অপ্রতীমকে হ/ত্যার পরদিন তাঁর মাকে সান্ত্বনা দেয় খু/নিরা
রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৫৩ PM

অপ্রতীমকে হ/ত্যার পরদিন তাঁর মাকে সান্ত্বনা দেয় খু/নিরা

জৈন্তা বার্তা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০/০৯/২০২৬ ০৫:৪৭:৫৪ PM

অপ্রতীমকে হ/ত্যার পরদিন তাঁর  মাকে সান্ত্বনা দেয় খু/নিরা

সংগৃহিত


কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) শিক্ষকের ১৩ বছর বয়সী সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতীমকে আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে নির্জন পাহাড়ি জঙ্গলে ডেকে নিয়ে বাঁশের লাঠি দিয়ে মাথায় আঘাত করে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী সাইফুল ইসলাম তুহিনসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। উদ্ধার করা হয়েছে অপ্রতীমের ব্যবহৃত আইফোন।

রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন ও আসামিদের গ্রেপ্তারের তথ্য জানান কুমিল্লার পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান।

নিহত অপ্রতীম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম ও ব্যবসায়ী কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের একমাত্র সন্তান। সে স্থানীয় একটি স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—কুমিল্লা সিটির ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের সানন্দা এলাকার সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯), ময়নামতি কারিগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্র মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ (১৫), কোতোয়ালি থানার হাতিগাড়া এলাকার মো. কামরুল হাসান এবং আফজাল খান ডিগ্রি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র মো. সিয়াম (১৯)।

আইফোন ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে ডেকে নেওয়া

পুলিশ ও ডিবির প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, গত ১৮ সেপ্টেম্বর শুক্রবার জুমার নামাজের পর কুমিল্লা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের মূল ফটকের সামনে অপ্রতীমকে দেখা যায়। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মেসেঞ্জারে চ্যাটিংয়ের মাধ্যমে তাকে এক ঘণ্টার কথা বলে ডেকে নেয় পরিচিত বড় ভাই তুহিন।

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, বিকেল ৩টা ১৫ মিনিটে তুহিন অপ্রতীমকে সঙ্গে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনের সামনে দিয়ে সানন্দা এলাকার দিকে যায়। পরে অন্য একটি পথ দিয়ে ফাহাদ ও কামরুলও সানন্দার নির্জন জঙ্গলের দিকে যায়।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে পাহাড়ঘেরা নির্জন বনের মধ্যে অপ্রতীমের কাছে থাকা তার মায়ের আইফোনটি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে তুহিন। অপ্রতীম বাধা দিলে তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়। একপর্যায়ে তুহিন, ফাহাদ ও কামরুল বাঁশের লাঠি দিয়ে তার মাথায় আঘাত করে। এতে অপ্রতীমের মৃত্যু হলে তারা আইফোনটি নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।

হত্যার পরদিন বাসায় গিয়ে সান্ত্বনা

পুলিশ জানায়, হত্যাকাণ্ডের পরও আসামিরা স্বাভাবিকভাবেই চলাফেরা করতে থাকে। শনিবার সকাল ৮টার দিকে তুহিন, আনাস ও ফাহিমসহ কয়েকজন অপ্রতীমের বাসায় গিয়ে তার কান্নারত মা ড. নাহিদা বেগমকে সান্ত্বনা দেয়। পরে তুহিন নিজ বাসায় স্বাভাবিক সময় কাটাতে থাকে।

সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল নেতা ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা শনিবার বিকেলে তুহিনকে আটক করেন। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের পর প্রযুক্তির সহায়তায় ঢাকা ও কুমিল্লা থেকে অন্য আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়। তুহিনের দেখানো স্থান থেকে অপ্রতীমের ব্যবহৃত আইফোনটিও উদ্ধার করা হয়।

পাহাড়ঘেরা জঙ্গল থেকে মরদেহ উদ্ধার

গত শুক্রবার বিকেলে বাসা থেকে আইফোন নিয়ে বের হওয়ার পর অপ্রতীম আর বাড়ি ফেরেনি। স্বজনেরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তার সন্ধান না পেয়ে রাতে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।

রাতভর খোঁজাখুঁজির পর শনিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রায় দুই-তিন কিলোমিটার দক্ষিণে সালমানপুর এলাকার জঙ্গলঘেরা পাহাড়ে স্থানীয় লোকজন ও শিক্ষার্থীরা অপ্রতীমের মরদেহ দেখতে পান। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।

শোকে কুবি ক্যাম্পাস

একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে অপ্রতীমের মা ড. নাহিদা বেগম ও বাবা ফিরোজ শাহরিয়ারের আহাজারিতে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বারবার মূর্ছা গিয়ে মা নাহিদা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলে কী অন্যায় করেছিল? আমাকে জবাব দেন, আমি কেমনে জীবন পার করবো? এটা কোনো দেশ, একটা ছেলে ঘর থেকে বের হলে তাকে মেরে ফেলতে হবে?’

রোববার সকালে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে অপ্রতীমের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে কোটবাড়ী গন্ধমতি এলাকায় নিজ বাড়ির পাশের কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ ও অপ্রতীমের স্মরণে বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ শোক দিবস পালন করা হচ্ছে। স্থগিত রাখা হয়েছে সব ধরনের ক্লাস ও পরীক্ষা। বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ ও নিহতের বাসায় গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানান স্থানীয় সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী ও কুবি প্রশাসনের কর্মকর্তারা।

এ সময় এমপি মনিরুল হক চৌধুরী ৯০ দিনের মধ্যে হত্যাকাণ্ডের বিচারকাজ সম্পন্ন করার দাবি জানান।

একই দিন ঢাকায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, অপ্রতীম হত্যার বিচারও রামিসা হত্যা মামলার মতো দ্রুত করা হবে।

পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান বলেন, জিডির ভিত্তিতে তদন্তে নেমে সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা ও ডিবির টানা জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে, আইফোন ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যেই অপ্রতীমকে হত্যা করা হয়েছে। আসামিদের বিরুদ্ধে দ্রুত আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।

জৈন্তা বর্তা / ওয়াদুদ