম থাকাকালে তিনি বলেছিলেন, কাজী নজরুল অডিটোরিয়ামের উন্নয়নে বরাদ্দ পাওয়া গেছে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত সেই বরাদ্দ কোনো কাজে লাগেনি।’
অডিটোরিয়ামে প্রায় ৪০ মিনিট গরম সহ্য করে নাটক দেখার পর ছেলেকে নিয়ে চেয়ার ছেড়ে বাইরে যাওয়ার সময় ক্ষোভ প্রকাশ করেন এক নারী দর্শক। তিনি বলেন, ‘এই হলে নাটক হয় কীভাবে? এটাকি হল, না গরুর খোঁয়াড়?’
দর্শক ও নাট্যকর্মীদের অভিযোগ, নাট্যচর্চার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই মিলনায়তনে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সমস্যা থাকলেও সেগুলোর স্থায়ী সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। ফলে শিল্পী ও দর্শক উভয়কেই ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
তাদের একটাই দাবি-কাজী নজরুল অডিটোরিয়ামকে আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা সংবলিত করে দ্রুত সংস্কার করতে হবে। শুধু এসি বা লাইট নয়, দর্শক ও শিল্পীদের জন্য নিরাপদ, আরামদায়ক ও উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে সিলেটের নাট্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে কাজ করে আসছে কথাকলি সিলেট। ১৩৯১ বঙ্গাব্দের পহেলা বৈশাখে যাত্রা শুরু করা সংগঠনটি দীর্ঘ পথচলায় নিয়মিত মঞ্চনাটক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। সিলেটের মঞ্চনাটকে নিয়মিত প্রযোজনা ও প্রদর্শনীর ধারাবাহিকতা ধরে রাখার ক্ষেত্রেও সংগঠনটির রয়েছে দীর্ঘদিনের ভূমিকা।
অপু শহীদের রচনা ও ফয়েজ জহিরের নির্দেশনায় ‘কিংবদন্তীর কথা’ সেই ধারাবাহিকতায় নতুন সংযোজন। নাটকটির গল্প, মঞ্চায়ন ও শিল্পীদের অভিনয় মিলিয়ে এটি দর্শকদের জন্য হয়ে ওঠে ভাবনার এক ভিন্ন জগৎ।
কথাকলি সিলেটের সভাপতি নীলাঞ্জন দাস টুকু ও সাধারণ সম্পাদক আমিরুল ইসলাম সুমন প্রদর্শনীতে উপস্থিত থেকে নাট্যপ্রেমী দর্শকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, দর্শকদের এমন স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি সিলেটের মঞ্চনাটকের প্রতি মানুষের আগ্রহেরই বহিঃপ্রকাশ।
সব মিলিয়ে, মেঘলা সন্ধ্যায় কানায় কানায় পূর্ণ কবি কাজী নজরুল অডিটোরিয়ামে ‘কিংবদন্তীর কথা’ দর্শকদের মুগ্ধ করলেও নাটক শেষে সামনে এসেছে একটি পুরোনো প্রশ্ন-সিলেটের মঞ্চনাটক ও সংস্কৃতিচর্চার জন্য ব্যবহৃত এই গুরুত্বপূর্ণ মিলনায়তনটি কবে পাবে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা?
জৈন্তা বার্তা/ ওয়াদুদ




