মায়ের ওষুধ আনতে বেরিয়ে আর ফিরলেন না রাসেল
শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:২৯ AM

মায়ের ওষুধ আনতে বেরিয়ে আর ফিরলেন না রাসেল

জৈন্তা বার্তা ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৩/১০/২০২৬ ০৩:৩৮:৫১ AM

মায়ের ওষুধ আনতে বেরিয়ে আর ফিরলেন না রাসেল

সংগৃহীত


স্বপ্ন ছিল উচ্চশিক্ষার জন্য লন্ডনে পাড়ি জমানোর। বড় ভাই থাকেন ফ্রান্সে। ২৩ বছরের রাসেল আহমদকে ঘিরে পরিবারও দেখছিল নতুন স্বপ্ন। মাত্র সাত দিন আগে এসেছিল কাঙ্ক্ষিত ভিসার ই-মেইল। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। সিলেটের দক্ষিণ সুরমার সিলাম চকেরবাজারে দুই পক্ষের সংঘর্ষের মধ্যে ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন তরুণ রাসেল।

শুক্রবার (২ অক্টোবর) জুমার নামাজ শেষে মায়ের হাতে ভাত খেয়ে তাঁর জন্য ওষুধ কিনতে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন রাসেল। এরপর আর বাড়ি ফেরেননি তিনি। বিকেলে চকেরবাজার এলাকায় সংঘর্ষের মধ্যে ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হন। পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। নিহত রাসেল সিলাম চকেরবাজার এলাকার শারুক মিয়ার ছেলে।

ছেলের মৃত্যুর খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে আসেন মা। নিথর দেহের পাশে তাঁর কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে হাসপাতালের পরিবেশ। আহাজারি করে তিনি বলেন, ‘ছেলেটা নামাজ পড়ে ভাত খেয়ে আমার ওষুধ আনতে গেল, আর ফিরল লাশ হয়ে। আমি এ হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার চাই।’

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সিলাম চকেরবাজার এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে আগে থেকেই বিরোধ চলে আসছিল। স্থানীয় সূত্রগুলো এই বিরোধকে শাহ ও শেখ গোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব হিসেবে উল্লেখ করেছে। হযরত শাহ তৈয়ব ছৈলানি (রহ.) ওয়াকফ এস্টেট, মাজার-মসজিদ ও দোকানকোঠা পরিচালনা নিয়ে গত আগস্টেও দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছিল। ওই ঘটনায় পুলিশ সদস্যসহ উভয় পক্ষের অন্তত ৩০ জন আহত হওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।

এরই মধ্যে কয়েক দিন আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া একটি পোস্ট ও তাতে করা মন্তব্যকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের বিরোধ নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। শুক্রবার বিষয়টি নিয়ে দুই পক্ষের লোকজন চকেরবাজার এলাকায় মুখোমুখি হলে প্রথমে কথাকাটাকাটি ও উত্তেজনা তৈরি হয়। একপর্যায়ে রাসেল ছুরিকাঘাতের শিকার হন।

তবে পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, রাসেল মূল বিরোধের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন না। ছোটদের মধ্যে তৈরি হওয়া বিরোধ মীমাংসার চেষ্টা করতে তাঁকে সেখানে নেওয়া হয়েছিল। পরিস্থিতি শান্ত করার সময় তিনি ছুরিকাঘাতে আহত হন বলে জানিয়েছেন সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) অলক বিশ্বাস।

রাসেলকে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে চকেরবাজার এলাকায় উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। পরে দুই পক্ষ ইটপাটকেল নিক্ষেপের পাশাপাশি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনায় প্রায় ৩০ জন আহত হওয়ার তথ্য বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে।

খবর পেয়ে দক্ষিণ সুরমা ও মোগলাবাজার থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এলাকায় নতুন করে উত্তেজনা এড়াতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে রাসেলের মরদেহ এলাকায় নেওয়ার সময়ও পুলিশ সতর্ক অবস্থানে থাকার কথা জানিয়েছে।

এ ঘটনায় এখনো তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। কারা রাসেলকে ছুরিকাঘাত করেছে এবং সংঘর্ষে কারা জড়িত ছিল, তদন্ত শেষে তা নিশ্চিত হওয়া যাবে। ফলে স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ বা গোষ্ঠীগত বিরোধের বর্ণনার পাশাপাশি পুলিশের তদন্তাধীন বক্তব্যকেও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।

পরিবারের স্বপ্ন ছিল রাসেলকে উচ্চশিক্ষার জন্য লন্ডনে পাঠানোর। ভিসার ই-মেইল পাওয়ার পর সেই স্বপ্ন বাস্তবের কাছাকাছি এসেছিল। কিন্তু মায়ের জন্য ওষুধ কিনতে শুক্রবার দুপুরে বাড়ি থেকে বের হওয়া সেই তরুণ আর ফিরলেন না। জুমার নামাজ শেষে মায়ের হাতে খাওয়া ভাতই হয়ে রইল তাঁর শেষ খাবার; লন্ডনের পথে পাড়ি জমানোর বদলে তাঁকে ফিরতে হলো লাশ হয়ে।

জৈন্তা বার্তা / ওয়াদুদ



শীর্ষ সংবাদ: