৪৮ কোটি টাকার সংস্কার তিন বছরেই বেহাল
রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:২৫ PM

জগন্নাথপুর-বিশ্বনাথ সড়ক

৪৮ কোটি টাকার সংস্কার তিন বছরেই বেহাল

রেজুওয়ান কোরেশী, জগন্নাথপুর প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২০/০৯/২০২৬ ০৩:০০:৩৪ PM

৪৮ কোটি টাকার সংস্কার তিন বছরেই বেহাল

ছবি নিজস্ব


সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর ও সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার সাথে বিভাগীয় শহর সিলেট ও রাজধানী ঢাকার সড়কপথে যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ‘জগন্নাথপুর-বিশ্বনাথ-রশিদপুর আঞ্চলিক সড়ক’। তবে জনগুরুত্বপূর্ণ এই সড়কে সংস্কার কাজের নামে অনিয়ম ও সরকারি অর্থ লুটপাট যেন থামছেই না। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২৬ কিলোমিটার সড়কটির আধুনিকায়ন ও টেকসই উন্নয়নের জন্য অতীতের সকল রেকর্ড ভেঙে ৪৮ কোটি টাকার মেগা বরাদ্দ দেওয়া হলেও মাত্র ৩ বছরের মাথায় সড়কটিতে আবারও করুণ অবস্থা দেখা দিয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সড়কটি যেন সরকারি অর্থ লুটপাটের এক নিরাপদ স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। জনগুরুত্বপূর্ণ ২৯ কিলোমিটার এই সড়কের এই ২৬ কিলোমিটার সড়কের বর্তমান অবস্থা দেখলেই গা শিউরে ওঠে। দেখে বোঝার উপায় নেই ৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে মাত্র ৩ বছর আগে এই সড়ক সংস্কার করা হয়েছে। টেকসই সংস্কারের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ লুটপাটের অভিযোগ তুলেছেন ক্ষুব্ধ বাসিন্দারা।

স্থানীয় এলজিইডি ও এলাকাবাসী ‍সূত্রে জানা গেছে, সড়কের জগন্নাথপুর উপজেলা সদরের পৌর পয়েন্টের সামন থেকে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের রশিদপুর পর্যন্ত দূরত্ব ২৯ কিলোমিটার। জগন্নাথপুর ও বিশ্বনাথ উপজেলা অংশের দূরত্ব ২৬ কিলোমিটার। বিশ্বনাথের জিসি পয়েন্ট থেকে রশিদপুর পর্যন্ত ৩ কিলোমিটার ৭০০ মিটার সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের আওতাধীন। দীর্ঘদিন ধরে সড়কের এলজিইডির আওতাধীন অংশে জগন্নাথপুরের ১৩ কিলোমিটার ও বিশ্বনাথ উপজেলা অংশের ১৩ কিলোমিটাড়ে গর্ত আর খানা-খন্দের কারণে দুর্ভোগের অন্ত নেই।

অভিযোগ রয়েছে, জগন্নাথপুর অংশ সংস্কার হলে বিশ্বনাথ অংশ ভাঙাচোরা থাকে, আবার বিশ্বনাথ উপজেলা অংশ ভালো থাকলে জগন্নাথপুর অংশ ভেঙে যায়। এসব দুর্ভোগ থেকে রেহাই পেতে ২০১৮ সালে দুই উপজেলাবাসীর দাবি তোলেন সড়কটি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে স্থানান্তর করে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরে হস্তান্তরের। এই দাবির প্রেক্ষিতে তৎকালীন সুনামগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান উদ্যাগ গ্রহণ করলে এলজিইডির তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী তাঁর সঙ্গে দেখা করে দুই উপজেলার অংশের কাজ মানসম্মত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সড়কটি এলজিইডির আওতাধীন রাখার অনুরোধ করেন। যার প্রেক্ষিতে অতীতের সংস্কার বরাদ্দের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করে তৎকালীন সংসদ সদস্য ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নানের সুপারিশে ২০ শতাংশ অতিরিক্ত দরে ২৬ কিলোমিটার অংশের সংস্কারের জন্য ৪৮ কোটি ৫৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়ে টেন্ডার করা হয়। এর আগে ২০১৭ সালে সড়কের জগন্নাথপুর উপজেলা অংশে ১৩ কিলোমিটারের সংস্কারে বরাদ্দ ছিল দুই কোটি ২৬ লাখ টাকা।

২০১৯ সালে ৪৮ কোটি টাকা বরাদ্দের মধ্যে জগন্নাথপুর উপজেলার ১৩ কিলোমিটারের জন্য ২৫ কোটি ৮ লাখ ৩৬ হাজার টাকায় কাজ পান মাদারীপুরের ঠিকাদার হামীম সালেহ জেভি। আর বিশ্বনাথ উপজেলার ১৩ কিলোমিটারের জন্য ২৩ কোটি ২৫ হাজার টাকা মঞ্জুর হয়। কাজ পায় ঠিকাদার শাওন এন্টারপ্রাইজ। মানসন্মত কাজের অঙ্গীকার নিয়ে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে ২০১৯ সালে ডিসেম্বর মাসে সড়কের দুই উপজেলা অংশের সংস্কার কাজ শুরু করে এলজিইডি। কাজের শুরুতেই গর্ত করে মেশিন দিয়ে সড়কের সব পাথর তুলে নেওয়া হয়। এরপর বালু ও কংক্রিট ইটের খোয়া মিশিয়ে সড়কে ফেলে কার্পেটিং করা হয়। ঠিকাদার ও এলজিইডির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার যোগসাজসে টেকসই সড়ক সংস্কারের নামে চলে লুটপাট। কাজ চলাকালেই অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও এলজিইডি কর্তৃপক্ষ তা আমলে না নিয়ে ঠিকাদারের পক্ষে অবস্থান নেয়। ঠিকাদার ও এলজিইডির কর্মকর্তারা সড়ক সংস্কারের নামে লুটপাটে মেতে ওঠেন। ফলশ্রুতিতে কিছুদিন যেতে না যেতেই সড়কে ভাঙন দেখা দেয়।

২০২৩ সালে সড়কের কাজ শেষ হয়। এর তিন বছর যেত না যেতেই সড়কের ২৬ কিলোমিটার অংশের বেহাল দশা। এর মধ্যে আরও এক কোটি টাকার জরুরি সংস্কার কাজ করা হয়েছে। জগন্নাথপুর উপজেলা অংশে ৪০ লাখ টাকার আরসিসি ঢালাই ও ইট ফেলার কাজ করা হয়। বিশ্বনাথ উপজেলা অংশে আরও ৪০ লাখ টাকার জরুরি রক্ষণাবেক্ষণ হিসেবে সংস্কার কাজ করা হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বর্তমানে নতুন করে ইট ফেলে আবারেও সংস্কার কাজ চলছে।

সড়ক দিয়ে নিয়মিত চলাচলকারী যাত্রী জগন্নাথপুর বাজারের আব্দুস সালাম বলেন, ব্যবসার কাজসহ নানা প্রয়োজনে সিলেট শহরে যেতে হয়। ভাঙাচোরা সড়ক দিয়ে একবার গেলে আরেকবার ফিরতে মন চায় না। সুস্থ মানুষেরা অসুস্থ হয়ে যান, আর অসুস্থ বৃদ্ধ মানুষের অবস্থা হয় আরও নাজুক।

জগন্নাথপুর বাস মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি নিজামুল করিম বলেন, ২০১৮ সালে সড়কটি সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরে হস্তান্তরের জোর দাবি জানানো হলেও লুটপাটের জন্য এলজিইডি সড়কটি ধরে রেখেছে। তিন বছর যেতে না যেতেই সড়কটির সাড়ে ৪৮ কোটি টাকার বেহাল দশা দুঃখজনক। বাসচালকরা এ সড়ক দিয়ে বাস নিয়ে চলাচল করতে চান না।

বিশ্বনাথ যানবাহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নেতা নজরুল ইসলাম বলেন, আমরা সম্প্রতি জরুরি সভা করে অবিলম্বে সড়ক সংস্কারের কাজ না হলে কঠোর আন্দোলন কর্মসূচি গ্রহণ করব বলে সংশ্লিষ্টদের জানিয়েছি।

জগন্নাথপুর উপজেলা নাগরিক অধিকার ফোরামের আহ্বায়ক এম এ কাদির বলেন, সিলেট বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ দুই উপজেলা জগন্নাথপুর ও বিশ্বনাথ উপজেলাবাসীর প্রধান সড়ক জগন্নাথপুর-বিশ্বনাথ-রশিদপুর সড়ক। টেকসই সড়ক সংস্কারের নামে বিশাল বরাদ্দ এনে লুটপাটের ঘটনায় আমরা ব্যথিত। দ্রুত আঞ্চলিক এ সড়কটি সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরে স্থানান্তরের মাধ্যমে দুই উপজেলার দুর্ভোগ দূর করার দাবি জানাই।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর এলজিইডির জগন্নাথপুর উপজেলা প্রকৌশলী সোহরাব হোসেন জানান, গুরুত্বপূর্ণ এ সড়কের জগন্নাথপুর অংশ সংস্কার কাজের মাধ্যমে সচল রাখা হয়েছে। এলজিইডির জেলা কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত ইট ফেলে ছোট ছোট গর্ত ভরাট করা হয়েছে। এর আগে ৪০ লাখ টাকার আরসিসি ঢালাই কাজ করা হয়।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর এলজিইডির বিশ্বনাথ উপজেলা প্রকৌশলী মো. আবু সাঈদ বলেন, সড়কের গর্ত ভরাটের জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্য ও এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলীর পক্ষ থেকে কিছু ইট পাঠানো হয়েছে। সেগুলো দিয়ে আমরা (মোবাইল ম্যান্টেনিজ) জরুরি সংস্কার কাজ করছি। সড়কের ৪ কিলোমিটার অংশ বেহাল হওয়ায় ৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা বরাদ্দ চেয়ে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর এলজিইডির সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন জানান, জরুরি রক্ষণাবেক্ষণের অর্থ থেকে ইট দিয়ে গর্ত ভরাট করে সড়কটি জগন্নাথপুর উপজেলা অংশ যান চলাচলের উপযোগী করা হয়েছে। তিন বছর পর পর সংস্কার করার কথা থাকলেও বরাদ্দ না থাকায় নতুন কোনো সংস্কার কাজ করা যাচ্ছে না।

এত বিশাল বরাদ্দের কাজ কেন তিন বছরও টেকেনি জানতে চাইলে তিনি কাজে কোনো অনিয়ম হয়নি বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, আমি এ সময় দায়িত্বে ছিলাম না। আমার মনে হয় অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও অতিরিক্ত ভারী যানবাহনের চাপে সড়কে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে।

জৈন্তাবার্তা/আরআর